বঙ্গমাতার ৮৮তম জন্মবার্ষিকীর বিশেষ লেখা বঙ্গবন্ধুর প্রেরণার উৎস শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

0
418

সৈয়দ নূর-ই-আলমঃ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার নায়ক তিনি। আর এজন্য তাকে যে ত্যাগ-তিতিক্ষা সহ্য করতে হয়েছে তার সীমা-পরিসীমা নেই।  এই কঠিন সময়ে একজন পাহাড়ের মতো অটল থেকে স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেরণা জুগিয়েছেন। তাকে শত সমস্যাতেও ভেঙে পড়তে দেননি। সেই মহীয়সী নারীর নাম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মা তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় তার স্বামী বঙ্গবন্ধুসহ স্বপরিবারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

এই মহীয়সী নারীর আজ ৮৮তম জন্মবার্ষিকী। গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯৩০ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তার ডাকনাম রেণু। তিনি মাত্র তিন বছর বয়সে পিতা ও পাঁচ বছর বয়সে মাতা হারান। পিতার নাম শেখ জহুরুল হক এবং মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। দুই বোনের মধ্যে ছোট ছিলেন তিনি। দাদা শেখ কাশেম। চাচাতো ভাই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে শৈশবেই বেগম ফজিলাতুন্নেছার বিয়ে হয়। সেই সময় থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত ছায়ার মতো সঙ্গে ছিলেন বেগম মুজিব।

সপরিবারে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বা থেকে বড় ছেলে শেখ কামাল, ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কোলে কনিষ্ঠ ছেলে শেখ রাসেল, তিনি নিজে (শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব), মেজো ছেলে শেখ জামাল এবং সবশেষ বড় মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সপরিবারে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বা থেকে বড় ছেলে শেখ কামাল, ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কোলে কনিষ্ঠ ছেলে শেখ রাসেল, তিনি নিজে (শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব), মেজো ছেলে শেখ জামাল এবং সবশেষ বড় মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

তিনি একদিকে যেমন হাল ধরেছিলেন কারাবন্দি স্বামীর রেখে যাওয়া সংসারের, তেমনি কারাবন্দী মুজিব সংগ্রামের কঠিন দিনগুলোতে নেতা ও কর্মী বাহিনীর প্রতি যে নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন তা সময়মতো এবং যথাযথভাবে বাস্তবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।

উত্তরাধিকার সূত্রে বেগম মুজিব যতটুকু সম্পদের মালিক হয়েছিলেন তার পুরোটাই তিনি ব্যয় করেছেন সংসার এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত রাজনীতির পেছনে। পুত্রসম শহীদ শেখ ফজলুল হক মণি, নিজ পুত্র শহীদ শেখ কামাল, কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, শেখ জামাল এবং কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার সমস্ত দায়িত্ব সূচারুভাবে পালন করেছেন।স্বামীর জন্য কষ্ট করলেও কখনও কোনো অনুযোগ ছিল না । তার দায়িত্বশীলতার জন্য পরিবার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাড়ায়নি। অভাব-অনটন, কষ্ট, বিড়ম্বনা নীরবে সহ্য করেছেন। কারো কাছে কোন অনুযোগ করেননি। কখনো রাগ করেননি।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অবধি বেগম মুজিবের ভূমিকা ছিল অনন্য। বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে, বেগম মুজিব কখনোবা প্রকাশ্যে কখনও পর্দার অন্তরালে দৃঢ় এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই সময় ছাত্র ও তরুণ সমাজের প্রেরণার প্রধান উৎস ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

১৯৬২ সালে বন্ধবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পর তার পক্ষে ধানমন্ডি ৩২ থেকে সার্বিক নির্দেশনা দিতেন বেগম মুজিব। ১৯৬৬-তে বঙ্গবন্ধু  ৬ দফা ঘোষণা করেন। তখন সেই  ৬ দফা কেন্দ্রিক আন্দোলনে বাঙালি জনগোষ্ঠী একত্রিত হয় শোষণের বিরুদ্ধে। সেই ছয়দফা আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আদায় ও জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করতে লিফলেট হাতে রাস্তায় নেমেছিলেন বঙ্গমাতা। সে সময় আন্দোলন দমন করতে না পেরে আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুসহ অনেক নেতার নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে। ফলে বঙ্গবন্ধু আবারও কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। আন্দোলন আরও বেগবান হয়। দিশেহারা হয়ে আইয়ুব  নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। সূচিত হয় মহান গণঅভ্যুত্থান। জনরোষে ভেসে যায় আগরতলা মামলা, এর বিচারক এবং পাকিস্তানি জান্তার দোসরদের সর্বশেষ ঠিকানা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয় তখন ঘৃণাভরে বেগম মুজিব তা প্রত্যাখ্যান করেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এই সিদ্ধান্ত বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে বড় একটা টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাড়ায়। গবেষকরা এখনো সেই সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

বেগম শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এমনকি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ও ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলন বঙ্গবন্ধুর প্রধান উদ্দীপক ও পরামর্শক হিসেবে বিবেচনা করা হয় বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছেলে শেখ কামালকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সেক্টরগুলোতে নিয়মিত চিঠি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর নিতেন। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের পর দিন ১৭ ডিসেম্বর তার ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বন্দিদশার অবসান ঘটে। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লন্ডনে যান। সেখান থেকে বেগম মুজিবের সঙ্গে তার প্রথম কথা হয়। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। অবসান ঘটে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার দীর্ঘ প্রতীক্ষার। এরপর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজেও বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ান তিনি। অনেক বীরাঙ্গনাকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন জীবনদান করেন।

 

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে তাকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়েছেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি অসীম ধৈর্য, সাহস ও বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রপতি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে বলেন, মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত সহচর। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি জাতির পিতার সঙ্গে একই স্বপ্ন দেখতেন। এ দেশের মানুষ সুন্দর জীবনের অধিকারী হোক, ভালোভাবে  বেঁচে থাকুক- এ প্রত্যাশা নিয়েই তিনি বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময় তৎপর ছিলেন।

 

দিনব্যাপি কর্মসূচি

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ বুধবার (৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টায় বনানী কবরস্থানে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ, কোরানখানি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলো এ কর্মসূচিতে অংশ নেবে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় দিবসটি উদ্যাপনের লক্ষ্যে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।  দিবসটি উপলক্ষে আজ সকালে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানে বঙ্গমাতার ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সড়ক মোড় ও সড়ক দ্বীপসমূহ সজ্জিত করা হবে এবং ফেস্টুন ও বিলবোর্ড স্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক মিডিয়া এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে। দিবসটি উপলক্ষে একটি স্মরণিকাও প্রকাশ করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল আজ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্মৃতি স্বর্ণপদক, বৃত্তি, স্মৃতি বক্তৃতা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের সকল স্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here