তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর সাত বছর

0
450

গণমাধ্যম ডেস্ক: ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট দেশের ইতিহাসে শোকাবহ একটি দিন। এদিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন চলচ্চিত্রকর্মী। আজ সোমবার (১৩ আগস্ট) সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হচ্ছে তাদের।

প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কিন্তু সেই প্রাণ যখন মাসুদ-মুনীরের মতো কারো হয়, তখন তার আঘাত সহ্য করা যেন অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায় আমাদের। ঘাতক বাস কেবল এই প্রতিভাবান চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাংবাদিককেই কেড়ে নেয়নি, থমকে দিয়েছে যেন বাংলাদেশের একটি অগ্রযাত্রাকেও। তাদের বাংলাদেশ মনে রাখবে অনেক অনেক দিন।

তাদের প্রয়াণ দিবসকে স্মরণ করে আয়োজনা করা হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। প্রতিবারের মতো বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মানিকগঞ্জের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো দিনটি পালন করছে।

এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার এ ঘটনায় সাত বছর আগে করা মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। প্রাণহানির ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বাসচালকের আপিল এখন হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া নিহত দুই পরিবারের পক্ষ থেকে মোটরযান অধ্যাদেশের বিধান অনুসারে ক্ষতিপূরণ চেয়ে পৃথক দুটি মামলা হয়। এর মধ্যে তারেক মাসুদের পরিবারের করা মামলায় হাইকোর্ট ক্ষতিপূরণ দিতে রায় দিয়েছেন। এই রায়ের পর বাস মালিকপক্ষ ও বাদীপক্ষ পৃথক লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছে, যা আপিল বিভাগে শুনানির জন্য রয়েছে। অন্যদিকে মিশুক মুনীরের পরিবারের পক্ষ থেকে করা ক্ষতিপূরণ মামলা হাইকোর্টে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে।

এ ঘটনায় ২০১১ সালে পুলিশ বাদী হয়ে ঘিওর থানায় মামলা করে। বেপরোয়া গতিতে বাস চালিয়ে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এক রায়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন।

ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা দুটি মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে দুই পরিবারের অন্যতম আইনজীবী বিলকিস আক্তার রোববার বলেন, তারেক মাসুদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ মামলায় হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে বাসমালিকপক্ষ এবং বাদীপক্ষের করা পৃথক লিভ টু আপিল শুনানির জন্য ৮ অক্টোবর আপিল বিভাগে দিন ধার্য রয়েছে। অন্যদিকে মিশুক মুনীরের পরিবারের করা ক্ষতিপূরণ মামলাটি বিচারপতি জিনাত আরার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে আছে। সোমবার এই মামলায় শুনানি হতে পারে।

বাসচালকের আইনজীবী আবদুস সোবহান তরফদার বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে তারা গত বছরই হাইকোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে জরিমানার আদেশ স্থগিত করেছেন। আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। বাসচালক এখন কারাগারে আছেন।

বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাবেন এই আশা করেন মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলি কাজী। রোববার রাতে তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি মামলায় পাঁচ বছরের মাথায় বিচারিক আদালতের রায় পেয়েছি। তবে এখনো উচ্চ আদালতে মামলাটির শুনানি শুরু হয়নি, এ জন্য হতাশ। ক্ষতিপূরণ মামলা লড়ছি। আশা করি ন্যায়বিচার পাব।’

এদিকে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর স্মরণে সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সড়কদ্বীপে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তারেক মাসুদ ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রয়েছে সকাল ১০টায় ভাঙ্গা পৌরসভায় নূরপুর গ্রামে তারেক মাসুদের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ। বেলা ৩টায় ভাঙ্গা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের কাজী মাহবুব উল্লাহ হলে তারেক মাসুদের জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা সভা।

ইতোমধ্যে মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত কর্মশালা চলছে। একাডেমির সেমিনার কক্ষে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এটি চলছে। থাকছে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীও। আজ আয়োজনের সমাপনী দিন।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও মুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটির আয়োজন করেছে স্মরণ অনুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক (টিএসসি) কেন্দ্রের কাছে ও শামসুন নাহার হলের সম্মুখে অবস্থিত সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনায় বিকালে আয়োজনটি হবে। এ ছাড়া ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলার নগরকান্দায় সকালে তারেক মাসুদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সন্ধ্যায় উপজেলা চত্বরে থাকছে আলোচনা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।

তারেক মাসুদ তাঁর বাল্যকালের অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছিলেন মাদ্রাসায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার মাদ্রাসা শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে৷ যুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষার জগতে প্রবেশ করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন৷ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন এবং দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্র বিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের শেষ দিকে তিনি জীবনের প্রথম প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ নির্মাণ করেন৷ এটি ছিল প্রখ্যাত বাংলাদেশি শিল্পী এস এম সুলতানের জীবনকর্মের উপর৷ এরপর থেকে তিনি বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র, এনিমেশন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন৷

তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ ও ‘মাটির ময়না’ সহ অনেক ছবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেছে৷ ২০০২ সালে তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ মুক্তি পায়৷ ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং ফিপরেসি পদক লাভ করে৷ এই ছবির জন্য তিনি ২০০২ সালের কান উৎসবে আন্তর্জাতিক সমালোচক পদক অর্জন করেন৷ বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি৷ ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেছেন৷ এছাড়া তিনি অ্যামেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সাময়িকী ও পত্রিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি করতেন৷ তাঁর স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ একজন মার্কিন নাগরিক৷ ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যার নাম অডিওভিশন৷ চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়া তারেক মাসুদের আগ্রহের বিষয় ছিল লোক সংগীত এবং লোক ধারা৷

ক্যামেরার পেছনে কাজ করে যে বাংলাদেশিরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছেন, তাদের মধ্যে আশফাক মুনীর মিশুক ছিলেন অন্যতম। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ‌্যম যে কুশলীদের হাত ধরে নতুন যুগে পা রেখেছে, তাদের একজন তিনি। পুরোনাম আশফাক মুনীর চৌধুরী শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর মেজ ছেলে। তার জন্ম নোয়াখালী জেলায়, তিনি একাধারে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিত্রগ্রাহক, চলচ্চিত্র ভিডিওগ্রাহক। মিশুক মুনীরের স্ত্রীর মঞ্জলী কাজী।মিশুক মুনীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (১৯৭৯-১৯৮৩) পাস করেন।

কর্ম জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিক বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি প্রথম ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে “ভিডিও জার্নালিজম কোর্স”-এর সূচনা করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোদস্তুর সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। মিশুক মুনীর ১৯৯৯ সালে একুশে টেলিভিশনের প্রথম যাত্রায় হেড অফ নিউজ অপারেশনের দ্বায়িত্ব নিয়ে দেশে আন্তর্জাতিক ধারার টেলিভিশন সাংবাদিকতার জন্ম দেন। নিজ হাতে গড়ে তোলেন একুশে টেলিভিশনের সংবাদ টিম। তিনি ২০০১ সাল পর্যন্ত একুশে টিভির বার্তাপ্রধান (পরিচালনা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে দেশের গন্ডি ছাপিয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখেন মিশুক মুনীর। আফগানিস্থানে চিত্রায়িত প্রামান্য চিত্র রির্টান টু কান্দাহারের প্রধান চিত্রগ্রাহক ছিলেন তিনি। কাজ করেছেন বিশ্বনির্মাতাদের সঙ্গে।২০০৭ সালে কানাডীয় সাংবাদিক পল জেয়োর সাথে প্রতিষ্ঠা করেন আন্তর্জাতিক সংবাদ টেলিভিশন রিয়েল নিউজ নেটওয়ার্ক। সেখানে তিনি সম্প্রচার প্রধান ও পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘ দিন। টরন্টোর ব্রেকথ্রো ফিল্মস, জে ফিল্মস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্স ক্যামেরাপারসন ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ ২০১০ সালে তিনি এটিএন নিউজে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও তিনি লিবিয়ার সংকটের সময় সে দেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের সংবাদ সংগ্রহ করতে নিজেই ছুটে যান। মিশুক মুনীর একাডেমি অব কানাডিয়ান সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশনের এবং কানাডিয়ান ইনডিপেনডেন্ট ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং কানাডিয়ান সোসাইটি অব সিনেমাটোগ্রাফির সহযোগী সদস্য ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here