‘বলেছিল ৬ মাস, আড়াই বছরেও বিচার পেলাম না’

0
176

‘সবাই বলেছিল, ৬ মাসে বিচার শেষ করবে। আড়াই বছর ধরে আমি ঘুরছি। আজও আমার মেয়েকে নির্যাতনের বিচার পেলাম না।’

কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুরে ধর্ষণের শিকার পাঁচ বছরের শিশু পূজার বাবা ও মামলার বাদী সুবল চন্দ্র দাস। তিনি আরও বলেন, ‘আমার সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। কিন্তু আমি বাকি সাক্ষীদের নিয়ে আদালতে যাই, ঘুরে আসি, খরচ বাড়ে। পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুরে সাক্ষী নিয়ে যাওয়ার খরচ আছে।’

এটা এক ধরনের হয়রানি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আড়াই বছরে মামলার তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি। গত ১৩ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ছিল। সেইদিনও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।’

এদিকে, পূজার আইনজীবী বলছেন, দীর্ঘদিন নারী ও শিশু আদালতে বিচারক না থাকার কারণে মামলাটি পিছিয়ে গেছে। আগামীতে এই অবস্থার নিরসন ঘটবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পার্বতীপুর উপজেলার এই শিশুটি ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হয়। পরদিন বাড়ির পাশে হলুদক্ষেত থেকে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পার্বতীপুর ল্যাম্প হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ২০ অক্টোবর রাতে পুজার বাবা পার্বতীপুর থানায় একই গ্রামের জহির উদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম ও আফজাল হোসেন কবিরাজকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ৭ দিন পর ২৫ অক্টোবর পুলিশ অভিযুক্ত সাইফুলকে দিনাজপুরের ঈদগাহ বস্তি এলাকা থেকে গ্রেফতার করে।

এর দেড় বছর পর ২০১৮ সালের এপ্রিলে শুরু হয় শিশু পূজাকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ। এই মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করা হলেও জামিনে রয়েছে অপর আসামি। এই মামলায় সাক্ষী রয়েছেন মোট ২৪ জন। প্রথম দিন মামলার বাদী সুবল চন্দ্র দাসের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

আইনজীবী তৈয়বা বেগম বলেন, ‘এই মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম জেলহাজতে রয়েছে। অপর আসামি আফজাল হোসেন কবিরাজ উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে রয়েছে। সে এই মামলায় হাজিরা দিচ্ছে।’

এতদিনে এ মামলার এই সামান্য অগ্রগতি কেন, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ছয় মাসের মতো এই আদালতের কার্যক্রম স্থগিত ছিল। এখন আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে আাগামীতে সাক্ষ্যগ্রহণ দ্রুতই হবে বলে আমরা আশা করছি।’

তিনি বলেন, ‘বাদীপক্ষে সাক্ষীদের আনা-নেওয়ার খরচের ব্যাপারটা চিন্তা করে আমি নিয়মিত পূজার বাবার সঙ্গে কথা বলে তাকে কবে আসতে হবে বা হবে না জানিয়ে দিই।’ এর পরের তারিখে পূজার জবানবন্দি নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জবানবন্দি ক্যামেরা ট্রায়ালে হবে নাকি জনসম্মুখে হবে, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ক্যামেরা ট্রায়ালে হবে না, ওপেন আদালতেই হবে। তবে এ ধরনের সংবেদনশীল মামলা সব মামলার শেষে শুনানির জন্য রাখা হয়, যাতে আদালতে লোক সমাগম কম থাকে।’

পূজাকে সম্প্রতি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে উল্লেখ করে তার বাবা ও মামলার বাদী সুবল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমার মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিচার এখনও শেষ হলো না। যখন ঘটনা ঘটে, সেসময় সবাই খোঁজ-খবর রেখেছিল। কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ৬ মাসের মধ্যেই এই নৃশংস ঘটনার আসামির শাস্তি হবে। আমিও আশা করেছিলাম, দ্রুত বিচার হবে। কিন্তু এই দীর্ঘদিন ধরে আদালতে যাওয়া-আসা মিলিয়ে বিচার পাবো কিনা, আমি এখন বুঝতে পারছি না।’

দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি মেহবুব হাসান চৌধুরী লিটন বলেন, ‘বাদী ছাড়াও এক-দুইটা সাক্ষী হয়েছে। কেবল এই মামলাটি সময় নিচ্ছে –এমন না; বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলা আছে।’

তিনি বলেন, ‘পূজা শিশু। তাই মামলাটি শিশু আদালতে যাবে কিনা এটা নিয়েও কিছুদিন কেটেছে। এখন এর সমাধান হয়েছে।’

গত তারিখে সাক্ষী আসার পরেও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামীতে সমস্যা হবে না। আদালত মাঝে বেশ কয়েক মাস ছিল না, গত মাসেও ছুটিতে ছিল, সব মিলিয়ে এমনটা হয়েছে।’

এদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, ‘এ ধরনের মামলায় পুলিশের রিপোর্টে বিলম্ব হয়, পরবর্তীতে আদালতেও বিলম্ব হয়, নানা কারণে বার বার তারিখ পেছানো হয়। আসামিপক্ষ সেই সুযোগ গ্রহণ করে এবং বাদীপক্ষ হতাশ হয়ে মামলা চালানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। যার ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।’

বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে এ ধরনের অপরাধ দমন সম্ভব হবে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এতে অপরাধীরা মনে করতে থাকে অপরাধ করে পার পাওয়া যায়।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here