পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষকেরা

0
191

ই মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাটের উৎপাদন ভালো হলেও, লোকসান হওয়ায় পাটের আবাদ কমিয়ে আনছেন কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচের তুলনায় মূল্য কম পাওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা চাষাবাদ কমিয়ে আনছেন। এ অবস্থায় উৎপাদন বাড়াতে পাট চাষিদের উৎসাহ দেওয়ার পাশপাশি পাটের ন্যায্য বাজার মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুলতানপুর এলাকার ষাটঊর্ধ্ব পাট চাষি মজিদ খান বলেন, ‘একসময় পাটকে সোনালী আঁশ বলা হত। সেই দিন আর নেই। গত তিন দশকে পাটের সেই সোনালী দিন হারিয়েছে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘একসময় আড়াই একর জমি জুড়ে পাটের আবাদ করতাম। পাটের আবাদ করে লাভের মুখ না দেখায় এবার মাত্র দুই কানি (৬০ শতাংশ) জমিতে পাটের আবাদ করেছি। তাও নিজের প্রয়োজনে, জ্বালানি হিসেবে পাট কাঠি সংগ্রহের জন্য।’

মজিদ খান আরও জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে এখনও অনেক কৃষক কেনাফ, তোষা ও মেস্তা জাতের পাটের আবাদ করছেন। কেবল বাপ-দাদার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্যে তারা এই আবাদ করে থাকেন।

একই এলাকার কৃষক লিল মিয়া, হাসেম মিয়া ও বিল্লাল মিয়া জানান, আমরা আর পাট চাষ করবো না। কারণ প্রতিমণ পাট উৎপাদনে খরচ হয় ১৫শ থেকে ১৬শ টাকা। বিক্রি করতে গেলে ৭শ থেকে ৮শ টাকা পাওয়া যায়। মণ প্রতি সর্বোচ্চ পাওয়া যায় হাজার টাকা। এ অবস্থায় উৎপাদন খরচই আসে না। লাভতো দূরের কথা।

পাট চাষিরা আক্ষেপ, ক্ষোভ ও অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার পাটের ওপর নজর দিলে পাটের উৎপাদন আরও বাড়তো। পাট মৌসুমে আমরা সরকারের কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কোনও কর্মকর্তার দেখা পাই না। টেলিভিশনের খবরে শুনি উচ্চ ফলনশীল পাটের জিন আবিষ্কার করেছে দেশের বিজ্ঞানীরা। কই মাঠে এসে কেউ তো কোনও পরামর্শ দেন না।’

কৃষকেরা আরও বলেন, বাপ দাদার আমল থেকে যেভাবে পাট চাষ করছি, এখনও সেভাবেই করছি। কৃষি বিভাগের কোনও সহযোগিতা নেই। এছাড়া প্রতিবছর পাট উৎপাদন শেষে সরকারের পক্ষ থেকে পাটের নির্ধারিত বাজার মূল্য না থাকায় এলাকার পাট চাষিরা বাধ্য হয়ে মৌসুমী দালাল, ফরিয়াদের কাছে পাট বিক্রি করেন।

এদিকে মৌসুমী ফরিয়া পাট ব্যবসায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের শেখ আরিফ, তাজুল ইসলাম ও নারায়ণগঞ্জের হাবিবুর রহমান জানান, আমরা প্রতিবছর গ্রামেগঞ্জে ঘুরে কৃষকদের কাছ থেকে পাট ক্রয় করে থাকি। পাটের আগাম বাজার মূল্য নির্ধারণ না করায় শুধু কৃষকই নয় আমরা ব্যাপারিরাও লোকসানের মুখে পড়ছি।

তারা বলেন, গতবছর পাট গোদামজাত করে ভালো দাম না পেয়ে ধরা খাইছি। এবারও আন্দাজের ওপর পাট ক্রয় করছি। ন্যায্য মূল্য না পেলে এবারও লোকসান হবে। সরকারের কাছে পাটের ন্যায্য বাজার মূল্য দেওয়ার দাবি জানান তারব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আবু নাছের জানান, চলতি বছর তিন হাজার সাতশ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে এবার ৫০ হেক্টর কম জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া আর বিগত সময়ে কৃষক পাটের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে পাটের আবাদ কমেছে বলে তিনি জানান। তবে মাঠ পর্যায়ে কৃষি অফিসাররা খোঁজ নেন না এটা সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন,‘আমরা সব সময় কৃষকদেরকে ভালো পরামর্শটাই দিয়ে থাকি।’

পাটের বাজার পরিস্থিতি এবং উৎপাদন কমে যাওয়া প্রসঙ্গে অর্থনীতি বিশ্লেষক ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সুমনা দেবী বলেন, ‘কৃষক উৎপাদন খরচ না পাওয়ার কারণেই পাটের আবাদ কমেছে। পাটের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার পাশপাশি সরকারি প্রণোদনা পেলে কৃষকেরা পাট চাষে আবারও আগ্রহী হবে।’

তবে এ বছর আবাদকৃত জমি থেকে প্রায় ৩৬ হাজার একশ বেল পাট উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন কৃষি বিভাগ।

– বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here