প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় ঐক্য গড়ে তুলুন : ড. কামাল হোসেন

0
203

‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের’ কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দিয়ে গণফোরামের সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার অাহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেছেন, অামরা প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে ঐক্য করার অাহ্বান জানাচ্ছি। দেশে ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’ ফিরিয়ে অানার জন্য সবাইকে পাহারা দিতে হবে, যেন কেউ কালো টাকার প্রভাব খাটাতে না পারে।

শনিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘যুক্তফ্রন্ট’ ও ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া’র ঘোষণা প্রকাশের জন্য অায়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল এ কথা বলেন।

এই ‘বৃহত্তর ঐক্য’ প্রক্রিয়ায় ‘স্বাধীনতার পক্ষের সব শক্তিকে’ যুক্ত হওয়ার অাহ্বান জানিয়েছে ড. কামাল বলেন, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ।এটা বাস্তবায়ন করতে সুষ্ঠু একটি নির্বাচন দরকার। স্বাধীনতার ৫০ বছরকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যখনই নির্বাচন দেওয়া হয়, তখনই অামাদের সামনে অাসতে হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হবে, অামরা অাশাবাদী, সন্ত্রাস-কালো টাকামুক্ত নির্বাচনে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবাই ভোট দিতে পারবেন। এজন্য প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় পাহারা দিতে হবে। কার্যকর গণতন্ত্র কেবল সংবিধানেই লেখা অাছে, কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য অামরা কাজ করছি। প্রকৃত অর্থে যারা জনগণের প্রতিনিধি তারাই দেশ পরিচালনা করবে। অাজ থেকে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে’র কার্যক্রম শুরু হলো।

এসময় অা স ম অাব্দুর রব বলেন, অামরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সেখানে যেতে দেয়নি।তারা অামাদের জানিয়েছে, শহীদ মিনারে যাওয়া যাবে না। সেখানে পুলিশ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সেজন্য প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করতে হলো।

সংবাদ সম্মেলনে ‘বৃহত্তর ঐক্যে’র পাঁচ দফা দাবি ও নয় দফা লক্ষ্য পাঠ করে শোনান মাহমুদুর রহমান মান্না।

সংসদ ভেঙে দিয়ে সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনচালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন, সেনা মোতায়েনসহ যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পাঁচ দফা দাবি হলো-

১. জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। ওই সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।

২. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাক্‌, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।

৩. কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রছাত্রীসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে এবং গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে। এখন থেকে নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা যাবে না।

৪. নির্বাচনের এক মাস আগে থেকে নির্বাচনের পর ১০ দিন পর্যন্ত মোট ৪০ দিন প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে।

৫. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা ও পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর যুগোপযোগী সংশোধন করতে হবে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে।

লক্ষ্যসমূহ হলো-

১. বাংলাদেশে স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থা থেকে পরিত্রাণ এবং একব্যক্তি কেন্দ্রিক নির্বাহী ক্ষমতা অবসানের লক্ষ্যে সংসদে, সরকারে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নসহ প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ, ন্যায়পাল নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করা। সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ কমিশন গঠন করা।

২. দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা হবে। দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতিকে কঠোর হাতে দমন এবং ইতোপূর্বে দুর্নীতির দায়ে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

৩. দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, বেকারত্বের অবসান ও শিক্ষিত যুবসমাজের সৃজনশীলতাসহ রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে মেধাকে একমাত্র যোগত্যা হিসেবে বিবেচনা করা।

৪. কৃষক-শ্রমিক ও দরিদ্র জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সরকারি অর্থায়নে সুনিশ্চিত করা।

৫. জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্নীতি ও দলীয়করণের কালো থাবা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা।

৬. রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জনগণের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শৃঙ্খলা নিশ্চিত, জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বণ্টন ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

৭. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যমত গঠন এবং প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক সৃজনশীল এবং কার্যকর ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

৮. ‘সকল দেশের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’- এই নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা এবং প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে পারস্পরিক সৎ প্রতিবেশিশুলভ বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ ইত্যাদির ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৯. বিশ্বের সকল নিপিড়ীত মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের দেশে ফেরত ও পুনর্বাসনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার। দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফর উল্ল্যাহ প্রমুখ।

উল্লেখ্য, জাতীয় ঐক্যের পূর্ব নির্ধারিত এই কর্মসূচিতে আসার পথে মগবাজারে অসুস্থ হয়ে পড়ায় জাতীয় ঐক্যের পূর্ব নির্ধারিত এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে পারেননি বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা (বি) চৌধুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here