খালেদা জিয়া কী নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন?

0
127

কয়েকমাস পরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার প্রার্থী হতে পারবেন কিনা এনিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনা। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার এ সংশয় দেখা দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলছেন, নির্বাচনে অংশ নেবার যোগ্যতা নির্ধারিত হয়ে বাংলাদেশের জন প্রতিনিধিত্ব আইনে। এতে বলা হয়েছে, কেউ যদি কোন ‘নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে’ দোষী সাব্যস্ত হয়ে দু’বছরের বেশি মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হন- তাহলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবার যোগ্যতা হারাবেন।

তবে মূল দণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তি যদি উচ্চ আদালতে আবেদন বা আপিল করেন, এবং সেই আপিল বিচারাধীন থাকে- তখনও নির্বাচনে লড়ার ওপর সেই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে কিনা- এ বিষয়ে আইনে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, কোন দণ্ডিত ব্যক্তি যখন নির্বাচনে প্রার্থী হবার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন – তখনই রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা থাকে আইনি ব্যাখ্যা সাপেক্ষে এই মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা খারিজ করার। মনোনয়নপত্র যদি কোন কারণে খারিজ হয়ে যায়, তাহলে সেই ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের কাছে আপীল করতে পারেন – কিন্তু সে আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ। এর নিষ্পত্তি হতে হতে নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে, এমনও হতে পারে।

তবে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার সাজার রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল নিস্পত্তি করতে হাইকোর্টের প্রতি আদেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ। এর ফলে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময় পার করছে দলটি।

কিন্তু আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, এর পর খালেদা জিয়া কি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। এ নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে, কারণ খুব নিশ্চিতভাবে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।

চলিত ধারণা হলো, আপিল চলাকালীন তিনি নির্বাচন করতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে দণ্ড স্থগিত করার ওপর। দণ্ড স্থগিত না হলে যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা অর্জন করা যায় না, তার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে। ২০১৫ সালের ঢাকা দক্ষিণের মেয়র নির্বাচনে অন্যূন দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত নাসির উদ্দিন আহমেদ মেয়র পদে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, যা রিটার্নিং অফিসার বাতিল করে দেন। কারণ, নাসির উদ্দিন হাইকোর্টে আপিল আবেদন করলেও আদালত ‘বিচারিক আদালতের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেননি’।

এছাড়াও দণ্ডপ্রাপ্তদের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতার বিষয়টি ১৯৯৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম এ কে এম মাইদুল ইসলাম (রিট পিটিশন নং ১৭৩২ / ১৯৯৬) মামলার মাধ্যমে একবার আদালতে উত্থাপিত হয়। সে সময় এরশাদ জনতা টাওয়ার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন। মাইদুল ইসলাম তা চ্যালেঞ্জ করেন। রিটার্নিং কর্মকর্তা এরশাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন, যার বিরুদ্ধে মাইদুল ইসলাম আদালতের আশ্রয় নেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাঁর রায়ে [এ কে এম মাইদুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, ৪৮ ডিএলআর (এডি) ১৯৯৬] এরশাদের অযোগ্যতার প্রশ্নটি সুরাহা না করে বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে ‘নির্বাচনী বিরোধ’ হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত বলে মত দেন। একই সঙ্গে বিচারকের এখতিয়ারহীনতা (coram non judice) কিংবা আইনগত বিদ্বেষের (Malice in Law) অভিযোগ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্বাচনী বিরোধের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় বলে পর্যবেক্ষণ দেন। উল্লেখ্য, নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসার দায়িত্ব নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের, আদালতের নয়।

বিএনপি নেতাদের মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীরা বলছেন, শুধু খালেদা জিয়া নয়, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র অনেক নেতার মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষের দিকে। আগামী নির্বাচনের আগে অনেকের মামলার রায় দেয়া হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সে ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আপিল দ্রুত শেষ করে সাজা বহাল থাকলে যে কেউ নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারেন। তাই মামলা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল গণমাধ্যকে বলছেন, খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কিনা তার চাইতেও বড় প্রশ্ন হচ্ছে: নির্বাচনের সময় তিনি জেলের ভেতরে থাকবেন না মুক্ত থাকবেন।

আসিফ নজরুলের কথায়, খালেদা জিয়া যদি নির্বাচনে অংশ নিতে না-ও পারেন, তবুও তিনি যদি জামিনে থাকেন এবং প্রচারাভিযানে অংশ নিতে পারেন – তাহলে এই কারাদণ্ড বিএনপির জন্য নেতিবাচক না হয়ে বরং ইতিবাচক হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোন কারণে যদি বেগম জিয়া জামিন না পান, এবং তার বিরুদ্ধে আরো মামলা রয়েছে সেটাও মনে রাখতে হবে – তিনি যদি ক্যাম্পেইনটা করতে না পারেন বিএনপি পরিস্থিতিটা কতটা কাজে লাগাতে পারবে – সেটা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকবে’।

আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘তাই বেগম জিয়া নির্বাচনের সময় জামিনে মুক্ত থাকবেন কিনা এটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে’।

প্রসঙ্গত, গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে আছেন। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ছয় মাসের কারাবাস পূর্ণ হবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর।

এদিকে, বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার দায়ের করা আপিল শুনানি আগামী ২ অক্টোবর পর্যন্ত মুলতবি রেখেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এ মামলায় ৩ অক্টোবর পর্যন্ত তার জামিনের মেয়াদও বাড়িয়েছেন আদালত।

অন্যদিকে, মাস দুয়েকের মধ্যেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে। সূত্র : প্রথম আলো, যুগান্তর, আমাদেরসময়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here