প্রভাষ আমিন: হাজী সেলিমপুত্রের কাণ্ড- কথায় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে

0
36

কথায় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। নৌবাহিনীর কর্মকর্তার গায়ে হাত তুলে সেই কল নাড়িয়ে দিয়েছেন ইরফান সেলিম নিজেই। এখন সেই কল তাদের সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেবে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচনী অফিস ছিল কাকরাইলে। সেটি ছিল এম মোরশেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক গ্রুপের অফিস। এখন সম্ভবত সেই ভবনে কোনো একটি ব্যাংকের শাখা। সেই ভবন থেকেই বিএনপির মনোনয়নপত্র বিলি, জমা, মনোনয়ন ঘোষণা করা হচ্ছিল। সে নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হলেও বিএনপির গা থেকে তখনও ক্ষমতার গন্ধ যায়নি। সদ্য ক্ষমতা ছাড়া বিএনপির মনোনয়নের জন্য তখন ব্যাপক চাহিদা। আমি তখন ভোরের কাগজের রিপোর্টার। সেদিন অ্যাসাইনমেন্ট ছিল বিএনপির কাকরাইলের নির্বাচনী অফিসে। পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে হাজি মো. সেলিম নামে এক ওয়ার্ড কমিশনার (কাউন্সিলর) এলেন বিশাল মিছিল নিয়ে। তার ইচ্ছা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লালবাগ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। কিন্তু একই আসনে ছিলেন বিএনপির পুরানো সৈনিক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মীর শওকত আলী। বিএনপির মনোনয়ন পাবেন না নিশ্চিত হয়ে সেই একই মিছিল নিয়ে হাজি সেলিম চলে যান ধানমন্ডির সুধাসদনে। নৌকা প্রতীক নিয়েই হারিয়ে দেন মীর শওকতকে। সেই পরাজয় থেকে বিএনপি শিক্ষা নেয়- বুনো ওলের জন্য বাঘা তেঁতুল লাগবে। তারা বুঝে যায় হাজি সেলিমের মতো মাস্তানের মোকাবিলায় মাস্তানই লাগবে। ২০০১ সালে নাসির উদ্দিন পিন্টুর কাছে কুপোকাত হয় হাজি সেলিম। তারপর ১/১১ আমাদের রাজনীতির অনেক কিছু ওলটপালট করে দেয়। নানান মামলা-মোকদ্দমার কারণে ২০০৮-এর নির্বাচনে অংশই নিতে পারেননি হাজি সেলিম। আওয়ামী লগের মনোনয়ন পান পুরানো সৈনিক ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, হাজি সেলিমের দাপটের কারণে ছাত্রলীগের এই সভাপতিও রাজনীতিতে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভরসা রাখে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের ওপরই। কিন্তু স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করে হাজি সেলিম ডুবিয়ে দেন নৌকাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আর ঝুঁকি নেয়নি। হাজি সেলিম আবার নৌকার হাল ধরেন এবং জিতে আসেন। লালবাগের এই আসনটি বাংলাদেশের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের এক আদর্শ উদাহরণ হয়ে থাকবে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলেরই রাজনীতিকেই গিলে খায় দুই দুর্বৃত্ত- হাজি সেলিম আর নাসির উদ্দিন পিন্টু। আর এই দুর্বৃত্তায়নের জোয়ারে ভেসে যান তুলনামূলক ক্লিন ইমেজের দুই রাজনীতিবিদ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন আর মীর শওকত আলী।

হাজি সেলিম আর নাসির উদ্দিন পিন্টুর বাঘে-মোষের লড়াইটা লালবাগে ভালোই চলছিল। এক জঙ্গলেই যেন দুই বাঘ। কিন্তু কারাগারে পিন্টুর মৃত্যুর পর লালবাগকে সত্যিই জঙ্গলে পরিণত করেন হাজি সেলিম। আর সেই জঙ্গলের বাঘ তিনি একাই। শুধু লালবাগ নয়, পুরান ঢাকার একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন হাজি সেলিম। তার কথাই সেখানে আইন। হাজি সেলিমের যা কিছু, সবই আসলে তিনি কিনে নিয়েছিলেন অর্থ আর অস্ত্র দিয়ে। শুধু কমিশনার বা এমপি নয়, এক সময় তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদকও বনে যান। একটা সময় মহানগর আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সাইনবোর্ডসর্বস্ব সংগঠনের যে কোনো আয়োজনে হাজি সেলিমের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। যে কোনো আয়োজনে প্রধান অতিথির পাশের আসনটিই বরাদ্দ থাকতো তার জন্য। তাতে টিভি ক্যামেরায় তাকে বাদ দেওয়ার উপায় থাকতো না। কারণ এসব অনুষ্ঠানের অর্থ জোগান দিতেন হাজি সেলিম।

এভাবে চলছিল ভালোই। কিন্তু রোববার সব গড়বড় করে দিলেন তার ছেলে ইরফান সেলিম। অর্থ আর অস্ত্রের দাপটে হাজি সেলিম এবং তার পরিবারের সদস্যরা ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। বাবার সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলেন ইরফান সেলিম। হাজি সেলিমের ছেলে আবার বিয়ে করেছেন নোয়াখালীর এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর মেয়েকে। বাবা এমপি, শ্বশুর এমপি। ইরফান সেলিমকে আর পায় কে। ধানমন্ডিতে ইরফান সেলিমের গাড়ি ধাক্কা দেয় নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার মোটরসাইকেলকে। তিনি প্রতিবাদ করেন। তাতেই ইরফান সেলিমের দেহরক্ষীরা অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং বেধড়ক মারধর করেন। নিজের পরিচয় দিয়েও রক্ষা পাননি নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তা। বেধড়ক পিটিয়ে তার একটি দাঁত ভেঙে দেয় ইরফানের দেহরক্ষীরা। নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন ইরফান সেলিমের দেহরক্ষীরা তার স্ত্রীকেও লাঞ্ছিত করেছে। তিনি ধানমন্ডি থানায় মামলাও করেন।

সোমবার দুপুরে ইরফান সেলিমকে ধরতে শুরু হয় র‌্যাবের অভিযান। প্রায় ৭ ঘণ্টার অভিযানে যা উদ্ধার করা হয়েছে, তার তালিকা দেখলে যে কারো চোখ কপালে উঠে যাবে। তালিকাটা একবার দেখে আসি চলুন- দুটি বিদেশি পিস্তল, ইয়াবা, বিদেশি মদ, ১০ ক্যান বিয়ার, হ্যান্ডকাফ, অনুমোদনহীন ৩৮টি ওয়াকিটকি, ড্রোন ইত্যাদি। হাজি সেলিমের বাসা থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো পুরান ঢাকায় তাদের সাম্রাজ্য। সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের বাসায় গড়ে তোলা হয়েছিল আধুনিক রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিসহ অত্যাধুনিক কন্ট্রোল রুম। কন্ট্রোল রুমে ছিল আধুনিক ভিপিএস (ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার), ওয়াকিটকি, ড্রোনসহ বিভিন্ন ডিভাইস। ভিভিআইপিদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এলিট বাহিনীর কাছে যেসব সরঞ্জাম থাকে, সেরকম সরঞ্জাম পাওয়া গেছে সাংসদের বাসায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নজর এড়িয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় এই কন্ট্রোল রুম ব্যবহার করা হতো। অবৈধ ওয়াকিটকি এবং বিদেশি মদ রাখার দায়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষীকে দুই মামলায় ছয় মাস করে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। রাতেই তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইন অনুযায়ী কাউন্সিলর পদ থেকেও সাময়িক বরখাস্ত হচ্ছেন ইরফান সেলিম।

বাংলাদেশে অনেকরকম দুর্নীতি হয়, মাস্তানি হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার হয়। আইনপ্রণেতারাই আইনের অপব্যবহার করেন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাদের সবার বিচার হয় না। অনেক অন্যায়ের প্রতিকার হয় না। তবে আমি সবসময় প্রকৃতির বিচারে বিশ্বাস করি। পাপের পেয়ালা যখন পূর্ণ হয়ে যায়, তখন প্রকৃতি বিচার করে দেয়। গত বছর ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানে যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটসহ অনেকের সাজানো সাম্রাজ্য তছনছ হয়ে গিয়েছে। অস্ত্র আর অর্থের দাপটে হাজি সেলিম পুরান ঢাকায় যে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন ছেলের অবিমৃশ্যকারিতায় তা এখন ধ্বংস হওয়ার পথে। লালবাগের লোকজন এখন বলছেন, হাজি সেলিমের ছেলে যা করেছেন, এটা তাদের নিয়মিত রুটিন। চড়-থাপ্পর, মারধর তো কোনো ঘটনাই না। হাজি সেলিম, তার ছেলে, এমনকি তাদের দেহরক্ষীদের গাড়ি রাস্তায় বেরুলেও সবাই তটস্থ থাকত। পান থেকে চুন খসলেই নির্যাতন। আর তা সইতে হতো মুখ বুঁজে। হাজি সেলিমের ছেলের একটি টর্চার সেলও আবিস্কার করেছে র‌্যাব। দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করতে করতে তারা দানব হয়ে গিয়েছিলেন। মানুষকে তারা মানুষ মনে করতেন না। তাই নৌবাহিনীর কর্মকর্তার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে সরি বলা তো দূরের কথা তাকেই পিটিয়ে আহত করেন, লাঞ্ছিত করেন তার স্ত্রীকেও। কথায় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। নৌবাহিনীর কর্মকর্তার গায়ে হাত তুলে সেই কল নাড়িয়ে দিয়েছেন ইরফান সেলিম নিজেই। এখন সেই কল তাদের সব সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেবে। আবারও প্রমাণ হলো, শেষ পর্যন্ত কেউই আইনের উর্ধ্বে নন। আর অপরাধীর কোনো দল নেই।

প্রভাষ আমিন: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here