নির্বাচনে জয়-পরাজয় এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা

0
178

আর মাত্র ১১ দিন পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে চলছে তুমুল উত্তেজনা। নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা নিয়ে নানা রকম আগাম হিসাব-নিকাশ চলছে। নির্বাচনী প্রচারণা শান্তিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। এর মধ্যেই বেশ কিছু জায়গায় সংঘর্ষ-হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন স্থানে বিএনপির কয়েকজন প্রার্থীর ওপর আক্রমণ হয়েছে। এগুলো আওয়ামী লীগ করেছে বলে বিএনপির অভিযোগ।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের দুইজন কর্মী নিহত হয়েছেন বিএনপির হামলায়। কেউ কেউ নির্বাচনী সংঘাত আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন। কারো ধারণা সেনাবাহিনী নামলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ভোটের দিন খুব বেশি গোলোযোগের আশঙ্কা নেই। আবার বিএনপি-জামায়াতের কিছু পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত শক্তিপরীক্ষায় নামলে নির্বাচনের দিন ব্যাপক অশান্তির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে কোনো ধরনের অশান্তি চান না বেশির ভাগ মানুষ। যারা ক্ষমতায় পরিবর্তন দেখতে চান তারাও সেটা শান্তিপূর্ণ উপায়েই চান। হামলা-হানাহানি অব্যাহত থাকলে গোলোযোগের আশঙ্কায় নিরীহ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবেন কিনা সে প্রশ্ন আছে। আগে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করতো।

এখনকার চেষ্টা বোধহয় তাদের ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে রাখা। আমাদের দেশে কোনো নির্বাচনই উত্তেজনাহীন হয় না। এবারও হচ্ছে না। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করাও আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন একটি নির্বাচন কি পাওয়া যাবে যেটিতে মারামারি হয়নি, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ হয়নি? নির্বাচনী হাঙ্গামায় প্রাণহানির ঘটনাও বিরল নয়। আমরা পুরনো স্মৃতি মনে রাখি না বলেই প্রতি নির্বাচনের আগেই শান্তিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে হা-হুতাশ করি। আমাদের অনেকেই অতীতকে ভালোবাসি। অতীতে ফিরে তাকিয়ে আক্ষেপ করি আহা, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম! ভুলে যাই, অতীতে ওই অতীতেরই আমরা নির্দয় সমালোচক ছিলাম। আন্দোলন করে সরকার বদল করি। নতুন সরকার এলে আগের সরকারের জন্য আফসোস করি। ভোট এলেই সরকার বদলাতে ব্যাকুল হয়ে উঠি।

গত নির্বাচনে সরকার বদল না হওয়ায় আমাদের অনেকেরই মনোবেদনার শেষ নেই। তাই এবার কেউ কেউ সরকারের পরিবর্তন দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। পরিবর্তনপ্রত্যাশীরা ভুলে যান যে, পরিবর্তন চান না, এমন মানুষও দেশে আছেন। ভোটে হার-জিৎ স্বাভাবিক। তবে কেউ হারার আশা নিয়ে ভোটে দাঁড়ান না। সব থেকে কম ভোট পাওয়া প্রার্থীও মনে করেন যে নির্বাচনে তার বিজয় নিশ্চিত। বিজয়ের আশা নিয়েই সবাই প্রার্থী হন। কিন্তু এক আসন থেকে একাধিক প্রার্থীর জয়লাভের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অনেকে, জয়লাভ করেন একজন। আমাদের দেশে সাধারণত নির্বাচন হয় দ্বিমুখী। নিবন্ধিত সবগুলো দল এবং নিবন্ধন নেই এমন কয়েকটি দলও এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে।

বেশির ভাগ দলের কোনো প্রার্থীরই জয়লাভের সম্ভাবনা নেই। তারপরও তারা নির্বাচন করছেন এবং এটাও মনে করছেন ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন হলে তার জয় নিশ্চিত। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী লড়াই যে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে দল দুটি এবার ভোট করছে সঙ্গী-সাথী নিয়ে, জোট-মহাজোট, ঐক্যফ্রন্ট-যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা নিয়ে তার সঙ্গীরা এবং বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে তার সাথীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রচারণায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তথা নৌকা এগিয়ে আছে। বিএনপি তথা ধানের শীষের প্রচার-প্রচারণা চলছে একটু ঢিমে তালে, সীমিতভাবে। তাদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।

নির্বাচন কমিশন তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে বলেও তাদের অভিযোগ। একজন নির্বাচন কমিশনারও তাদের বক্তব্যের সমর্থনে কথা বলে বিএনপির নৈতিক জোর বাড়িয়ে দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, সেনাবাহিনী মাঠে নামলে নাকি পরিস্থিতি বদলে যাবে। এই কথা বিএনপিও বলছে। ২৪ ডিসেম্বর থেকে সেনাবাহিনী নামবে। এখন যদি পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের দিকে হেলে থাকে, তখন কি বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়বে? সেনাবাহিনী বিএনপির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেবে এমন প্রচারণার কারণ কি? আমরা সব কিছুরই দলীয়করণ করেছি। আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানই আর তেমন অবিতর্কিত নেই। সেনাবাহিনী এখনও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের দলীয় বৃত্ত ও বিতর্কে যেন সেনাবাহিনীকে আমরা জড়িয়ে না ফেলি। লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here