নতুন মজুরি কাঠামোতে বেতন বাড়ছে পোশাক শ্রমিকদের

0
166
নতুন মজুরি কাঠামোতে বেতন বাড়ছে পোশাক শ্রমিকদের

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী পোশাক মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে সচিব কমিটির ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে শ্রমিকদের সংশোধিত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। সংশোধিত কাঠামো অনুসারে এক নম্বর গ্রেডে মজুরি এখন থেকে হবে ১৮ হাজার ২৫৭ টাকা। আগে এই গ্রেডে মজুরি ছিল ১৭ হাজার ৫১০ টাকা। দুই নম্বর গ্রেডে মজুরি হবে ১৫ হাজার ৪১৬ টাকা। আগে এই গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি ছিল ১৪ হাজার ৬৩০ টাকা। তিন নম্বর গ্রেডে এখন থেকে মজুরি হবে ৯ হাজার ৮৪৫ টাকা। আগে এই গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি ছিল ৯ হাজার ৫৯০ টাকা। চার নম্বর গ্রেডে সংশোধিত কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরি হবে ৯ হাজার ৩৪৭ টাকা। আগে এই গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ২৪৫ টাকা। পাঁচ নম্বর গ্রেডে সংশোধিত কাঠামো অনুয়ায়ী এখন থেকে শ্রমিকদের মজুরি হবে ৮ হাজার ৮৭৫ টাকা যা আগে ছিল ৮ হাজার ৮৫৫ টাকা। ৬ষ্ঠ গ্রেডে নতুন ঘোষিত মজুরি কাঠামো অনুসারে মজুরি নির্ধারণ হয়েছে ৮ হাজার ৪২০ টাকা। আগে এই গ্রেডে মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল ৮ হাজার ৪০৫ টাকা। তবে ৭ম গ্রেডের মজুরি কাঠামোতে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি।

ত্রিপক্ষীয় ওই বৈঠক শেষে সচিবালয়ে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান।

এসময় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, শ্রম সচিব আফরোজা খান, বাণিজ্য সচিব মফিজুল ইসলাম, পোশাক কারখানা মালিকদের পক্ষে বিজিএমই’ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সালাম মুর্শেদী এমপি, আতিকুর রহমান, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, এ কে আজাদ এবং শ্রমিকদের পক্ষে নাজমা আকতার, ফজলুল হক মন্টু, আমিররুল ইসলাম আমিন এসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে শ্রম সচিব আফরোজা খানের নেতৃত্বে পোশাক কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এ বৈঠক শেষে নতুন মজুরি কাঠামো অনুমোদন করে তাতে শ্রমিক নেতারা স্বাক্ষর করেন বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান।

গত বছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত পোশাক শ্রমিকদের মজুরি কাঠামোর সঙ্গে নতুন কাঠামো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে  এক নম্বর গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি ৭৪৭ টাকা, দুই নম্বর গ্রেডে ৭৮৬ টাকা, তিন নম্বর গ্রেডে ২৫৫ টাকা, চার নম্বর গ্রেডে ১০২ টাকা, পাঁচ নম্বর গ্রেডে মজুরি ২০ টাকা ও ছয় নম্বর গ্রেডে মজুরি বেড়েছে ১৫ টাকা।

বৈঠক শেষে  পোশাক মালিকদের পক্ষে শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, গত কয়েকদিনে আন্দোলনের নামে যারা পোশাক কারখানা ভাঙচুর করেছে তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। সম্পদ রক্ষায় সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। সরকার যেন কোনও অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেয়। এসময়  পোশাক শ্রমিকদের অনতিবিলম্বে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এরপর সভার সম্মানিত অতিথি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘পোশাক শ্রমিকরা জানুয়ারি মাসের বেতন নতুন মজুরি কাঠামো অনুসারে পাবেন। নতুন মজুরি কাঠামো অনুসারে ডিসেম্বর মাসে যে পরিমাণ টাকা কম পেয়েছেন, তাও জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে দেওয়া হবে।’

টিপু মুনশি বলেন, ‘যারা ভাঙচুর করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এই বিষয়ে একটা ফয়সালায় আসা উচিত এবং সিদ্ধান্তে আসা উচিত। এই কয়দিনে যে ক্ষতি হয়েছে, তারা (পোশাক শ্রমিক) সবাই উদ্যোগী হয়ে কাজ করে যেন সেটুকু পুষিয়ে দেন।’

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি নিয়ম অনুসারে নিহত শ্রমিকের পরিবার যে ক্ষতিপূরণ পাবেন তার সঙ্গে আমি আরও ১ লাখ টাকা দেবো।’

শ্রমিকদের পক্ষে বক্তব্য দেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের  সভাপতি আমিরুল হক আমিন। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (সোমবার) থেকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দেবেন। মজুরি কাঠামো নিয়ে যে অসামঞ্জস্যতা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা সমাধান হয়েছে। আজকে যে মজুরি ঘোষণা হলো, শুধু মেনে নেওয়া নয়, আমরা স্বাগত জানাই। ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে আমরা আন্দোলন করবো। তবে সেই আন্দোলন ধ্বংসাত্মক করা যাবে না। আন্দোলন মানে রাস্তা অবোরধ নয়, কারখানা ভাঙচুর নয়। মালিককে অবরুদ্ধ করা নয়। এই কয়দিনের আন্দোলনের নামে যারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন, তবে কোনোভাবেই কোনও নিরপরাধ শ্রমিক যেন এর শিকার না হয়।’

এছাড়া গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সভাপতি মন্টু ঘোষ, বাংলাদেশ বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সালাউদ্দিন স্বপন, গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি লিমা ফেরদাউস, মজুরি বোর্ডের সাবেক সদস্য সিরাজুল ইসলাম রনি, জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ফজলুল হক মন্টু উপস্থিত ছিলেন।

পরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি গার্মেন্টস শিল্প এবং এ খাতের শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয় বিবেচনায় সরকার দ্রুত ত্রিপক্ষীয় মজুরি সমন্বয় কমিটি গঠন করে। কমিটি সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে এবং সকল পক্ষের সুবিধাজনক অবস্থান বজায় রেখে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে শ্রমিকদের স্বার্থে ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর গ্রেডে মজুরি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শ্রমিকবান্ধব সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের সঙ্গে ১ এবং ২ নং গ্রেডের মজুরি সমন্বয়েরও নির্দেশ প্রদান করেন। ফলে সমন্বয়ের পর প্রতিটি গ্রেডেই মজুরি যৌক্তিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সকল পক্ষের সহযোগিতায় কমিটি একটি সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মজুরি বিশ্লেষণ করে আরও দেখানো হয়েছে, ২০১৩ সালের নিম্নতম মজুরি কাঠামো থেকে ২০১৮ সালের ঘোষিত মজুরি কাঠামো সমন্বয়ের ফলে মোট মজুরি ১ম গ্রেডে বেড়েছে ৫ হাজার ২৫৭ টাকা, ২য় গ্রেডে বেড়েছে ৪ হাজার ৫১৬ টাকা, ৩য় গ্রেডে বেড়েছে ৩ হাজার ০৪০ টাকা, ৪র্থ গ্রেডে বেড়েছে ২ হাজার ৯২৭ টাকা, ৫ম গ্রেডে বেড়েছে ২ হাজার ৮৩৩ টাকা, ৬ষ্ঠ গ্রেডে বেড়েছে ২ হাজার ৭৪২ টাকা এবং ৭ম গ্রেডে বেড়েছে ২ হাজার ৭০০ টাকা।

এ মজুরি ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশের কথাও জানানো হয়।

উল্লেখ্য, বেতন কাঠামোতে বৈষম্যের অভিযোগ এনে পোশাক শ্রমিকদের এক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সমাধানে পাঁচটি গ্রেডেই মজুরি সমম্বয়ের জন্য গতকাল শনিবার (১২ জানুয়ারি) নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার রাতে এ সমস্যার সমাধানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র নেতাদের গণভবনে ডেকে নেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর তাদের সঙ্গে কথা বলে বিরাজমান সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থে ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেডের পাশাপাশি ১ ও ২ নম্বর গ্রেডের মজুরি সমন্বয়ের নির্দেশ দেন।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here