পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় চিকিৎসকরা

0
29

কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে ১৫ দিন দায়িত্ব পালন করার পর চিকিৎসকদের জন্য সরকারিভাবে আইসোলেশনে থাকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করার পর আইসোলেশনে থাকার কারণে চিকিৎসকদের পরিবার নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু এখন তাদের পরিবারের সঙ্গে গিয়েই থাকতে হবে। এতে পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। যদি পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে বাড়তি চিন্তা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করবে চিকিৎসাদের। এতে করে সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বিঘ্নিত হবে। বাংলা ট্রিবিউন

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, আমার বরও চিকিৎসক এবং আমাদের আমার আড়াই বছরের মেয়ে রয়েছে। আমরা দুজনই মেয়েটাকে কতটা ঝুঁকি ফেলছি সেটা মন্ত্রণালয়ের কেউ বুঝবে না, তারা যদি বুঝতেন তাহলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আমরা রোগীদের সেবা করার শপথ নিয়ে চিকিৎসক হয়েছিলাম, আমাদের পরিবার নেয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিটি চিকিৎসকদের জন্য এটা ভয়াবহ রিস্কি।

এমন চিকিৎসকের সংখ্যাই বেশি যাদের বাসায় বৃদ্ধ মা বাবা, তাদের অনেকেই অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত। এই কোমরবিডিটি বৃদ্ধ মানুষরাই কিন্তু বেশি ঝুঁকিতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাহলে এই চিকিৎসকরা কী করে বাসায় গিয়ে আইসোলেশনে থাকবেন-প্রশ্ন তার। আবার আমাদের অনেক পুরুষ সহকর্মী রয়েছেন যাদের স্ত্রী গর্ভবতী, তাহলে সেই পুরুষ চিকিৎসকটি কী করে বাসায় গিয়ে আইসোলেশন মেইনটেইন করবেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

চিকিৎসকরা সুপার স্প্রেডার। ১৫ দিন টানা হাসপাতালে ডিউটি করার পর নিজ দায়িত্বে কোয়ারেন্টিন সব দিক থেকেই অবৈজ্ঞানিক মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক বলেন, ১৫ দিন কাজ করার বিষয়টিই একটা ডিপ্রেসনের বিষয়। চিকিৎসকরা কোনও পাঁচ তারকা হোটেল চায়নি, তারা কেবল ‘লিভিং স্ট্যার্ন্ডাড’ অনুযায়ী থাকার জায়গা চেয়েছিল, যেটা তাদের এবং পরিবারের সবার সুরক্ষার জন্য।

এটা কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নয়, সামাজিক ইস্যু নয় যে সিদ্ধান্ত নিয়ে তার সমাধান হবে মন্তব্য করে এই চিকিৎসক বলেন, জাতীয় যে পরার্মশক কমিটি রয়েছে তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়নি। বৈজ্ঞানিক বিষয়ের সমস্যা বৈজ্ঞানিকভাবেই সমাধান হতে হবে, নয়তো সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না।

যারা ফ্রন্টলাইনে চিকিৎসা দেয়, তাদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল ছিল। ১০ দিন কাজ করবে, ১৪ দিন বিশ্রাম নেবে্ন আইসোলেশনে আর ছয়দিন পরিবারের সঙ্গে থাকবেন বলে জানানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব।

তিনি আরও বলেন, এর সঙ্গে টাকা দেওয়া না দেওয়ার কোনও সর্ম্পক নেই। বরং তাদের প্রয়োজন আইসোলেশন, যেটা তাদের অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার এটা তুলে দিলে সেটা হবে ঝুঁকিপূর্ণ-এটা অস্বীকার করা যাবে না।

সরকার এটা কেন করেছে জানি না মন্তব্য করে অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব আরও বলেন, কিন্তু এখন যদি একজন চিকিৎসকও পরিবারে গিয়ে পরিবারের কাউকে সংক্রমিত করে কিংবা পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করে তাহলে হয়তো সে ক্ষতিপূরণ পাবে, কিন্তু এটা কোনও প্রক্রিয়া হতে পারে না। বরং, আমাদের উচিত চিকিৎসকদের ভেতরে অথবা পরিবারের কেউ আক্রান্ত হবে না এমন ব্যবস্থা করা। চিকিৎসকরা এখন অনেকেই কাজ করছেন, কিন্তু এখনতো তার বদলে তাদের নিজেদের সেফটি বেশি চিন্তা করতে হবে এবং করবেন তারা-এটা ভালো হবে না প্রকৃত অর্থে। তাদের আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই, বলেন অধ্যাপক রশিদ-ই মাহবুব।

চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটি (এফডিএসআর) এর উপদেষ্টা ডা. আব্দুন নূর তুষার বলেন, মন্ত্রণালয় চিকিৎসকদের নিজ দায়িত্বে আইসোলেশনে যাবার নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু এটা ভুল সিদ্ধান্ত। এজন্য ভুল যে সাধারণ মানুষ নিজ দায়িত্বে আইসোলেশন করে কারন, তারা আইলোশন করলে মানব সেবা বঞ্চিত হয় না। কিন্তু চিকিৎসকের সুস্থ থাকা, সুস্থ রাখা ‘চাকরিদাতাদের’ দায়িত্ব। যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক হয় তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক হয় তাহলে সে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। কিন্তু ভীষণ দূভার্গ্যজনকভাবে করোনার শুরু থেকে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরো বিষয়টিকে সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি এখনও পারছে না।

তিনি আরও বলেন, তাদের সকল ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এই ধরনের ‘উইয়ার্ড’ সিদ্ধান্ত দিয়ে মানুষের দৃষ্টি একদিক থেকে আরেকদিকে সরিয়ে নেয়-চিকিৎসকদের আইসোলেশন নিয়ে তারা যা করছে এটা তারই এক ধারাবাহিকতা।

ডা. আব্দুন নূর তুষার জানান, চিকিৎসকরা তাদের আইসোলেশনের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নয়, নিজের আর পরিবারের সুরক্ষা চেয়েছে। তারা চেয়েছেন, রাষ্ট্র তাদের আইসোলেটেড জায়গাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিক। হাসপাতালগুলোর সঙ্গে কত কত ভবন রয়েছে অথচ চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা করতে পারছে না মন্ত্রণালয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মন্ত্রণালয়ের আমলাদের ‘টেকনিক্যাল নলেজ’ নাই, তারা কী করে এই সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, তারাতো এই বিষয়ে জানেনই না।

এদিকে, এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। সংগঠনের সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত সে চিঠিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তারা লিখেছেন, ‘করোনার শুরুতে গত মার্চ মাস থেকে এদেশের চিকিৎসকরা জাতীয় দুর্যোগ মহামারিতে নিজেদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত রেখেছেন। কিন্তু যখনই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে চলে তখনই আপনার মন্ত্রণালয়ের (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) কিছু আকস্মিক ও অবৈজ্ঞানিক আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশনা গোটা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলে এবং একটি স্বার্থান্বেষী মহল অত্যন্ত সুকৌশলে চিকিৎসকদের জনগণ কিংবা সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রটি আমাদের অবাক ও বিস্মিত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অথবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মবহির্ভূত এ ধরনের আদেশে দেশের সব চিকিৎসক ক্ষুব্ধ।’

মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রের কারণে আর কোনও চিকিৎসকের সংক্রমণ অথবা মৃত্যু কিংবা এ কারণে তাদের পরিবারের কোনও সদস্যের সংক্রমণ অথবা মৃত্যুর কারণ যেন না হয় সে ব্যাপারে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবেও বলেছে সংগঠনটি।

চিকিৎসকদের আবাসন সংকটের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় কিছু ভাবছেন কীনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব আব্দুল মান্নান বলেন, এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। হয়তো একটা রিভাইজ অর্ডার হতে পারে।

তিনি দাবি করেন,হোটেলে থাকা বন্ধ ও একটি ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি পূর্ণাঙ্গ নয়। তিনি আরও বলেন, সবার সুবিধা অনুযায়ীই রিভাইজ অর্ডার আসবে। আমাদের আলোচনা চলমান।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আব্দুল মান্নান স্বাক্ষরিত জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসিক হোটেলের বিল পরিশোধ না করার সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের জন্য বরাদ্দ হোটেলের সুবিধাও বাতিল করে তারা। অথচ, করোনা প্রাদুর্ভাবের পর গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর ছয় হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার জন্য ১৯টি হোটেল নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here