পুড়িয়ে মারার অনেকেই ২০১৩-১৪ সালের পেট্রোল বোমার আসামি, ফুটেজে প্রমাণ!

0
39

 পবিত্র কোরআন শরীফের অবমাননা নয়, মসজিদের মধ্যে ‘বাদানুবাদে জড়ানোর’ খেসারত হিসেবেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন শহীদুন নবী জুয়েল। মসজিদ থেকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পেছনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। এমন ৫০ জনকে এরই মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার সময় অনেকেই মোবাইল ফোনে এ হত্যাকাণ্ডের ছবি ধারণ করেন। এক পর্যায়ে তারা ন্যাশনাল ব্যাংকের বুড়িমারী শাখায় হামলা করে ভাঙচুর করেছেন। সেখানে থাকা সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব ফুটেজে বিশেষ ওই রাজনৈতিক দলের অনেক কর্মীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা ২০১৩ ও ২০১৪ সালে পেট্রোলবোমা ও অগ্নি সন্ত্রাসের মাধ্যমে নাশকতার বিভিন্ন মামলার আসামি।

নিহত জুয়েলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন থেকে মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন জুয়েল। এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে ভারতীয় ওষুধ সেবন করতেন। ভারত থেকে সেই ওষুধ লোক দিয়ে আনাতেন তিনি। ঘটনার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবারও ওষুধ আনতেই সীমান্ত এলাকা পাটগ্রামে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন স্কুল জীবনের বন্ধু সুলতান জোবায়ের আব্বাস।

জানা গেছে, দুজন একটি হোটেলে খাবার খাওয়ার পর পাশের ওই মসজিদটিতে আসরের নামাজ পড়তে যান। নামাজ শেষ করে জুয়েলের বন্ধু জোবায়ের হোটেলে চার্জে রেখে আসা মোবাইল ফোন আনতে যান। তিনি ফিরে এসে দেখেন, জুয়েলকে মারপিট করা হচ্ছে। ঠেকাতে গেলে তাকেও পেটাতে শুরু করে লোকজন।

নামাজের পর মসজিদ থেকে প্রায় সব মুসল্লি বেরিয়ে যান। এমন সময় আবুল হোসেন নামে এক ডেকোরেটর ব্যবসায়ী জুয়েলকে মারতে মারতে মসজিদ থেকে বাইরে নিয়ে আসেন। এসময় সেখানে মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীও ছিলেন। তিনি বলেন, ডেকোরেটর ব্যবসায়ী আবুল হোসেন কোরআনে পা রাখার জন্য শহীদুন নবী জুয়েলকে মারতে মারতে মসজিদ থেকে বের করে আনার পরই ঘটে পরবর্তী ঘটনা।

এদিকে জুয়েলকে প্রথমে মারধরে অভিযুক্ত আবুল হোসেনকে ঘটনার পর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তবে তার স্ত্রী ও মেয়ে জানান, মসজিদের ভেতর গালি দেয়ায় আবুল হোসেন একজনকে মেরেছিলেন বলে বাসায় ফিরে তাদের জানিয়েছিলেন।- সূত্র: সময় টিভি অনলাইন এদিকে হত্যাকাণ্ডের শিকার জুয়েলের বাম গালে প্রথমে দুটি থাপ্পড় মারার কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় আবুল হোসেন (৩৮)। মসজিদের ভেতরে থাপ্পড় মারার পর সেখান থেকে তাকে বের করে আনা হয়।

শুক্রবার রাতে আবুল হোসেন জানান, সেখান থেকে জুয়েলকে উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে নেয়া হলে স্থানীয়রা গণপিটুনি দিয়ে হত্যার পর লাশ সড়কে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। আবুল হোসেন বুড়িমারী ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর এলাকার হাবু মিয়ার ছেলে। তিনি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব-দক্ষিণে রুমেল মার্কেটের ডেকোরেটর ব্যবসায়ী। বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের একজন নিয়মিত মুসল্লি তিনি।

[৯] আবুল হোসেন বলেন, ‘আসরের নামাজ শেষে মসজিদের আঙিনায় বুড়ি মারীর বড় রেজোয়ানের (রেজোয়ান বুড়িমারী বাজার সমিতির সভাপতি ও ওই মসজিদ কমিটির সম্পাদক) ছেলে রিয়াদ (৩৩), তার দুই ম্যানেজার, অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ও আমি উপস্থিত ছিলাম। এ সময় রিয়াদের সঙ্গে জমির পাওনা টাকার বিষয়ে কথা হচ্ছিল। হঠাৎ মসজিদের ভেতরে খাদেম জুবেদ আলীর সঙ্গে জুয়েলের বাকবিতণ্ডার শব্দ শুনে আমি এগিয়ে যাই। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে খাদেমকে গালিগালাজ করছিলেন নিহত জুয়েল। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি র‌্যাবের লোক বলে দাবি করেন।

একেক সময় একেক পরিচয় দেয়ায় আমার সন্দেহ হয়। এ সময় আমি প্রচণ্ড রাগের মাথায় তার বাম গালে দুইটা থাপ্পড় দিয়ে মসজিদের বাইরে নিয়ে এসে বারান্দার সিঁড়িতে বসিয়ে নাম-ঠিকানা জানতে চাই। তার সঙ্গে থাকা অপর ব্যক্তি আমাদের জানান, তারা রংপুর থেকে এসেছেন। একজন-দুইজন করে প্রায় ২৫-৩০ জন মানুষ জড়ো হয়। আমি প্রথমে চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাতকে ফোন করি। তিনি বাইরে থাকার কথা জানিয়ে ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলামকে ডাকতে বলেন। পরে হাফিজুল ইসলামকে ফোন করে ডেকে আনি এবং ওই দুই ব্যক্তিকে মোটরসাইকেল, খাতা-কলম ও দুটি জ্যাকেটসহ তার হাতে তুলে দিই। এরপর আমি ভাবতে পারিনি পরিস্থিতি এমন হবে। আমি নিজেও এমন ঘটনা পছন্দ করি না।’- সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

শনিবার বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওহাব ভূঁঞা ও ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য জানান, সেখানে পবিত্র কোরআন শরীফ অবমাননার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছু লোক উল্টাপাল্টা কিছু বুঝিয়েছে আর স্বার্থান্বেষী একটি মহল তার সুযোগ নিয়েছে।

পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন মোহন্ত জানান, ঘটনা যা ঘটেছে, তা প্রকাশ্য দিনের বেলাতেই সংঘটিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ও মোবাইল ফোনের ফুটেজ তার সাক্ষী। এরইমধ্যে ইন্ধনদাতাদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। সিআইডির ক্রাইমসিন সদস্যরা মাঠে নেমেছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সিনিয়র এএসপি আতাউর রহমান। বলেন, গুজব ছড়িয়ে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। গুজবের উৎস অর্থাৎ প্রথমে কে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনার কোন পর্যায়ে কারা এবং কীভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অপরদিকে ঘটনা তদন্ত শুরু করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের অভিযোগ ও তদন্ত বিভাগের পরিচালক আল মাহমুদ ফাইজুল কবির বিকেল ৫টার দিকে লালমনিরহাটে আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শহীদুন নবী জুয়েলের বন্ধু ও ওই ঘটনায় আহত সুলতান জোবায়েরের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছেন। রোববার বুড়িমারীতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের কথা রয়েছে তাদের।- সূত্র সময় টিভি অনলাইন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here