আমার দুই বন্ধুর স্মৃতি

0
87

বিভুরঞ্জন সরকার : আজ সকালে হঠাৎ দুজন মানুষের কথা কেন যেন খুব মনে পড়ছে। তাই তাদের নিয়ে কিছু না লিখে স্বস্তি পাচ্ছি না।

একজন মুকুল চক্রবর্তী আরেকজন সুলতান আহমেদ। মুকুল আমার ব্যাচমেট। পড়তো পদার্থ বিজ্ঞানে। সুলতান ভাই সিনিয়র। তিনি বাংলার ছাত্র, আমিও। মুকুল আর আমি জগন্নাথ হলে থাকতাম। সুলতান ভাই জহুরুল হক হলে। তবে আড্ডা দিতেন বেশি জগন্নাথ হলেই। জগন্নাথ হল ছিলো আমাদের আমলে ছাত্র ইউনিয়নের দুর্গ। মুকুল প্রথম দিকে জাসদ ছাত্রলীগের কর্মী ছিলো, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ঝাঁঝালো স্লোগানে কলাভবনের, হলের কড়িডোর কাঁপাতো। পরে অবশ্য আমাদের প্রভাবে মুকুলও ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল।

সুলতান ভাই ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে ছিলেন উচ্চকিত। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ভিয়েতনামের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের জন্য যে মিছিলে পুলিশের গুলিতে মতিউল-কাদের নিহত হন সেই মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন সুলতান ভাই।

আমার সঙ্গে কি করে যেন এই দুইজনেরই হয়েছিল যাকে বলে গলায় গলায় ভাব। কত সময় যে আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি। কত কি যে করেছি! কত স্বপ্নের জাল বুনেছি।

পৃথিবীটা সব মানুষের বাসযোগ্য করার জন্য সে কি ব্যাকুলতা-আকুলতা আমাদের। বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ নিরক্ষর থাকবে না। বেকার থাকবে না। সবাই মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে। রোগে চিকিৎসা পাবে। আমাদের সবটুকু সময় তাই সংগঠন গড়ে তোলার কাজে ব্যয় করতাম। বাস্তবিক অর্থেই আমাদের ‘নাওয়া-খাওয়া’র ঠিক ছিলো না। এমন অনেকদিন গেছে সত্যি সত্যি পেটে দানাপানি পড়েনি। তাতে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিলো না।

আমাদের বয়সী অনেক ছাত্র তখন রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হলের সামনে দিয়ে ঘুর ঘুর করতো। বিকেলে জটলা করতো। বন্ধু জোটানো-পটানোর জন্য কতোজনের কতো কোশেশ। যারা সফল হতো তাদের ভাবসাবই ছিলো আলাদা। অসফলরা ওদের হিংসা করতো।

আমাদের, মানে যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, ওসব করার সময় হতো না। দু’একজন যে ব্যতিক্রম ছিলেন না তা নয়! আবার সাংগঠনিক শৃঙ্খলার কারণে আমাদের একটু সমঝেও চলতে হতো।

তাই বলে আমাদের কি কোনো সাধ-আহ্লাদ ছিলো না? বয়সের দোষ বলে যে কথাটা আছে, আমাদের কি তা ছিলো না? ছিলো নিশ্চয়ই। কিন্তু তা অবদমনের ক্ষমতা কি করে যেন আমরা অর্জন করেছিলাম।

দীঘল কেশী কাউকে দেখে আমাদের মন কি গেয়ে উঠতো না, ‘কুন্তল বন্যা, কে দিলো তোমায় বলো কন্যা’? মনের ভেতর আনচান করতো কিন্তু প্রকাশ হতো না।

মুকুল ঠোঁট দিয়ে চমৎকার শীশ দিতে পারতো। কয়েকটি গানের এমন সুন্দর সুর তুলতো যে শুনলে কানমন জুড়িয়ে যেতো। মাঝেমাঝে গভীর রাতে হলের দেওয়াল টপকে আমি, মুকুল এবং আরো দুএকজন শামসুন্নাহার হলের সামনের রাস্তায় চলে যেতাম। মুকুল শীশ দিয়ে সুরের মূর্ছনা তুলতো : ‘এই রাত শুধু তোমার আমার’!

শামসুন্নাহার হলের বারান্দায় লক্ষ্য করতাম একে একে অনেক ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়াচ্ছে। কয়েক মিনিট যেন মোহাবিষ্ট থাকতাম আমরা। ব্যস, ও টুকুই! তাতেই আমরা আমোদিত হতাম। ওগুলো কি প্রেম ছিলো? নাকি ভালো লাগার কিছু মুহূর্ত? চাঁদপুরের মতলবের মুকুলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরও কিছুদিন চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিলো। ও এলাকায় চলে গিয়েছিল। দেশে বিপ্লব হয়নি, সবার জন্য সমানাধিকার নিশ্চিত হয়নি। মুকুলের জীবনটাও যেন কেমন শেকড় থেকে উপড়ে গিয়েছিল! আহা, মুকুল কোথায় গেলি বন্ধু!

মুকুলের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। ও বেঁচে আছে কি না তাও জানি না। আজ কেন মুকুল আমার স্মৃতির দুয়ারে এসে হানা দিল? বন্ধু মুকুল, ক্ষমা করে দিস এই অকৃতজ্ঞ অভাজনকে। মানুষের জীবন এমনই। যাকে ছাড়া চলবে না বলে মনে করা হয়, দেখা যায় সময়ের স্রোত তাকে ছাড়াই দিব্যি টেনে নিয়ে যায়!

সুলতান ভাই। কি প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ ছিলেন। হাসি-গল্পে মাতিয়ে রাখতেন। তার নীতি ছিল : ‘নো চিন্তা, ডু ফুর্তি’। দুশ্চিন্তাহীন এক নতুন জীবনের সন্ধানী ছিলেন সুলতান ভাই। কতো রকম পাগলামিই না করতেন। ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সভাপতি ছিলেন। একসঙ্গে কতো ধরনের কাজই না আমরা করেছি।

তখন আমরা মাঝে মাঝে বলাকা সিনেমা হলে নাইট শো সিনেমা দেখতাম। রাত বারোটায় শো শেষ হয়েছে, সুলতান ভাইয়ের মনে হলো ছবির নায়িকাকে গিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে আসি! যাহা ভাবা তাহা কাজ। অতো রাতে ছোটা হলো অলিভিয়ার বাসায়। পাগল আর কাকে বলে! তার পাগলামির সহযাত্রী আমি। দারোয়ান গেট খুলবে না।
সুলতান ভাই বললেন, যাও ম্যাডামকে বলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট সুলতান এসেছে।

দারোয়ার ভেতরে গেলো এবং একটু পরে হাসি মুখে এসে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলো। রাতের পোশাকপরা নায়িকা অলিভিয়াকে অভিনন্দন জানালেন সুলতান ভাই। ছবির নাম ছিলো ‘যখন বৃষ্টি এলো’ ইংরেজি টাইটেল ছিলো : The Rain.
সুলতান ভাই অলিভিয়ার কাছে জানতে চাইলেন, ‘যখন সুলতান এলো’র ইংরেজি কি হবে The Sultan?
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন অলিভিয়া।
সুলতান ভাইয়ের চোখমুখ ঠিকরে বের হচ্ছে উচ্ছ্বাস। খুব ছেলেমানুষি কি?
আমরা বিদায় নিলাম।
আরেক দিন আলমগীর কবিরের ‘সূর্যকন্যা’ দেখে বেরিয়ে সুলতান ভাইয়ের মনে হলো নায়িকা জয়শ্রী কবিরকে অভিনন্দন জানাতে হবে।

আমাকে সঙ্গে নিয়ে রাত দুপুরে হানা দিলেন আজিমপুরে আলমগীর কবিরের বাসায়। আলমগীর কবিরের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো। আমি ‘মুক্তকণ্ঠ’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন বের করতাম। তাতে চলচ্চিত্র বিষয়ে কবির ভাইয়ের লেখা ছাপা হতো। সুন্দরী রূপসী জয়শ্রী কবির সে রাতে আমাদের চাপ্যায়িত ( চা পানে আপ্যায়িত) করেছিলেন।

আজকের দিনে এসব ভাবা যায়! গাঁজাখুরি গল্প মনে হলেও এগুলো সত্য এবং এগুলো সম্ভব ছিলো সুলতান ভাইয়ের পক্ষেই।
আচ্ছা, সুলতান ভাইয়ের মতো আমুদে মানুষটি কোথায় হারিয়ে গেলেন?
খুব মনে পড়ছে, মন পুড়ছে।
কেউ ভোলে আর কেউ ভোলে না অতীত দিনের স্মৃতি!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here