গরু হারালে এমনই হয় মা!

0
303

চৈত্রদুপুরে গরু হারিয়ে প্রলাপ বকা কৃষকের গল্পটি অনেকেরই জানা। তবু আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি। এক কৃষকের হালের বলদ হারিয়ে যায় কৃষক চৈত্রের প্রচণ্ড খরতাপ উপেক্ষা করে মাঠের পর মাঠ, গ্রামের পর গ্রাম চষে শেষে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ঘরে ফিরে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এক গ্লাস পানি দাও না বোন!
স্বামীর এমন সম্বোধনে স্ত্রী তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে জবাব দেন, মিনসের কি ভিমরতি ধরেছে? নিজের বউকে বলছে বোন।

স্বামী জবাবে বললেন, চৈত্রদুপুরে গরু হারালে এমনই হয় মা।

চৈত্রদুপুরে গরু হারিয়ে কৃষকের যেমন মাথা ঠিক ছিল না, তেমনি আমাদের দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে এখন ক্ষমতায় ফেরার জন্য দলীয় নেতৃত্বেরও মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। ক্ষমতায় ফেরার জন্য তারা এখন প্রকাশ্যে-গোপনে নানামুখি তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।

আমাদের সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান ‘খুঁটি-ভাবমূর্তি-শক্তির সমন্বয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল হচ্ছে?’ শিরোনামে দুদিন আগে একটি আগ্রহোদ্দীপক ছোট্ট প্রতিবেদন লিখেছেন। শিরোনাম থেকেই বিষয়বস্তু বুঝতে পাঠকদের কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রতিবেদনটি পড়ে খুঁটি এবং ভাবমূর্তি নিয়ে আমি রীতিমতো দুর্ভাবনায় পড়ে গেলাম। খুঁটি হিসেবে নাকি ভাবা হচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্যার ফজলে হোসেন আবেদের নাম। সত্যি, এরা কি রাজনীতিতে খুঁটি হওয়ার মতো। ড.ইউনূস কিন্তু আগেই প্রমাণ করেছেন রাজনীতিতে খুঁটি হিসেবে কতটা নড়বড়ে এবং দুর্বল। এক এগারোর সময় রাজনীতিতে নেমে তিনি যেভাবে ডিগবাজি খেয়েছেন সেটা তার নামের ওজন ও মর্যদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ব্যবসায়ে সফল হলেই কিংবা নোবেল পুরস্কার পেলেই কেউ রাজনীতির খুঁটি হন না। ইউনূস সাহেব সামাজিক ব্যবসা তত্ত্ব নিয়ে কাজ করুন, পৃথিবীর দেশে দেশে তরুণ সমাজকে উদ্দীপ্ত করে তুলুন, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে সম্মানের আসনে বসাতে চেষ্টা করুন, সেটাই তার উপযুক্ত জায়গা। তাকে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে কেউ রাজনীতির ঘর বানাতে গেলে তাকে অচিরেই গাইতে হবে : কি আশায় বাধি খেলাঘর বেদনার বালুচরে!

স্যার ফজলে হোসেন আবেদ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এনজিও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা। সফল মানুষ। রাজনীতির খুঁটি হওয়ার দুর্বুদ্ধি অন্তত তার হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। ঋণ বিতরণকারী এনজিওদের অনেক কর্মী-সমর্থক। কিন্তু এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিলে ঋণ গ্রহিতা যে ঋণদাতাকে অথবা তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোট দেন না, তার প্রমাণও আমাদের হাতের কাছেই আছে। প্রশিকা নামের একটি বড় এনজিওর প্রধান নির্বাহী ড. কাজী ফারুক আহমেদ রাজনীতিতে নেমে কেমন বেহাল হয়েছেন তা কি আমরা ভুলে গেছি? বিএনপি এসব খুঁটি খুঁজে সময় ব্যয় না করে দল গোছানোর কাজটি করা উচিত বলে অনেকে মনে করেন।

এবার আসছে ভাবমূর্তি। ড. কামাল হোসেন এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ‘পরিচ্ছন্ন’ ভাবমূর্তি ব্যবহার করে বিএনপি নাকি সম্মিলিত বিরোধী দল গঠনের তোড়জোড় করছে। কিন্তু এই দুই প্রবীণ রাজনীতিবিদের কি আদৌ কোনো ভাবমূর্তি অবশিষ্ট আছে? একজন বললেন, তাদের ভাব কিছু থাকলেও মূর্তি বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না। এই ভাবমূর্তি নিয়ে মানুষের কাছে গেলে সাড়া পাওয়া যাবে নাকি তাড়া খাওয়া যাবে, সেটা অবশ্য পরীক্ষ প্রার্থনীয়।

একটি গল্প মনে পড়ে গেল। সম্ভবত ১৯৭৪ সালের কথা। টিএসসিতে শিক্ষানীতি নিয়ে একটি আলোচনা সভা। প্রধান অতিথি ড. মো. এনামুল হক। ছাত্র নেতারা ভাষণে মূলে যা বললেন তা হলো , আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। না হলে আমারা যুগের চাহিদা পূরণ করে এগিয়ে যেতে পারবো না।

এনামুল হক তার ভাষণে বললেন, তা বাবারা, শিক্ষা ব্যবস্থাটা ঢালবে কে আর সাজাবে কে? অর্থাৎ স্যার এটাই বলতে চেয়েছিলেন যে, পরিবর্তন শুধু চাইলেই হবে না। পরিবর্তন কার হাত ধরে হবে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি নিজেদের বর্তমান সরকারের বিকল্প হিসেবে ভাবছে এবং দেশ-বিদেশে ধরনা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু তারা কি মানুষের কাছে ঢেলে সাজানোর উপযুক্ত প্রমাণ করতে পেরেছে? নাকি তারাও সেই দৌড়ে আছে : এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই!

লেখক: গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক,  দৈনিক আমাদের নতুন সময়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here