ঘরের বাইরে নারী কেন এত প্রশ্নের মুখে?

0
79

শামিমা শামিম প্রতিদিন কর্মস্থলে যান নিজের স্কুটিতে করে। নিজেই চালান। আজ আমি তার সঙ্গী হলাম।

আমি খেয়াল করলাম, রাজধানী শহর ঢাকার রাস্তায় একটা মেয়ে স্কুটি চালিয়ে যাচ্ছে এটা যেন কারো নজর এড়াচ্ছে না। আরো খেয়াল করলাম ট্রাফিক সিগনাল বা জ্যামে থাকার সময় আশেপাশের আরোহীদের বাঁকা চাহনি। কয়েকজন রিক্সাচালকের ব্যাঙ্গাত্মক হাসি।শামিমা শামিম বলছিলেন এটা তার প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতা।

“যখন রাস্তায় বের হই তখন তারা স্কুটির চেয়ে আমার শরীরের দিকে বেশি চেয়ে থাকে। সব থেকে ভয়ংকর হল স্কুটি চালানোর সময় পিছন থেকে অনেক ছেলে আছে যারা মোটরবাইক নিয়ে টার্গেট করে, ধাক্কা দেওয়ার জন্য। আমার সাথে এমন ঘটনা অনেকবার হয়েছে। একবার তেজগাঁ লিংক রোডে ২/৩ টা বাইক এবং প্রতিটাকে তিনজন করে ছেলে। আমি দেখলাম আমার আর কোন জায়গা নেই। তখন আমি থেমে গেলাম। যদি আমি সচেতন না হয়ে একই গতিতে চালাতাম তাহলে ঐদিন নিশ্চিত আমার বড় একটা অ্যাকসিডেন্ট হত।”

ঢাকায় রাস্তায় এখন অনেক মেয়েকেই স্কুটি চালাতে দেখা যায়, এমনকি মেয়েদের দ্বারা চালিত অ্যাপ ভিত্তিক রাইডও রয়েছে। শামিমা শামিম স্কুটি চালান আরো আগে থেকে। তখন হাতে গোনা দুই একজন নারীকে দেখা যেত চালাতে।

তখনকার সাথে এখনকার কি কোন পরিবর্তন হয়েছে?

শামিমা শামিম বলছিলেন “কোন পরিবর্তন হয় নি। এখন তো আমি চেষ্টা করি ১০টা মধ্যে বাসায় ফিরতে। কারণ বেশি রাত হলে রাস্তায় কী ধরণের দুর্ঘটনা ঘটে কে জানে। যে বাসায় থাকি সেখানেও অলিখিত একটা সান্ধ্য আইন জারি করা। ১০টার মধ্যেই বাসায় ফিরতে হবে। যেখানে আমার ছেলে বন্ধুরা রাত ১২টা পর্যন্ত শুধু মাত্র আড্ডা দেয়ার জন্য বাইরে থাকে সেখানে আমাকে মাথায় রাখতে হয় সব কাজ ফেলে ১০ টার মধ্যে বাসায় ফেরার তাড়া”।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মিলিত হয়েছেন বাংলাদেশ ওম্যান রাইডার্স ক্লাবের দুই সদস্যা।

আর এখানেই প্রশ্ন উঠে ‘কিন্তু কেন’?। পুরুষরা যদি বাইক চালিয়ে কর্মস্থলে যেতে পারেন বা কে কত পারদর্শী তার প্রতিযোগিতা হতে পারে তাহলে নারীরা নয় কেন?

এত গেল দৈনন্দিন জীবনের রাস্তায় চলার ক্ষেত্রে ছোট একটা উদাহরণ। আরো অনেক গল্প আছে যেগুলো শুনলে অবুঝের মতই আপনার মনে প্রশ্ন উঠতে পারে কিন্তু কেন।

বীনা রহমান। এই মেয়েটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্সের কাজ করেন । কাজের প্রয়োজনে তাকে সপ্তাহে কয়েকদিন নাইট শিফট করতে হয়। কিন্তু প্রশ্নের মুখে পরতে হয় তাকেও।

তিনি বলছিলেন “রাতে বের হয়ে যাই সকালে ফিরি। আমার আশে-পাশের ফ্ল্যাট থেকে আমার মা-কে জিজ্ঞেস করেছে আপনার মেয়ে এত রাতে কোথায় যায়? আসলেই আমি এই কাজ করি কিনা সেটা নিয়েও তাদের সন্দেহ।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ইন্সটিটিউটের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হকের সাথে কথা বলতে। জানার চেষ্টা করছিলাম ঠিক কি কারণে সমাজে যে কাজ পুরুষ করতে পারে, নারী করতে গেলে তাকে কেন শুনতে হয় বিচিত্র, অশালীন কথা।

সন্ধ্যার পরেই মেয়েদের বাড়ী ফেরার তাড়া থাকে

মি. হক বলছিলেন “নারীদের যে আচরণগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে সেটা একটা সাবলীল আচরণ। কিন্তু পুরুষ সদস্যরা সেটাকে স্বাভাবিকভাবে দেখছে না। এর কারণ হল পুরুষ সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছে মেয়েদের আচরণগুলো এই এই বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে হবে। মেয়েদেরকে একটা নির্দিষ্ট আচরণিক গণ্ডির মধ্যে দেখতে পছন্দ করে। এর বাইরে যদি কোন মেয়ে কোন আচরণ করে তখন সেটা তারা মেনে নিতে পারেনা। এমনকি আমাদের দেশে যারা নাগরিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত তারাও এটা মেনে নিতে পারে না। কিন্তু মেয়েরা সেই সনাতনী পুরনো ধাঁচে চলতে থাকবে সেটা হতে পারে না।”

যে প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে এই প্রসঙ্গটি নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবার নতুন নতুন পরিস্থিতির মুখে মেয়েদেরকে পড়তে হয়, যেটাকে পরিস্থিতি না বলে বলা উচিত হয়রানি, যৌনহয়রানি, শারীরিক, মানসিক হেনস্থার শিকার। সম্প্রতি একটা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে যেখানে ৬ মিনিটের বেশি সময় ধরে দেখা গেছে, কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে সিএনজির মধ্যে একজন নারীর নানা ধরণের অশালীন প্রশ্ন করতে। মেয়েটি র মধ্যরাতে কোথায় আসছিল….এ ধরণের নানা প্রশ্ন।

আমি ঢাকায় নানা পেশার কয়েকজন নারী এবং পুরুষের সাথে কথা বলেছিলাম পুরুষের জন্য যেটা সাবলীল সেটা মেয়েদের জন্য স্বাভাবিক আচরণ নয় কেন?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here