আদরের মেয়েকে বাঁচাতে বাবা শেষ চেষ্টাটুকু

0
240

বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ অনেক ভারী হয়। এ কষ্টটুকু করতে হয়তোবা চাননি বলেই যতক্ষণ বেঁচে ছিলেন, ততক্ষণই সন্তানকে খুঁজেছেন! চলনবিলে নৌকাডুবির ঘটনায় সর্বশেষ মরদেহটি ছিলো ঈশ্বরদী বাজারের খন্দকার মার্কেটের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম স্বপন বিশ্বাসের (৩৭)।

রোববার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টায় চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের প্রায় ৩ কিলোমিটার উজানে ভাঙাজোলা থেকে ওই ব্যবসায়ীর মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।

মরদেহ উদ্ধারের পর আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দলের প্রধান নুরুন্নবী এ কথাগুলো বলেন।
নিহত রফিকুলের একমাত্র মেয়ে সওদা মনি। সে ঈশ্বরদীর সাঁড়া মাড়োয়ারি মডেল সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তো। বাবা রফিকুল ঈশ্বরদী পৌর এলাকার পূর্ব টেংরী আমবাগান এলাকার সাইদুর রহমান বিশ্বাসের মেজো ছেলে।

ডুবুরি দলের প্রধান বলেন, শুক্রবার (৩১ আগস্ট) রাতে উদ্ধার করা হয় ঈশ্বরদী আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল গণির স্ত্রী মমতাজ পারভীন শিউলীর (৪৫) মরদেহ। পরদিন শনিবার (১ সেপ্টেম্বর) পাওয়া যায় ঈশ্বরদীর আমবাগান এলাকার ব্যবসায়ী স্বপনের মেয়ে সওদা মনি (১২) ও সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোশাররফ হোসেন মুসার স্ত্রী শাহনাজ পারভীনের (৪৫) মরদেহ।

রোববার ঈশ্বরদী আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. বিল্লাল গনি (৫৫) ও ব্যবসায়ী স্বপনের মরদেহ উদ্ধারের মধ্যদিয়ে উদ্ধার কাজ শেষ হয়েছে।

নুউন্নবী বলেন, ‘নৌকাডুবির ঘটনায় পানিতে ডুবে যারা মারা গেছেন তাদের মরদেহ খুব দ্রুতই উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে এ অভিযানে ছোট্ট সোনামনি সওদা মনির মরদেহ উদ্ধার করে এবং সর্বশেষ তার বাবার মরদেহ উদ্ধার করে এটুকু মনে হয়েছে— আদরের মেয়েকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটুকু করেছিলের তার বাবা স্বপন। মেয়েকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে ঘটনাস্থল থেকে দূরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। স্রোতের টানে প্রায় তিন কিলোমিটার উজান থেকে মরদেটি উদ্ধার করা হয়।’

প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারী সুমন হোসেন বলেন, ‘সূর্য ডোবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে নৌকার ছইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে বেশিরভাগ ভ্রমণকারী মোবাইলে সেলফি তোলার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এসময় ছই ভেঙে নৌকাটি সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়। তাৎক্ষণিক ১৭ জনকে উদ্ধার করতে পারলেও ছইয়ের নিচে বসে থাকা পাঁচজনকে উদ্ধার করা যায়নি।’

নৌকা ডুবির ঘটনায় আহত মোশাররফ হোসেন মুসা জানান, ‘ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়া থেকে সংগীত শিল্পী, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ীসহ পরিবার-পরিজন নিয়ে ২৪ জন ছুটির দিনে নৌকায় চলনবিলে আনন্দভ্রমণে বের হন। দু’জন মাঝপথে নেমে যান। বাকি ২২ জন চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে নৌকায় ঘুরে বেড়ান। ব্যবসায়ী স্বপন ছিলেন একবারে নৌকার বৌঠার কাছে! নৌকাডুবির ওই মুহূর্তে শিশু সওদা মনি ‘বাবা বাচাও’ বলে চিৎকার করেছিল। শেষ পর্যন্ত সন্তানকে বাঁচানোই ছিলো তার মূল লক্ষ্য! স্বপন বেঁচে থাকলে হয়তো তার আদরের একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে ফেলার কষ্টটুকু সহ্য করতে পারতো না।’

এদিকে শনিবার (১ সেপ্টেম্বর) ঈশ্বরদী আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সহধর্মিণীর মরদেহ টেবুনিয়া তার বাবার বাড়িতে পৌঁছালে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বাড়িতে চলে শোকের মাতম।

নিহত শিউলীর বাবা পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও বাংলাদেশ ফার্ম শ্রমিক ফেডারেশনের চেয়ারম্যান মো. জয়নুল আবেদীন জানান, শনিবার বিকেলে শিউলীকে তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে।

ঈশ্বরদীর সলিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শাহানাজ পারভিন পারুলেকে ঈশ্বরদীর শহরের মধ্যে অরনকোলা পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয় ঈশ্বরদী সাঁড়া মাড়োয়ারী মডেল সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া আক্তার ওরফে সওদা মনি’র মরদেহ।

রোববার শিউলীর স্বামী ঈশ্বরদী আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. বিল্লাল গণির মরদেগ দুপুরে টেবুনিয়ায় স্ত্রী শিউলীর কবরের পাশে দাফন করা হবে বলে জানান যায়।

ঈশ্বরদী আমবাগান এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম স্বপন বিশ্বাসের মরদেহ দুপুরে ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় কবরস্থানে মেয়ে সওদা মনির কবরের পাশে দাফন করা হবে।

৩১ আগস্ট পরিবার-পরিজন নিয়ে নৌকায় আনন্দ ভ্রমণে বের হয়েছিলেন ২২ জন। সন্ধ্যায় চাটমোহরের হাণ্ডিয়াল পাইকপাড়া ঘাট এলাকায় চলনবিলে নৌকাটি ডুবে গেলে এ আনন্দ ভ্রমণ রূপ নেয় কান্নায়। এ ঘটনায় ১৭ জনকে রাতেই জীবিত উদ্ধার করা হয়। কিন্তু নিখোঁজ হন পাঁচ জন। শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত নিখোঁজ পাঁচজনের মরদেগ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

– বাংলানিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here