অরাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে দুশ্চিন্তা

0
217

গণমাধ্যম ডেস্কঃ হঠাৎ করে নানা অরাজনৈতিক ইস্যু জনপ্রিয় আন্দোলনের বড় বিষয়ে পরিণত হওয়ার প্রবণতায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। দলটি আশঙ্কা করছে, নির্বাচন সামনে রেখে এমন আরও আন্দোলন হতে পারে।

আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো জনপ্রিয়তা পেয়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ দাবিগুলোর যৌক্তিকতা। আন্দোলন সংগঠিত হওয়া এবং তা ছড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এতে সরকারবিরোধী শক্তিও সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারকে শক্তি প্রয়োগ, গ্রেপ্তার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপের মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, সরকার মনে করছে কোটা সংস্কার ও ছাত্র আন্দোলন আপাতত সামাল দেওয়া গেছে। তবে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকেরা নামেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবিটিও সুরাহা হয়নি। তাঁরাও নির্বাচনের আগে সরকারকে চাপ দিয়ে দাবি আদায় করতে চাইবেন। কোটা সংস্কারের আন্দোলনও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের এক বৈঠকেও এই আশঙ্কার কথা জানান একাধিক শরিক দলের নেতা। এ জন্য সরকারকে সতর্ক থাকা এবং যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে সুরাহার পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন শরিক দলের নেতারা।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠনের পর বিরোধী দল বিএনপি রাজনীতির মাঠ ও সংসদ কোথাও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু করে, এর মধ্যে জ্বালাও-পোড়াও যুক্ত হওয়ায় দেশে-বিদেশে সমালোচনায় পড়তে হয়। এরপর বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর মুক্তি কিংবা সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলনই সেভাবে গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। ফলে স্বস্তিতেই আরেকটা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু এর মধ্যে কোটা সংস্কারের দাবিতে চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে সরকার বড় বেকায়দায় পড়ে। সর্বশেষ নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্ররা রাস্তায় নামলে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে।

এই দুটি আন্দোলনকেই প্রকাশ্যে যৌক্তিক বলে স্বীকৃতি দিয়ে দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিতে হয় সরকারকে। এটাকে সরকারের নমনীয় ও কৌশলী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। এর আগে গত বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনও ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। পরে সরকার দাবি মেনে নেয়।

অবশ্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কিছু সমস্যা, ইস্যু থাকে। এর প্রতিবাদ হয়। কোটা সংস্কার এবং ছাত্র আন্দোলনও এমনই দুটি বিষয়। এই আন্দোলনে সরকার বা আওয়ামী লীগের জন্য কোনো সমস্যা নয়। বরং আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াত রাজনীতি ঢুকিয়ে ষড়যন্ত্র করেছে, সংঘাতের পথে নিয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে ভবিষ্যতেও তারা একই চেষ্টা করতে পারে, সে জন্য সরকার ও আওয়ামী লীগ সতর্ক আছে।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে আগে সরকারবিরোধী শক্তি মাঠ গরম করার চেষ্টা করতে পারে, এটা আওয়ামী লীগের ভাবনায় ছিল। সে জন্য নির্বাচনের প্রস্তুতির নামে সারা দেশে সংগঠনকে প্রস্তুত করার কাজ করেছে ক্ষমতাসীন দল। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন এবং তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার বিষয়টি হিসাবের বাইরে ছিল।

আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ দিন বদলের স্লোগান নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে পক্ষে টেনেছিল। এখন সেই তরুণ প্রজন্মই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ করে বসেছে সরকারকে। তাই সাম্প্রতিক দুই ছাত্র আন্দোলন আওয়ামী লীগের কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে।

কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে যে দাবি এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে আওয়ামী লীগেরও সমর্থন আছে। এ জন্য সরকার দ্রুত দাবি মেনে নিয়ে বাস্তবায়ন করেছে, করছে। তিনি মনে করেন, তরুণ সমাজ আওয়ামী লীগের প্রতি বিরক্ত নয়, দাবি মেনে নেওয়ার কারণে তারা আরও খুশি হচ্ছে।

কোটা সংস্কার ও ছাত্র আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে এবং তাদের জোটসঙ্গী ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে দুই ধরনের মত আছে। একটা অংশ মনে করে, এই দুই আন্দোলনের দাবিগুলো যৌক্তিক। কিন্তু এর পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশের বাইরের শক্তির ইন্ধন আছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলে পতন ঘটানোই লক্ষ্য ছিল। তাই শক্ত হাতে দমন করার মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই দুটি আন্দোলন একেবারেই অরাজনৈতিক। সরকার সময়মতো এবং গুরুত্ব দিয়ে দাবি বাস্তবায়ন না করার কারণেই বিরোধীরা এর ভেতর প্রবেশের সুযোগ নিয়েছে। আরও দ্রুত এবং ভালোভাবে বাস্তবায়ন করলে পরিস্থিতি এ পর্যায়ে যেত না।

তবে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, কোটা সংস্কার সরকার করতে চায়। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর বলে আগামী নির্বাচনের পরে চূড়ান্ত সুরাহা করতে চায়। আর ছাত্র আন্দোলনের সব দাবিই মানার মতো। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অসংগঠিত ছিল বলে তাদের রাস্তা থেকে তোলাই প্রধান লক্ষ্য ছিল। এখন দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক  কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন যৌক্তিক ছিল। এ জন্য জনসমর্থন পেয়েছে। তবে এই দুই আন্দোলন সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আবার এটাও ঠিক এই অসংগঠিত আন্দোলনে সরকার বেকায়দায় পড়ে যাওয়ার কথা নয়। আর সরকার স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন নিয়ে যে ষড়যন্ত্রের কথা বলছে, তা মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য। এর সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here