আবিদা সুলতানা: কী সস্তা একজন নারীর জীবন!

0
66

একই ধরনের ঘটনা; শুধু পাত্র পাত্রী আর ঘটনার স্থান ভিন্ন ! কী ঠুনকো এই সম্পর্ক! কী সস্তা একজন নারীর জীবন ! মনে আর না চাইলেই জীবন থেকে সরিয়ে দেয়া ! একটু রাগ হলেই মনের ঝাল মিটিয়ে জীবন নিয়ে নেয়া ! যৌতুক মানে টাকা দিয়ে অন্যের বধুরূপী দাসী হয়েও যদি পৃথিবীতে বেচেঁই না থাকা যায় তবে কেন এই বিয়ে নামের খেলা? কে বোঝাবে কাকে? যৌতুক ছাড়া কি কোন বিয়ে হয়?

মামলার তদারকী করতে গিয়ে যখন উপস্থিত নারী পুরুষ আর শিশুদের সামনে বলি “আপনারা যৌতুক নিয়ে/দিয়ে ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেবেন না।” তখন সেই চোখ গুলোতে যেন আমি আমার প্রতি বিদ্রুপ দেখতে পাই। মনে হয় তারা যেন মনে হাসে আর বলে ,“তুমি কী বুঝবা? বুঝতে হলে আমাদের এই জীবনে আসতে হবে।” সত্যিই হয়ত আমরা বুঝিনা, বুঝবোও না।

পেশাগত কারণে সব কথা বলা সম্ভব না। তবু কিছু বিষয় জানাতে ইচ্ছে করে যাতে অন্তত কারো কারো মনকে নাড়া দেয় সমাজের এই নির্মম দিক গুলো।

লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা থানার এপ্রিল মাসের যৌতুকের জন্য হত্যা মামলার এমই তথা স্বাক্ষ্যের স্মারকলিপি সাক্ষরের জন্য উপস্থাপন করা হলো| এতে মামলার তদন্ত ও প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমানে এজাহার নামীয় আসামী যৌতুকের টাকার দাবীর কার মারপিট করে হত্যা করায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এর ১১(ক) ধারার অপরাধ প্রাথমিক ভাবে সত্য প্রমানিত হওয়ায় বিজ্ঞ আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিলের অনুমতি চেয়ে এবং এজাহার নামীয় আসামী অন্যান্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দানের জন্য স্বাক্ষ্যের স্মারকলিপি দাখিল করা হয়েছে।

মনেপড়ল আমি এই মামলার ঘটনাস্থল হাতীবান্ধা থানা হতে আনুমানিক ৭ কিঃ মিঃ দক্ষিণ দিকে পাটিকাপাড়া ইউপির উত্তর পারুলিয়া গিয়েছিলাম ঘটনা ঘটার পরদিনই। বাইশ বছর বয়সী রাহিমা বেগমের (ছদ্মনাম) লাশ তখন পোস্ট মর্টেমের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে। তার পিতা ও অন্যান্যদের সাথে কথা হয়েছিল।

প্রায় চার বছর পূর্বে এক লক্ষ টাকা যৌতুক দিয়ে মোঃ দবিরুল ইসলাম (২৮)(ছদ্মনাম) এর সাথে রাহিমার বিয়ে হয়। পরবতীঁতে চার্জার ভ্যান ক্রয় করার জন্য আরো চল্লিশ হাজার টাকা যৌতুক দেওয়ার কথা ছিল। যৌতুকের বাকী টাকা পরিশোধ করতে না পারায় প্রায় প্রতিদিনই কারনে অকারনে মারপিট ও অত্যাচার চলে। প্রতিবেশী কেউ নিষেধ করতে গেলে তাকেও গালাগালি ও অপমান করার কারনে প্রতিবেশীরাও এগিয়ে আসতো না। এসব নিয়ে একাধিকবার বার বিচার সালিশও হয়। ঘটনার পনেরদিন পূবের্ও রাহিমাকে তার স্বামী মারপিট করে বাড়ি থেকে বের করে দিলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিচার সালিশ করে বাড়িতে উঠিয়ে দেন। কিন্তু গত ৭ এপ্রিল ২০২০ সন্ধ্যা অনুমানিক সাত টার সময় রাহিমার স্বামী আবার তাকে মারপিট করে ও হত্যা করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পরে রাহিমার বাবা বাদী হয়ে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আরো পাঁচজনসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

প্রধান অভিযুক্ত রাহিমার স্বামীকে গ্রেফতার করার পর সে বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃকাঃবিঃ আইনের ১৬৪ ধারা মোতাবেক জবানবন্দিতে দোষ স্বীকার করে বলে যে, ‘‘আমি তিন বছর আগে আমার স্ত্রীকে বিয়ে করে বাসায় আনি। বিয়ের ৪/৫ মাস পর আমার স্ত্রীর পেটে বাচ্চা আসলে আমার স্ত্রী আমাকে না জানিয়ে বাচ্চাকে নষ্ট করে। তার পর আর আমাদের বাচ্চা হচ্ছিল না। অথচ আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তাদের বাচ্চা হলে আমার মন খারাপ হয়। ঘটনার ৮/৯ দিন আগে আমি আমার স্ত্রীকে তার বাড়ী থেকে ভ্যান কিনে দেওয়ার জন্য বলি, তার পর আমার স্ত্রী তার বাবার বাড়ীতে যাইতে চায়। তখন শবেবরাতের পরে যাওয়ার জন্য বলি। গত ০৭/০৪/২০২০ তারিখ আমি ভাত না খেয়ে মাটি কাটার জন্য বাহিরে যাই এবং পরে এসে আমার খাবার চাহিলে আমার স্ত্রী গালিগালাজ করে। কিছুক্ষন পরে এসে আবার খাবার চাইলে আমার স্ত্রীর আমার মা বোনদের সাথে সংসার করতে বললে আমি আমার ডান হাত দিয়ে আমার স্ত্রীর বুকের উপর আঘাত করি। তখন সে মাটিতে পরে যায়। পরে আমার মা এসে দেখে আমার স্ত্রীর মারা গেছে। আমি বড় ভুল করেছি, যার জন্য অনেক কান্নাকাটি করেছি।’’

কিন্তু মৃত রহিমার এর পিএম রিপোর্টে The opinion regarding cause of death is remain pending until the chemical report will come at hand from Rajshahi বলে মতামত আসে। পরবর্তীতে ভিসেরা রিপোর্টে বিষ পাওয়া যায় নাই মর্মে মতামত প্রাপ্তির পর মৃত্যুর কারন সম্পর্কে চুড়ান্ত মতামত আসে যে, Considering postmortem examination findings and chemical analysis report of viscera. No opinion could be given regarding cause and nature of death as the injuries observed during postmortem examination are insufficient to cause of death.

“আমি বড় ভুল করেছি, যার জন্য অনেক কান্নাকাটি করেছি।’’
এই কথাটি মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না— এটা কি আদৌ সেই পাষন্ড স্বামীর মনের কথা? ফেসবুক থেকে পরিচিতি: আবিদা সুলতানা, পুলিশ সুপার, লালমনিরহাট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here