কূটনৈতিক তৎপরতায় আশা দেখছে বিএনপি

0
193

ক দশকের আন্দোলনে ব্যর্থতা, বৃহত্তর ঐক্য গঠনে অনিশ্চয়তার মধ্যেও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আশার আলো দেখাচ্ছে বিএনপিকে। এক্ষেত্রে আপাতত একলা চল নীতিতে থাকলেও ভবিষ্যতে বৃহত্তর ঐক্য হলে সম্মিলিতভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়াবে তারা। এরই মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছে বহির্বিশ্বের প্রভাবশালীদের কাছ থেকে। এছাড়া ভারতকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করছে বিএনপি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি সহযোগিতা পেতে গত এক বছর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। বিএনপির কূটনৈতিক সংশ্লিষ্ট নেতাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৌড়ঝাপ, লবিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নানামুখী তৎপরতা চালিয়েছেন। এর ফল হিসেবে জাতিসংঘের মহাসচিবের আমন্ত্রণ পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরইমধ্যে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সংস্থাটির রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মিরস্লাভ জেনকি, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার পাশাপাশি ১৮টি থিংক ট্যাংক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সবগুলো বৈঠকেই আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে বাংলাদেশের সঙ্কটময় পরিস্থিতি উত্তরণে পদক্ষেপ আশা করেন বিএনপি মহাসচিব। পাশাপাশি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্টি জটিলতা, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়া বিলম্ব, নির্বাচনকে ঘিরে সরকারের তৎপরতা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, গুম, খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। এছাড়া লিখিতভাবে বাংলাদেশের

আসন্ন নির্বাচন যাতে স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ করার সহযোগিতা করতে জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে বিএনপি। জবাবে বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে সহযোগিতার মৌখিক আশ্বাস পেয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র সফরের শেষদিনে শুক্রবার মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বিএনপি প্রতিনিধ দল ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযেগ্যা নির্বাচন চায় তারা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যই তাদের বক্তব্য। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে মতবিনিময় করেন ফখরুল। এসময় অন্তত ৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত দলের এক নেতা জানিয়েছেন, খুব ভালো বৈঠক হয়েছে। আগামী মাসে বিএনপি স্টেট ডিপার্টমেন্টে আবারও ফলোআপ বৈঠক করতে পারেন।

থিঙ্কট্যাংকদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন, কোটা পদ্ধতি ও নিরাপদ সড়েকর দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় থিঙ্কট্যাংকরা জানতে চান, ক্ষমতায় এলে তারা কী ধরনের পরিবর্তন আনবেন। এ ব্যাপারে বিএনপি নেতারা ভিশন- ২০৩০ এর আলোকে কথা বলেন।

জাতিসংঘ, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং সেখানকার থিঙ্কট্যাংকদের সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপিকে অনেকটা ‘আত্মবিশ্বাস’ দেখাচ্ছে। সেখানকার বৈঠকের সূত্র ধরে দলটি মনে করছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে সরকার আরও চাপে পড়বে।

এ ব্যাপারে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সরকার গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল নয়। এটা যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ জানে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ ভূমিকা রাখে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা আছে।

এদিকে তিনদিনের সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছেন মির্জা ফখরুল। গতকাল সকাল সাড়ে ৮ টায় লন্ডন পৌঁছেছেন তিনি। সেখানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়বস্তু অবহিত করে পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করে বলে জানা গেছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক শেষে রাতেই তাদের লন্ডন ছাড়ার কথা রয়েছে। আজ বিকাল ৫ টায় ২০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তাদের ঢাকায় পৌঁছানোর কথা।

বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে দলের সিনিয়র এক নেতা জানান, বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতিতে ফের সঙ্কট তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কায় রয়েছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। আঞ্চলিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা চিন্তা করে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে উচ্চারিত ওইসব দেশগুলোর ভূমিকা প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও অন্তরালে সবাই সক্রিয়। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে জাতিসংঘ উদ্যোগ নিয়ে সফল না হওয়ায় এবার আরও কার্যকরী উদ্যোগ নিতে পারে। প্রথমত, আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার পর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে তাকে জাতিংঘের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে যেমন বিশেষ দূত পাঠিয়েছিল এবারো দূত পাঠাতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে ক্ষমতাসীনদের চাপ দিতে পারে।

বিএনপি সূত্রমতে, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে নানা তৎপরতা পাশাপাশি ভারত যাতে আসন্ন নির্বাচনের নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকে তা নিয়ে বিএনপি কাজ করেছে। বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল কয়েক মাস আগে ভারত সফরও করে এসেছে। ওই সফরে বিএনপি কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী, ক্ষমতাসীন বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতা এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ সুশীলসমাজের কয়েকজন নেতার সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে। জবাবে সন্তোষজক বক্তব্য পেয়েছেন ভারতীয়দের কাছ থেকে।

বিএনপির নেতারা আশা করছেন, ভারত ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে যেভাবে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিল, এবার সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

সূত্রমতে, দলীয় কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বৃহত্তর ঐক্য গঠনে আশাবাদী হয়ে উঠেছে বিএনপি। যুক্তফ্রন্ট, গণফোরামসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য গড়ে উঠলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারবিরোধীদের তৎপরতা আরও বাড়বে এমন আশা বিএনপি নেতাদের। কারণ ভোটের মাঠে কামাল হোসেন, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অন্য নেতারা বড় নিয়ামক না হলেও আন্তর্জাতিক পরিম-লে তাদের একটা পরিচিতি আছে। বৃহত্তর ঐক্য তৈরি হলে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ে তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। সূত্র: যায়যায়দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here