অনিন্দ্য সুন্দর রূপপুর গ্রামের গল্প

0
744

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের অন্তর্গত রূপপুর গ্রাম। ঈশ^রদী শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে পদ্মার পাড়ে অবস্থিত এই গ্রামের বেশকিছু উল্লেখযোগ্য পরিচিতি রয়েছে। এটাই আমার দাদুর বাড়ি। ছেলেবেলার অনেকটা সময় এখানে কেটেছে আমার। দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের অবস্থান অনিন্দ্য সুন্দর এই গ্রামে। এর ঠিক পাশেই বিখ্যাত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু।

প্রায় সাড়ে তিন বছর পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পরিবারের সঙ্গে আরেকবার বেড়াতে গিয়েছিলাম ছেলেবেলার স্মৃতিবিজড়িত রূপপুরে। কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে দুপুর আড়াইটার দিকে শুরু হয় এই যাত্রা। এর আগের দিন প্রথম প্রহরে শুরু করে সারারাত লঞ্চের ছাদে জেগে উল্কাপাত উপভোগ করে চাঁদপুর থেকে ফিরেছিলাম। তাই মনে ভ্রমণের আবেশ রয়ে গিয়েছিল। সেজন্যই মাত্র পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা প্রায় ১৭ ঘণ্টায় শেষ হলেও মনে ছিল রোমাঞ্চকর আবহ। শহুরে একঘেঁয়ে জীবনের ফাঁকে গ্রামে যাওয়ার সুযোগ পেলে সবারই বোধ করি এমন হয়। মাঝে আনন্দদায়ক ব্যাপার ছিল স্থানীয় খাবার। টাঙ্গাইল হাইওয়ের জ্যামে আটকাবস্থায় পোড়াবাড়ির বিখ্যাত চমচম বিক্রয়কারী কিছু দোকানের সামনে যেতেই বাস থেকে নেমে ৫০০ গ্রাম ওজনের দুটি বড় আকারের মিষ্টি কিনেছি।

 প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর রূপপুর মোড়ে আমাদের নামিয়ে দেয় বাস। তখন সকাল সাড়ে ৭টার মতো বাজে। কুয়াশাচ্ছন্ন গ্রামবাংলার সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে খুঁজতে থাকি রসওয়ালাকে। শীতের সকালে গ্রামের সবচেয়ে লোভনীয় আর উপাদেয় পানীয় খেজুরের রস। কিন্তু ওইদিন আমাদের পৌঁছাতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল। তবে পরের তিন দিনের প্রতিদিন সকালে ইচ্ছেমতো এই রসের স্বাদ নিয়েছিলাম। গ্রামে গেলে পরিচিত কেউ থাকলে আগে থেকেই রসের জন্য বলে রাখতে চেষ্টা করবেন। এতে ঘুম একটু দেরিতে ভাঙলেও খেজুরের রসের মজা হাতছাড়া হবে না।

 শীতকালে রূপপুর গ্রামে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য এককথায় অপূর্ব। পুরো একটি দিন এই সৌন্দর্যের আবেশ নিয়ে শুধু বসে থেকেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। যদিও সারাবছরই এই সৌন্দর্য বজায় থাকে। কিন্তু শীতের কুয়াশার অন্যরকম আবেদন রয়েছে। অন্য ঋতুতে এই অনুভূতি মিলবে না। পদ্মা নদীর পাড়েই গ্রামটির অবস্থান হওয়ায় এই সৌন্দর্য এমনিতেই অসাধারণ। রাতের জোছনাও তেমনই মনকাড়া। ভীষণ শীতে চাদর মুড়ি দিয়ে কুয়াশা ঢাকা রাতে জোছনায় শরীর ভেজানোর সঙ্গে এককাপ চা। ব্যস, আর কী চাই!

 রূপপুর গ্রামে রয়েছে নাম না জানা অসংখ্য পাখির সমাবেশ। যদিও বসন্ত আসেনি, কিন্তু বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে কোকিলের ডাক এই সময়ে গ্রামে স্বাভাবিক ব্যাপার। আর দিনভর নীলকণ্ঠী বসন্ত বৌরীর ডাক তো আছেই। গাছে গাছে পাখির বাসাও প্রায়ই চোখে পড়ে। হরেক রঙের প্রজাপতি আর একসঙ্গে ৮-১০টা কাঠবিড়ালীকে এত স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে খুব কমই দেখেছি। চুপচাপ বসে থেকে গাছে গাছে এদের খেলা দেখাও অন্যরকম অভিজ্ঞতা। শুধু গ্রামে গেলেই এই চিত্র দেখা সম্ভব। আর বিভিন্ন আকার ও চেহারার গিরগিটির দিকে একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখলে বেশকিছু রঙের বাহার অনায়াসে সামনে আসবে।

সন্ধ্যা নামার পর গ্রামের নিস্তব্ধতার মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোঁকার অবিরাম ডাক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করে। আরও আছে বিস্তীর্ণ আম-কাঁঠালের বাগান। ফল না থাকলেও বাগানের ভেতরে হেঁটে বেড়ানোটা মনে প্রশান্তি এনে দেয়। আলোকচিত্রীদের জন্য এই গ্রাম জুতসই একটি স্পট। একসঙ্গে এতকিছু সহসা পাওয়া যায় না।

 শীতকালের আরেক আকর্ষণ সরিষার ক্ষেত। অবশ্য ছেলেবেলা থেকেই গ্রামের ক্ষেতক্ষামারির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকায় সাদা ফুলে ভরপুর মূলার ক্ষেতের সৌন্দর্যও আমার কাছে একইরকম আকর্ষণীয় মনে হয়। আমাদের নিজস্ব বেশকিছু চাষের জমি থাকায় এগুলো কাছ থেকে জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। স্কুলের প্রতিটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাবা সপরিবারে গ্রামে নিয়ে যেতেন।

তবে চাষের জমিগুলোর উর্বরতা অনেকখানি কমে যাওয়ায় এখন সেগুলো ইটের ভাটা হিসেবে ব্যবহারের জন্য ভাড়ায় চলছে। পরিবেশের জন্য এগুলো কম ক্ষতিকারক নয়।

 প্রতিবারের মতো এবারেও আমাদের জন্য প্রতিদিনই ছিল বিশেষ খাবারের আয়োজন। আর শীতকালের বিশেষ খাবার মানেই হরেক রকমের ঝাল-মিষ্টি পিঠা। দুধ পুলি, পুরভরা পুলি, দুধ চিতই, খেজুরের গুড়ের পায়েসের মতো খাবার ছাড়া আমার শীতকাল বরাবরই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আর কুয়াশাঘেরা সকালে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠার কথা তো বলাই বাহুল্য। ভোরে ঘুম ভেঙে টাটকা খেজুরের রস দিয়ে দিনের শুরু আর তারপর থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত কিছু না কিছু চলছেই। নিজস্ব খামারের গরুর খাঁটি দুধ আর বাড়ির বাগানের টাটকা শাক-সবজির স্বাদ আর মজা গ্রাম ছাড়া আর কোথায় মেলে!

রূপপুর থেকে কিছুটা দূরে গেলে পাকশী রিসোর্ট। সেখানে থাকা-খাওয়ার জন্য ভালো পরিবেশ রয়েছে। রিসোর্টের মাধ্যমে খুব সামান্য খরচেই স্থানীয়ভাবে তৈরি খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। যারা গ্রামে গেলেও ফাস্টফুড তথা আধুনিক খাবার খোঁজেন, তাদের জন্য রূপপুর মোড়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক শহুরে সাজসজ্জা ও মেন্যু সংবলিত রেস্তোরাঁ।

রূপপুর গ্রামে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, রয়েছে বাড়তি কিছু পর্যটনবান্ধব স্থান। রূপপুর মোড়েই দেখা যায় ব্রিটিশ শাসনামলে গড়ে তোলা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। একটু দূরেই এই ব্রিজের পাশ দিয়ে পদ্মা নদীর ওপরে দাঁড়িয়ে আছে লালন শাহ সেতু।

 হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচ দিয়ে ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো সুড়ঙ্গ পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই চোখে পড়বে মনোমুগ্ধকর কারুকার্য ও স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ, মাদ্রাসা ও দরগাহ ফুরফুরা শরীফ। সংস্কারের ফলে এটি এখন বেশি চোখে পড়ে। গোলাপি রঙ আর রঙিন কাঁচের সমন্বয়ে তৈরি এই স্থাপনা দেখতে গেলে মেয়েরা অবশ্যই মাথায় কাপড় রাখবেন। ধর্মীয় পরিবেশ ও ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন কিছু করবেন না। আর ছবি তোলার আগে অবশ্যই কর্তৃপক্ষের অনুমতি চেয়ে নেবেন।

রূপপুর এসে একদিনের মধ্যেই ঈশ্বরদী শহরেও বেড়াতে পারেন। যেকোনও অটো কিংবা রিকশায় চড়ে সহজেই পাকশী ও ঈশ্বরদী যাওয়া যায়। পাকশীতে পাকিস্তানি আমলের বেশকিছু পুরনো নিদর্শন রয়েছে। লোকোষাট নামক এলাকায় এখনও সেই সময়ের বেশকিছু ঘরবাড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া পেপার মিলসও আছে।

ঈশ্বরদী দেশের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে জংশন। এই জেলায় আছে দেশের একমাত্র ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র। সেই সঙ্গে রয়েছে ডাল ও ধান গবেষণা কেন্দ্র। এগুলোতে অবস্থিত স্কুল দুটিতে প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি।

হাতে সময় নিয়ে বাসে চড়ে ঐতিহ্যবাহী পাবনা জেলা সদরে ঘুরে আসুন। মানসিক হাসপাতাল, হাজার দুয়ারী বিচারালয়সহ বেশকিছু দর্শনীয় স্থান আছে সেখানে।

রূপপুরে লেখকআমার এই সফরে প্রায় পুরোটাই রূপপুরের মধ্যে ছিলাম। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে রূপপুর যাওয়া যায়। ট্রেনে গেলে একটু দূরে ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে নেমে সেখান থেকে অটোতে চড়ে রূপপুর পৌঁছাতে হবে। যেহেতু নিজের বাড়িতেই থাকা-খাওয়া ছিল, তাই খরচ নিয়ে ভাবতে হয়নি আমাকে। অবশ্য পর্যটক বা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সব খরচ নাগালের মধ্যেই। – বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here