আইসিডিডিআরবি’র স্কিনিং সেন্টারে ১৭ হাজার যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত

0
166

দেশের তিনটি বিভাগীয় শহর- ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মোট দশটি স্ক্রিনিং সেন্টারের মাধ্যমে নিয়মিত যক্ষ্মা রোগী শনাক্তে কাজ করছে আইসিডিডিআরবি। স্টপ টিবি পার্টনারশিপ এর আর্থিক সহায়তায় ২০১৪ সালে এই স্ক্রিনিং সেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। তখন থেকে এ পর্যন্ত ১৭ হাজারের বেশি যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানী ডা. সায়রা বানু।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আইসিডিডিআরবি ২০০১ সাল থেকে যক্ষ্মা নিয়ে কাজ শুরু করে। ২০০৫ সালে তারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যক্ষ্মা রোগী সনাক্তে কাজ করে। এসময় কয়েদীদের মধ্যে যক্ষ্মা রোগের হার সাধারণের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি লক্ষ শনাক্ত হয়। সেই থেকে কয়েদীদের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করে প্রতিষ্ঠানটি। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা মহানগর এলাকার বেসরকারি খাত থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারীদের মাঝে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় সেবা সহজলভ্য করতে এই প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সালে তিনটি স্ক্রিনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে।

আইসিডিডিআরবি’র রাজধানীর ধানমন্ডি ও মহাখালী সেন্টারে সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ভালো। রোগীদের ভিড় আছে। তবে তাদের অসুবিধা যেন না হয় সেই ব্যবস্থা রয়েছে। রোগী আসার পরই দারোয়ান তাদের কাউন্টারে যেতে বলছেন। সেখান থেকে ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে রোগীরা প্রথমে এক্সরে রুমে যাচ্ছেন এবং এক্সরে শেষ করে তারা কফ পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত জায়গায় জমা দিচ্ছেন।

সতের বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার। থাকেন রাজধানীর ধানমন্ডিতে। তিনি একটি বাসাবাড়িতে কাজ করেন। টানা দুই সপ্তাহ ধরে তার কাশি। ভাল না হওয়ায় গৃহকর্ত্রী তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। পরে আইসিডিডিআরবি’র স্ক্রিনিং সেন্টারে তার এক্সরে ও কফ পরীক্ষা করে দেখা যায় তার যক্ষ্মা হয়নি। গৃহকর্ত্রী সুমনা জাহান (৪৫) বলেন, ‘ওর পরীক্ষার রেজাল্ট নেগেটিভ আসায় আমি খুব খুশি।’ তিনি বলেন, ‘আমি তো ভয় পেয়েছিলাম। যেকোনও রোগই তো ভয়ের। আর সেটা যদি যক্ষ্মা হয় তাহলে তো সেটাও অনেক খারাপ লাগার ব্যাপার।’ স্ক্রিনিং সেন্টারের সার্ভিস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানকার স্ক্রিনিং প্রসেস খুবই ভালো। এখানে এসে কোনও অসুবিধা হয়নি।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগে নিজের কাশির চিকিৎসা করাতে যান মাহমুদুল হাসান (২৬)। সেখান থেকে চিকিৎসক তাকে টিবি (যক্ষ্মা) আছে কিনা শনাক্তের জন্য পরীক্ষা করতে বলেন। মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘এখানে এসে পরীক্ষা করাতে কোনও অসুবিধা হয়নি। সিস্টেম বেশ ভালো। রোগীর ভিড়ও কম।’

আইসিডিডিআরবি’র ডিজিজেজ ডিভিশনের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ও এমারজিং ইনফেকশন প্রোগ্রামের কটিং হেড ডা. সায়েরা বানুবলেন, ‘আমাদের যক্ষ্মা স্ক্রিনিং সেন্টারগুলো ওয়ান স্টপ সেন্টার হিসেবেই কাজ করছে। মূলত যেসব রোগী প্রাইভেট প্র্যাকটিশনারের কাছে যাচ্ছে তারাই আমাদের স্ক্রিনিং সেন্টারে আসেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো করান এবং রোগ শনাক্ত হলে বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ পান। আমরা বাংলাদেশ সরকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যক্ষ্মা প্রতিরোধে কাজ করছি। আমরা সরকারের কাছ থেকে নিয়েই যক্ষ্মার ওষুধগুলো রোগীদের কাছে দিই। অনেকেরই ধারণা যে সরকারি ওষুধ হয়ত ভাল না। আসলে এটি সত্যি নয়। যক্ষ্মার ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকার থেকে দেওয়া হয়। আর এই ওষুধটি খুবই ভালো মানের। প্রত্যেক ডট সেন্টার প্রতি তিন মাসে কতগুলো যক্ষ্মা রোগী পেয়েছে তা সরকারকে জানায়। চিকিৎসার নিয়মানুযায়ী যক্ষা রোগীকে নির্ধারিত কর্মীর সামনে বসে প্রতিদিন যক্ষ্মার ট্যাবলেট খেতে হয়। সরকার যক্ষ্মা নির্মূলে নিরলস কাজ করছে। তাদের প্রচেষ্টার অংশ হতে পেরে আমরা গর্বিত।’

ডা. সায়েরা বানু বলেন, ‘বর্তমানে গ্লোবাল ফান্ড, ইউএসএআইডি এবং স্টপ টিবি পার্টনারশিপ এর আর্থিক সহায়তায় চট্টগ্রামে দুটি, সিলেটে একটি এবং ঢাকায় সাতটি যক্ষ্মা স্ক্রিনিং সেন্টার চালু রয়েছে। এখানে ট্রু ডিজিটাল এক্সরে মেশিন আছে। আছে জিন এক্সপার্ট মেশিন। এর মাধ্যমে ওষুধ প্রতিরোধক যক্ষ্মা আছে কি-না তা শনাক্ত করা যায়। এই সেন্টারগুলোর কর্মীরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে যক্ষ্মা রোগীদের বিষয়ে সচেতন করেন এবং সম্ভাব্য যক্ষ্মা রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর জন্য স্ক্রিনিং সেন্টারগুলোতে পাঠনোর জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বর্তমানে ঢাকা মহানগরের প্রায় ১০ হাজারের বেশি চিকিৎসক তাদের ব্যক্তিগত চেম্বার থেকে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এই সেন্টারগুলোতে পাঠান। এই সেন্টারগুলোতে বর্তমানে ৮০ জন কর্মী কাজ করছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনও যক্ষ্মার অনুমিত ধারণার তুলনায় প্রায় ৩৯ ভাগ রোগী শনাক্ত হচ্ছে না। এর একটা বড় অংশ হয়ত প্রাইভেট সেক্টরে যাচ্ছেন যাদের তথ্য সরকার পাচ্ছে না। তাদেরকেই আমরা উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে তাদের জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং তাদের তথ্য সরকারি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর, মিরপুর, মহাখালী, রামপুরা, ধানমন্ডি, ধোলাইখাল ও গোলাপবাগে সাতটি স্ক্রিনিং সেন্টার রয়েছে। এই সেন্টারগুলো সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে ধানমন্ডি সেন্টারটি রাত ১০ পর্যন্ত খোলা থাকে।

– বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here