ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করার কাজে অগ্রগতি কতদূর

0
137

ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ এই চারটি নদীকে দূষণমুক্ত করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে তিন স্তরের পরিকল্পনা ও কিছু সুপারিশসহ কর্মপরিকল্পনা দুই বছর আগে জমা দিয়েছিল নৌবাহিনী। এতে তিন স্তরের মেয়াদভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। রূপরেখা অনুযায়ী, এক বছরের জন্য স্বল্পমেয়াদি, এক থেকে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি ও এক থেকে পাঁচ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
২০১৬ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনী এ সংক্রান্ত একটি কৌশলগপত্র উপস্থাপন করে। কিন্তু এরপর এ প্রকল্পের কাজ সেভাবে এগোয়নি। শুরুতে এ কাজের প্রধান সমন্বয়ের দায়িত্ব নৌবাহিনীকে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা দেওয়া হয় স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে।

জানা গেছে, এর পরই একই বছরের ৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে জারি করা এক আদেশে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকাকে ঘিরে রাখা বালু, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্নফুলী নদীকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করতে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে। তাকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় ২১ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি। কমিটিতে নৌপরিবহন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুই মন্ত্রীকে কো-চেয়ারম্যান করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালককে কমিটিতে সাচিবিক দায়িত্ব পালনের আদেশ দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেই সময়ের পরিচালক (প্রশাসন) ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত আদেশে নৌবাহিনীর প্রধান, ঢাকার দুই মেয়র, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব, চট্টগাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার বিভাগ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু , নৌপরিবহন, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের ডিসি, বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (৩) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় মনোনীত সিভিল সোসাইটির দুজন প্রতিনিধিকে এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক, নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পরবর্তীতে মহাপরিকল্পনা তৈরি সংক্রান্ত কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। ওই সভায় কমিটির কার্যপরিধি পর্যালোচনা, তথ্যচিত্র পর্যালোচনা, সমস্যা, সরকারের পরিকল্পনা ও সমাধানের সুপারিশ নিয়েও আলোচনা হয়। সভায় কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছিল। সেসব সুপারিশে সারা বছর নদীগুলোতে ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু  ও ঢাকা ওয়াসার আউটলেটগুলোর সঙ্গে শতাধিক ডাইয়িং কারখানার চোরালাইন শনাক্ত এবং সেগুলো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, নিয়মিত পানির মান যাচাই, নদীর সীমানা নির্ধারণে জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নদীর অবৈধ দখল মুক্ত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ঢাকাকে ঘিরে রাখা এই চার নদীর দূষণ রোধ করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে কাজ শুরু করেছিল। এসব কাজের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নৌ বাহিনীকে। গঠন করা হয়েছে জাতীয় টাস্কফোর্স। এই টাস্কফোর্সের অধীনে গঠিত ২১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটির প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল  মুহাম্মদ নিজামউদ্দিন আহমেদকে।
দায়িত্ব পাওয়ার পরই নৌবাহিনী ঢাকার চারপাশ ঘিরে রাখা বুড়িগঙ্গা, বালু, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ এই চারটি নদীকে দূষণমুক্ত করতে তিন স্তরের পরিকল্পনা ও কিছু সুপারিশসহ একটি কর্মপরিকল্পনা জমা দেয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে। রূপরেখা অনুযায়ী এক বছরের জন্য স্বল্পমেয়াদি, এক থেকে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি ও এক থেকে পাঁচ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দখল ও দূষণরোধে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশলপত্র ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।
নৌ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এসব নদীর তলদেশে ১০ ফুটের বেশি পলিথিনসহ নানা ধরনের বর্জ্য পড়ছে। এর মধ্যে ট্যানারি বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, শিল্প বর্জ্যসহ পয়োবর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। নদী দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বড় বড় অবকাঠামো। এ কারণে নদী চারটি তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়েছে। এটি উদ্ধার করতে প্রথমে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে হবে। এরপর নদীগুলো যেন ভবিষ্যতে আর কোনোভাবে দূষিত না হয় সেজন্য বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে নদীগুলো মরে যাবে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের অন্য নদীগুলোতেও পড়বে। এজন্য প্রয়োজনে লন্ডনের টেমস নদীসহ বিশ্বের যেসব নদী এভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। এ কাজের জন্য নৌবাহিনী তাদের কৌশলপত্রে একটি পৃথক টাস্কফোর্স গঠনেরও পরামর্শ দিয়ে এ টাস্কফোর্সের কর্মকাণ্ড মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে উপস্থাপনেরও সুপারিশ করেছে।

নদী দূষণমুক্ত করতে নৌ বাহিনীর তৈরি করা এক বছরের জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপে বলা হয়েছে, শুরুতেই নদীর ময়লা উপাদন চিহ্নিত করে তা পরিষ্কার করার কাজ শুরু করতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখল মুক্ত করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে নদী খননের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। নদীর তীর সংরক্ষণে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের অগ্রগতি তদারকিতে মনিটরিং কমিটি গঠন ও তা জোরদার করতে হবে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ‘ঢাকার চারপাশের এই চারটি নদীকে দূষণমুক্ত করে নদীগুলোর স্বাভাবিক চরিত্র ফিরিয়ে আনা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ। এজন্যই এই কঠিন কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দেওয়া হয়। নৌবাহিনী মাঠে নামলে ফল যত তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে একজন সিভিল কর্মকর্তার নেতৃত্বে এ দায়িত্ব পালন করতে গেলে সফলতা সেভাবে পাওয়া যাবে না। কারণ দেশের বড় বড় রাঘববোয়ালরাই নদী দখল করে অবকাঠামো গড়েছে। এগুলো উচ্ছেদ করতে সাহস প্রয়োজন। এ সাহস নৌবাহিনীর আছে।’
নৌ বাহিনীর এক থেকে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার রূপরেখায় বলা হয়েছে, পর্যায়ক্রমে নদী খননের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে। নদী তীর সংরক্ষণে স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীতে যে সমস্ত ময়লা-আবর্জনা বা বর্জ্য ফেলা হয়, সেসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কার্যক্রম নিতে হবে। নদী দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে নদীকে ঘিরে সার্কুলার ওয়াটারওয়েজ চালু করতে হবে। পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় নৌবাহিনী বলেছে, নদী খনন এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢাকা শহরের চারদিকের নদীগুলোর দূষণরোধ, নদীর নাব্য বাড়ানো এবং অবৈধ দখল মুক্ত করতে হবে। নৌ বাহিনীর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে প্রতিদিনই ফেলা হচ্ছে নানা ধরনের বর্জ্য। এর ৬০ শতাংশই বিভিন্ন ধরনের শিল্পবর্জ্য। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পবর্জ্য। নদী চারটিতে পড়া বর্জ্যের ৪০ শতাংশ ট্যানারি শিল্পের, ২০ শতাংশ অন্য শিল্পের। মোট ৬০ শতাংশ বর্জ্যই শিল্প খাতের। এর বাইরে ১৫ শতাংশ কঠিন বর্জ্য, ১৫ শতাংশ অন্য ও ১০ শতাংশ নৌযান বর্জ্য। অন্য বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, ইটভাটা, পলিথিন ও ডকইয়ার্ড ইত্যাদি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিদিন ঢাকা শহরের চার হাজার ৫০০ টন আবর্জনা ও ২২ হাজার লিটার বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য পড়ছে। এছাড়া পলিথিন জমে বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে ১০ থেকে ১২ ফুট ভরাট হয়ে গেছে। টঙ্গী শিল্প এলাকার প্রায় ২৯টি শিল্পকারখানা থেকে প্রতিদিন সাত হাজার ১৫৯ কেজি শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশন হয়ে তুরাগ নদীতে পড়ছে। আর বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী প্রতিনিয়ত দূষিত করছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর খোলামুড়া থেকে মীরকাদিম পর্যন্ত নাব্য মাত্র ১২ ফুট। শীতলক্ষ্যার ডেমরা থেকে গোপচর পর্যন্ত ১২ ফুট আর ডেমরা থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় ফুট। বালু নদীর উত্তরখান থেকে ডেমরা ও টঙ্গী খালের উত্তরখান থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত নাব্য পাঁচ থেকে ছয় ফুট। আর তুরাগের আশুলিয়া থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় ফুট আর আমিনবাজার থেকে খোলামুড়া পর্যন্ত নাব্য ১২ ফুট। এগুলোর প্রশস্ততা বিভিন্ন স্থানে ৪০ থেকে ৩৪০ মিটার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউকে জানিয়েছেন,‘কাজ চলছে। কেউ বসে নাই।

-বাংলাট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here