দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত প্রকল্পের সিংহভাগই আটকে থাকছে

0
138

বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায়। দুই দেশের মধ্যে তিনটি লাইন অব ক্রেডিটও (এলওসি) সই হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দুই দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়ার বার্তা এসেছে উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে। যদিও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত এসব প্রকল্পও আটকে থাকছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঋণচুক্তির ৭০০ কোটি ডলারের অধিকাংশ প্রকল্পই নথিবদ্ধ হয়ে আছে। এতে প্রকল্পগুলোর ব্যয় বাড়ছে বলে অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

২০১৫ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় ১৪টি প্রকল্পে ২০০ কোটি ডলারের দ্বিতীয় ঋণচুক্তি সই করে বাংলাদেশ ও ভারত। স্বাস্থ্য খাতের একটি প্রকল্পকে পরে আলাদা তিনটি প্রকল্পে ভাগ করা হয়। ফলে ২০০ কোটি ডলারে মোট ১৬টি প্রকল্পের ঋণচুক্তি চূড়ান্ত হয়। অধিকাংশ প্রকল্পই এখনো দরপত্র, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি), সম্ভাব্যতা যাচাই, মূল্যায়ন অথবা অনুমোদনের মধ্যে আটকে আছে।

সূত্রমতে, বিলম্বের কারণে দ্বিতীয় ঋণচুক্তির আওতায় ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে ১৩টিরই ব্যয় বেড়েছে। ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে চারটি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ৪৭০টি ট্রাক ক্রয় প্রকল্পে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ কোটি ডলার। এখন তা বেড়ে হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। একইভাবে বিআরটিসির ৬০০ বাস ক্রয় প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। বর্তমানে এ ব্যয় বেড়ে ৭ কোটি ৪৬ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সড়ক বিভাগের সড়ক অবকাঠামো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের যন্ত্রপাতি ক্রয়সংক্রান্ত প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি ৯৮ লাখ ডলার ব্যয় ধরা হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪২ লাখ ডলারে। আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পটিতে শুরুতে ২৮ কোটি ৩৬ লাখ ডলার ব্যয় ধরা হয়েছিল। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ কোটি ৮৭ লাখ ডলারে।

দ্বিতীয় ঋণচুক্তির আওতায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে। খুলনা থেকে দর্শনা রেলপথ ডাবল ট্র্যাক প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রাথমিকভাবে ৩১ কোটি ডলার। এখন তা বেড়ে ৩৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সৈয়দপুরে রেলের কারখানায় নতুন ক্যারিজ নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয়ও ৭ কোটি থেকে বেড়ে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ ডুয়াল গেজ করতে প্রাথমিকভাবে ১২ কোটি ডলার ব্যয় ধরা হয়েছিল। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ কোটি ডলারে।

ভারতের ঋণচুক্তির বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ঋণচুক্তিতে থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সময়সীমা একটি বড় বিষয়। কারণ ঋণচুক্তি যখন হয় এবং প্রকল্পগুলো নেয়া হয়, সেগুলো বাস্তবায়নে তখনকার আর এখনকার ব্যয় এক নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্প বাস্তবায়ন উপকরণের মূল্য বেড়েছে। সময়মতো এগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলে দেখা যাবে, ঋণের অর্থে প্রকল্পের ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৪০ শতাংশ অর্থ সংস্থানে সরকারকে অন্য ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ভারতীয় ঋণে যে প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছে, তার অনেকগুলোরই ব্যয় বেড়েছে। আরো বিলম্ব হলে ব্যয়ও আরো বাড়বে।

বাংলাদেশ-ভারত তৃতীয় ঋণচুক্তি সই হয় ২০১৭ সালের এপ্রিলে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময়। চুক্তির আওতায় ৫০০ কোটি ডলারের মধ্যে ৫০ কোটি ডলার সামরিক খাতে ঋণ সহযোগিতা হিসেবে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বাকি সাড়ে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তিতে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে সোলার নিয়ে আরো একটি প্রকল্প এ ঋণচুক্তিতে যোগ হয়। আর চট্টগ্রাম ড্রাইডক ও বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়। তৃতীয় ঋণচুক্তির সাড়ে ৪০০ কোটি ডলারের ১৬টি প্রকল্পও এখনো দরপত্র, ডিপিপি, সম্ভাব্যতা যাচাই, মূল্যায়ন অথবা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বাস্তবায়ন বিলম্বে দ্বিতীয় ঋণচুক্তির মতোই ব্যয় বেড়েছে তৃতীয় ঋণচুক্তির প্রকল্পেরও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তিনটি প্রকল্পের মধ্যে দুটিরই ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে ৩ কোটি ডলার। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭ কোটি ডলার। জামালপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয়ও সাড়ে ৩ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ডলারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের বড়পুকুরিয়া থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ২১ কোটি ডলার ব্যয় ধরা হয়েছিল, যা বেড়ে হয়েছে ৩৬ কোটি ডলার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নীতকরণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রাথমিকভাবে ২৮ কোটি ডলার। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ কোটি ডলারে। আইসিটি বিভাগের জেলা পর্যায়ে হাইটেক পার্ক নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিকভাবে ছিল ১৯ কোটি ডলার। সর্বশেষ তা বেড়ে হয়েছে ২০ কোটি ডলার। আর নৌ মন্ত্রণালয়ের আশুগঞ্জ বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৩ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। এখন তা বেড়ে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।

কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঋণচুক্তির প্রতিটি প্রকল্পই সময় অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জাহিদুল হক। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিটি কাজের বা প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। সে অনুযায়ীই প্রকল্পগুলো এগিয়ে চলছে। কিছু প্রকল্পে এ সময়ের ব্যতিক্রম হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ঠিক রয়েছে।

প্রথম ঋণচুক্তিতে থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে সময় লেগেছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম ঋণচুক্তির কিছু প্রকল্প এখনো চলছে। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঋণচুক্তিতে এটি বলা যাবে না। ভারতের দ্বিতীয় ঋণচুক্তির ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে ১৪টির অনুমোদন চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ও ভারত উভয় পক্ষ থেকে সম্পন্ন হয়েছে। দুটি প্রকল্প বাংলাদেশের তরফ থেকে অনুমোদন হয়ে গেছে, ভারতের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ১৪টি প্রকল্প এখন মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। আর তৃতীয় ঋণচুক্তির চার-পাঁচটি প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশের অনুমোদনের কাজ শেষ হয়েছে। ভারতের কাছে এগুলো অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কোনো অগ্রাধিকার রয়েছে কিনা জানতে চাইলে জাহিদুল হক বলেন, ঋণচুক্তির সব প্রকল্পই অগ্রাধিকারমূলক। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা বৈঠক করেছেন। সেখানে প্রকল্পগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাই এ নিয়ে কাজ করছেন।সূত্র: বণিক বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here