এ জীবন সুবর্ণার

0
340

২০ বছর আগে সুবর্ণা বলেছিলেন, মাইক্রোস্কোপের নিচে থাকা ব্যাকটেরিয়ার জীবন তিনি চান না। আজ দুই দশক পরে এসেও তাঁর মুখে একই কথা। শুধু মাইক্রোস্কোপের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া যেতে পারে ‘ফেসবুক’। কারণ, একজন শিল্পী সেই সাদা–নীলের দুনিয়ায় তুলে ধরছেন তাঁর পুরো জীবন। আর এটা, সুবর্ণার ভাষায়, শিল্পীর জন্য কোনো দিক থেকেই মঙ্গলজনক নয়। নিজেকে একটা পর্যায় পর্যন্ত সেখানে প্রকাশ করতে চান তিনি, তবে সেই পর্যায়টা কখনো ব্যক্তিজীবনকে ছুঁতে পারে না। ফেসবুক প্রজন্মের জন্মের আগেও সুবর্ণা ছিলেন ‘প্রাইভেট পারসন’, এখনো তিনি তা–ই।

সে সময় ‘স্টার’ পরিচয়টা নিয়ে আপত্তি ছিল সুবর্ণার। এখনো কি তা–ই? ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি এনে সুবর্ণা জবাব দেন, এখন তো সবাই ‘তারকা’! তবে আসল তারকার পরিচয় পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন তিনি, সত্যিকারের তারকা কে, এটা সময়ই বলে দেবে। স্টার হওয়ার প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। এই পরিচয়ের সঙ্গে অনেক দায়িত্বও এসে বর্তায়। সেই দায়িত্ব পালন করে পরীক্ষায় উতরে গেলেই একজন শিল্পী নিজেকে স্টার বলতে পারেন।

সুবর্ণা যে কয়েক প্রজন্মের দর্শকের কাছে এক দ্যুতিময় তারকা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মঞ্চের শকুন্তলা, যৈবতী কন্যার মন থেকে শুরু করে টেলিভিশনের কোথাও কেউ নেই–এর মুনা, এমনকি কাছের মানুষ–এর ইরানি হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের চোখে লেগে থাকে ‘এন্টারটেইনার’ সুবর্ণার অভিনয়। হ্যাঁ, ২০ বছর পর এসে একটা খুব জুতসই বিশেষণ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। সবাই যেখানে ‘স্টার’, ‘তারকা’, ‘সেলিব্রিটি’, ‘কিংবদন্তি’ পরিচয় আওড়াতে আওড়াতে একটা ছকে আটকে গেছেন, সেখানে ‘এন্টারটেইনার’ পরিচয়টি নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে সুবর্ণার চোখে দেখা গেল উজ্জ্বল আভা। বললেন, ‘এন্টারটেইনার পরিচয় নিয়ে অনেকে আপত্তি করে। তবে আমার কাছে মনে হয়, এতে খারাপ কী। এতে আমি কোনো নেতিবাচক কিছু পাই না।’

একটা সময় শুধু গণমাধ্যমেই পাওয়া যেত তারকাদের খোঁজখবর। এখন তো মাধ্যমের অভাব নেই—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব আরও কত–কী। সুবর্ণা যেই ‘প্রাইভেট’ জীবনের কথা বলতেন একসময়, সেটা কি এই যুগেও যাপন সম্ভব? মনে মনে আসা এই প্রশ্নটার জবাব আমাদের সাবলীল আলাপে দু–চার কথাতেই উঠে আসে, ‘আজ অবধি আমি ব্যক্তিজীবনকে একান্তই ব্যক্তিগত রেখে চলেছি। সেখানে কোনো কালেই কোনো পরিবর্তন আসেনি। মানুষ দেখা হলে একটা ছবি বা সেলফি তোলার জন্য অধীর হয়ে ওঠে। তবে সেটা পরিস্থিতি বুঝে নিয়ন্ত্রণ করতে জানতে হয়।’ বোঝা যায়, সুবর্ণা তাঁর এ জীবনকে ঠিক তাঁর মতো করেই নিজের ‘একান্ত ব্যক্তিগত’ ট্যাগ দিয়ে একান্তই করে রেখেছেন।

১৯৯৮ সালের ৫ নভেম্বরের ক্রোড়পত্র আনন্দ–এ সুবর্ণা মুস্তাফার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, ‘মুডি’ (গম্ভীর), ‘আনসোশ্যাল’ (অসামাজিক), ‘স্নোবিশ’ (নাক উঁচু)—তাঁকে নাকি অনেকে এমনটাই ভাবেন। তিনি কি আদৌ এমন? সে সময় নিজেকে এক রকমভাবে ব্যাখা দিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, অসামাজিক তিনি মোটেও নন। তবে নিজের গণ্ডিতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর। অচেনা গণ্ডিতে গেলে একটু চুপচাপ থাকেন, তাই সে সময় তাঁকে গম্ভীর ভাবেন অনেকে। আর ‘স্নোবিশ’? নানান পরিস্থিতিতে তিক্ত সত্য বলায় নাকি নাক উঁচুর বিশেষণটি তিনি পেয়ে গেছেন। ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর আসার ঠিক দিন সাতেক আগে তাঁকে আবার আমরা প্রশ্ন করি, ‘এই তিন বিশেষণের সঙ্গে কি সময়ের ব্যবধানে নতুন কিছু যোগ হলো?’ হাসলেন সুবর্ণা। বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাকে নাকি ইদানীং অনেকে ভয় পায়।’ পাল্টা প্রশ্ন তাঁর, ‘আচ্ছা, আমি ভয় পাওয়ার মতো কিছু বলি?’ পুরোনো কথার জের ধরে এই শিল্পী আবার বললেন, ‘সস্তা হওয়ার চেয়ে নাক উঁচু হওয়া ভালো। তাই স্নোবিশ বিশেষণটিকে স্বীকার করেই নিচ্ছি।’

 প্রথমবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্যাকেজ নাটককে একটা ‘সংকট’ বলে জানিয়েছিলেন সুবর্ণা। এত সময়ের পালাবদল দেখা এই শিল্পীর চোখে এখনকার সংকট কী? সুবর্ণা একটা নিশ্বাস নিয়ে বলা শুরু করলেন, ‘এখন তো ভয়াবহ সংকট সব দিকে। ২০ বছরে দেখো, সবকিছুর দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, খাদ্যের দাম বেড়েছে, জীবনযাপনের খরচ বেড়েছে। কিন্তু আনুপাতিক হারে নাটকের দাম কিন্তু কমেছে, কমেই যাচ্ছে। এর ফলে টিভি নাটক একটা ভয়াবহ সংকটের দিকে যাচ্ছে। মানহীন নাটক হচ্ছে। হাসির নাটকের নামে হচ্ছে ভাঁড়ামি। আর সুস্থ নাটকের সাড়ে সর্বনাশ করে দিয়েছে টিআরপি নামের সর্ষের ভূতটা।’

কথায় কথায় সুবর্ণার সঙ্গে অনেক সংকট–শঙ্কা, ভালো–মন্দ লাগার কথা হয়, স্মৃতি রোমন্থন হয়। জানা যায়, এখনো এই শিল্পী মনে করেন ভালো অভিনয়ের জন্য প্রচুর পড়তে হবে, ছবি দেখতে হবে, নাটক দেখতে হবে। সেই সঙ্গে আগামীর শিল্পীদের জন্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক থাকার টোটকা হিসেবে তিনটি পরামর্শ দেন তিনি—১. কাজের প্রতি শ্রদ্ধা, ২. উপভোগ করে কাজ করা, ৩. প্রচুর প্রচুর পরিশ্রম।

বিগত ২০ নিয়ে কথা শেষে আগামী ২০ বছর নিয়েও জানতে চাই চার দশক ধরে প্রিয় অভিনেত্রীর আসন দখল করে থাকা এই শিল্পীর কাছে। তিনি বলেন, ‘তত দিন বাঁচব না! তবে অভিনয়টা তত দিন করে যাব, যত দিন এ কাজটা নিজে উপভোগ করব, সুস্থ থাকব। আর যেদিন দর্শক দেখে বলবে, উফ্ আবার উনি—তার আগে শেষ করতে চাই। তার আগেই চাই যেন বোধোদয় হয় যে আর চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here