ঢালচর থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে পুলিশ ফাঁড়ি!

0
24

সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে ভোলা জেলার মনপুরা ও নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মধ্যবর্তী চর ঢালচরের পুলিশ ফাঁড়ি। জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের এমন উদ্যোগে আতঙ্ক বিরাজ করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তারা বলছেন, পুলিশ ফাঁড়িয়ে উঠিয়ে নেওয়া হলে চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। স্থানীয় ভূমিহীনদের ওপর জল ও বনদস্যুদের উৎপাত আরও বাড়বে। চরটি জল ডাকাতদের অভয়াশ্রমে পরিণত হবে। নদীতেও বাড়বে জলদস্যুদের দৈরাত্ম্য। তবে পুলিশ সুপার সরকার মো. কায়সার জানিয়েছেন পুলিশ ফাঁড়ি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ‘স্টাডি’ করছেন তিনি। বাংলা ট্রিবিউন

ভোলা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জল ও বনদস্যুদের উৎপাত এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে হাতিয়া ও মনপুরা উপজেলার প্রভাবশালী মহলের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ রোধে ২০০২ সালের দিকে ঢালচরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। এর ফলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়। স্বস্তি ফিরে স্থানীয়দের মধ্যে। স্থানীয় বাসিন্দারা জল ও বদস্যুদের থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পান।

গত ৫ আগস্ট খবর রটে, ভোলার পুলিশ সুপার ঢালচরের পুলিশ ফাঁড়ি বন্ধ করে দিয়েছেন। এ খবরে এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। তারা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করতে শুরু করেছেন। ভূমিহীনদের অভিযোগ, একটি শক্তিশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরেই চরটি নিয়ে ঝড়যন্ত্র করে আসছে। তারই অংশ হিসেবে চর থেকে পুলিশ ফাঁড়ি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফাঁড়ি সরে গেলে প্রভাবশালীদের লোকজন তাদের বাড়িঘর ও ফসলি জমির ধান সহজে লুট করতে পারবে বলে তারা অভিযোগ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা জহির উদ্দিন বলেন, ‘তিন-চার দিন আগে হঠাৎ করে শুনেছি পুলিশ ফাঁড়ি নাকি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই কথা শুনে চরের ভূমিহীনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এখন চরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রিবাজ করছে। যদি পুলিশ ফাঁড়ি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় তাহলে চরে কোনও মানুষ থাকতে পারবে না। জলদস্যুরা তাণ্ডব চালিয়ে সব লুট করে নিয়ে যাবে। ডাকাতি, ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধ বেড়ে যাবে।’

অপর বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এখনও আমরা অনেক আতঙ্কের মধ্যে থাকি। মাঝে মধ্যে ডাকাত বাহিনীর সদস্যরা এসে হানা দিয়ে সব লুট করে নিয়ে যায়। পুলিশ ফাঁড়ি থাকার কারণে কিছুটা হলেও অপরাধ কমেছে। অন্তত রাতে নিরাপদে ঘুমানো যায়। কিন্তু এই চর থেকে যদি ফাঁড়ি চলে যায় তাহলে তো আর কোনও আইনশৃঙ্খলা থাকবে না। উপজেলার মূল অংশ থেকে এসে কেউ আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি দেখবে না।’

ঢালচর যাওয়ার একমাত্র বাহন নৌকাচরের একটি অংশ জুড়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের সাবেক সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর মৎস্য ঘের ও পশুর খামার রয়েছে। তিনি বলেন, ‘২০০২ সাল থেকে এই চরটিতে পুলিশের একটি ফাঁড়ি রয়েছে। এলাকাটি জলদস্যু প্রবণ এলাকা। চরের বিশাল অংশ জুড়ে বনাঞ্চল থাকায় আশপাশের নদীতে ডাকাতি করে জল ও বনদস্যুরা নিরাপদে বনে পালিয়ে যায়। এই চরে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার দাগি আসামিরা অবস্থান করে নদীতে ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধ করে থাকে। পুলিশ ফাঁড়িটি থাকার কারণে অপরাধ প্রবণতা অনেক কমেছে। এখন শুনতে পাচ্ছি এই ফাঁড়িটি উঠিয়ে নেওয়া হবে। যদি এটি উঠিয়ে নেওয়া হয় তাহলে ডাকাতদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে ঢালচর। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। চরের মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তার পাশাপাশি মেঘনা ও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক জল ডাকাতি প্রতিরোধে পুলিশ ফাঁড়িটি খুবই জরুরি।’

মনপুরা থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেন জানান, ঢালচর পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরতরা তাকে জানিয়েছেন এ ফাঁড়ি পুলিশ সুপার বন্ধ করে দিয়েছেন। ওসি বলেন, ‘এ ফাঁড়ি বন্ধ করা উচিত হবে না। তাহলে এখানে জলদস্যুদের উপদ্রব বেড়ে যাবে।’

মনপুরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেলিনা চৌধুরী জানান, ‘কোনোক্রমেই ঢালচরের পুলিশ ফাঁড়ি বন্ধ বা প্রত্যাহার করা যাবে না। ফাঁড়ি বন্ধ করলে সেখানকার হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে। এছাড়া জলদস্যুরা আস্তানা গেড়ে মেঘনার মোহনাকে অশান্ত করে তুলবে।’

জানা গেছে, ঢালচরে আমেরিকান সরকারের অর্থায়নে কোস্টগার্ডের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল। আমেরিকার প্রতিনিধি দল সরেজমিন তা পরিদর্শনও করে যায়। পরবর্তীতে নানা রকম ষড়যন্ত্রে সে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এদিকে ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মো. কায়সার জানান, ঢালচর পুলিশ ক্যাম্প বন্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তা আবার স্থগিত করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আরও চিন্তা ভাবনা ও স্ট্যাডি করছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর মোহনায় জেগে ওঠা ঢালচর ও তার আশপাশের এলাকায় নৌ-ডাকতি ও জলদস্যুদের উপদ্রব বেশি। বিশেষ করে ইলিশের মৌসুমে দস্যুদের তাণ্ডব হিংস্র রূপ ধারণ করে। তাদের পছন্দের এলাকার মধ্যে ঢালচর অন্যতম। এ চরকে ঘিরে রয়েছে সরকারি কয়েকটি ম্যানগ্রোভ বন। নদীতে ডাকাতি শেষে জলদস্যুরা চরটির বনাঞ্চলে নিরাপদে আশ্রয় নেয়। সেখানে জেলে ও ট্রলার জিম্মি করে টাকা আদায় করে। দুই ভাগে বিভক্ত এই চরের একটি অংশ জুড়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের বসবতি। অন্য অংশে রয়েছে বিস্তৃর্ণ মাছের ঘের। এই চরটির দখল নিয়ে হাতিয়া ও মনপুরা উপজেলার প্রভাবশালী কয়েকটি পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। সেই বিরোধকে কেন্দ্র করে চরে ধানের মৌসুমে প্রাণঘাতি সংঘর্ষও ঘটে।

জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে ১৯৬০-৬১ সালে প্রথম পর্যায়ে ঢালচরে এক হাজার ১৫৩টি নথিতে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৯৭ সালে কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা জারির পর হাতিয়া উপজেলার আরও এক হাজার ৪০০টি ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত মোট চার হাজার ২৮২ দশমিক ৫০ একর ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। প্রায় সাড়ে সাত হাজার একর আয়তনের চরটির একটি অংশে বসবাস করছে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া এই দুই হাজার ৫৫৩ পরিবার। পাশাপাশি আরও দুই হাজার পরিবারের প্রায় ১০ হাজার মানুষ।

অপর অংশে মনপুরা উপজেলার বাসিন্দা ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের সাবেক সচিব নাজিম উদ্দিন চৌধুরীর মৎস ঘের ও পশুর খামার রয়েছে। ওই অংশেও মনপুরা উপজেলা থেকে আসা অনেক বাসিন্দা বসবাস করছেন। চরটির সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র অবলম্বন নৌকা। হাতিয়া ও মনপুরা উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে নৌ-পথে যেতে আধাঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টার মতো সময় লেগে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here