বহি:বিশ্বে বাংলা সিনেমার বাজার ও সম্ভাবনা

0
309

পনি সিনেমা নির্মাণ করতে চাচ্ছেন? আপনার আগে ভাবতে হবে মুক্তি দিবেন কোথায়। ক্রমশই বাংলাদেশের হল কমছে। কিন্তু আপনিতো সিনেমা বানিয়ে বাংলাদেশের হলের দিকে চেয়ে থাকবেন। তাহলে কী সিনেমা নির্মাণ করবেন না? উপায় একটা আছে, টেলিভিশন প্রিমিয়ার। কিন্তু সেখানে আপনি কতই বা বাজেট পাবেন। পাশের দেশ ভারত যেখানে হাজার কোটি হাকাচ্ছে ছবি প্রতি। শতকোটি তো হচ্ছে নিয়মিত। সেখানে আমরা ১ কোটি বাজেট তুলতেই হিমশিম খাচ্ছি।

একবার ভাবুন: হলিউডের সিনেমা যদি শুধু যুক্তরাষ্টেই মুক্তি পেত? অথবা বলিউডের সিনেমা শুধু ভারতের মানুষ দেখতো? লগ্নি এর অর্থেকও করতে পারতো না। এমন অনেক হলিউডের সিনেমা আছে চীনে আগে মুক্তি দেয়। আবার বলিউডের অনেক সিনেমা দুবাইয়ে মুক্তি পায়। শত্রু দেশ পাকিস্তানেও নিয়মিত চলে বলিউডের ছবি।

সেখানে আমরা শুধু একদেশের মার্কেট বিবেচনাতেই সিনেমা বানাই ও মুক্তি দেই। বলিউডের সিনেমা দুবাই কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে ডাকঢোল পিটিয়ে মুক্তি দেয়ার কারণ কী? সহজ হিসেব, অসংখ্য ভারতীয় দুবাই কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে বাস করে। যাদের মধ্যে বলিউড আসক্তি আছে।

তর্ক ও সম্ভাবনা : আমাদের সিনেমায় বিস্তর তর্ক বহুদিন ধরে চলছে, সিনেমার বাজার নাকি ভালো সিনেমা আগে। বড় বাজার না হলে বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বাজেট সাধারণত যেখানে থাকে ১ কোটি। সেখানে একটু বড় মাপের ছবি ১০০ কোটি বলিউডে, ১০ কোটিরও নিচে তো সম্ভবই নয়। আর হলিউডের বাজার থাকে আট হাজার কোটি টাকাও।

গোড়ায় গলদ: কতিপয় নির্মাতা বিদেশে বিভিন্ন উৎসবে ছবি প্রদর্শন করেই মহা খুশি। সেখান থেকে কিছু ক্রেস্ট নিয়ে শোকেজ সাজায়। এটাই কী সবটা? কখনো কী বাংলাদেশি প্রযোজকরা ভেবেছেন যে বহি:বিশ্বে সিনেমা রপ্তানি দেয়া যায়? সব সময় সরকারের ওপর নির্ভরতাও শেষ কথা হতে পারে না। অনেক সময় খবর পাওয়া যায় মিলনায়তন ভাড়া করে বাংলা ছবি প্রবাসে দেখানো হয়। এতে বক্স অফিস রেটিং না বোঝা গেলেও দর্শকের আগ্রহটা বোঝা যায়। দর্শক সমাগমের খবর পাওয়া যায়।

কত প্রবাসী বিদেশে: এক কানাডায় সব মিলিয়ে দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশির বসবাস, যার সিংহভাগ থাকে টরন্টোতে প্রায় ৭৫ হাজার। নিউইয়র্কে পাঁচ লাখেরও বেশি বাঙালির বসবাস। বিভিন্ন শহর মিলিয়ে আমেরিকাতে মোট বাংলাদেশি থাকে প্রায় ৮-৯ লাখ। সারাবিশ্বে যতজন প্রবাসী বাংলাদেশী বসবাস করে তাদের সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করে। প্রায় ২৮ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যে বসবাস করে যাদের অর্ধেক সৌদি আরবে এবং চার ভাগের এক ভাগ আরব আমিরাতে বসবাস করে। সৌদি আরবে ২০ লক্ষেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে। ৩ লাখের বেশি প্রবাসী বাঙালি কাতারে বাস করেন। অস্ট্রেলিয়া, কোরিয়া, যুক্তরাজ্যেসহ ইউরোপের আরও অনেক দেশে অসংখ্য বাঙালিরা বাস করেন।

এই বিশাল বাজার রয়েছে বাংলাদেশের সিনেমার। আপনি ভাবতে পারেন? প্রবাসিরা অপেক্ষা করে কবে বাংলা সিনেমা মুক্তি পাবে। একটু খোঁজ নিয়ে ইউটিউবের খবর নেন। বাংলাদেশের নাটক সিনেমার ভিউয়ার প্রবাসিদের কাছ থেকেই বেশি আসে। আফসোস আমরা সেই বাজার ধরতে পারি না।

দরকার কী: আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো প্রমোশন। দরকার দূতাবাসগুলোও আন্তরিকতা। ভারতীয় সিনেমার বাজার ২০-২৫ বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরী হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশি একটি সিনেমার জন্য বিশ্ববাজারে উন্মুক্ত হতে পারে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকার বেশি।

বিদেশে সিনেমা রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারের যেমন আরেকটু কোমল হওয়া দরকার। তেমনি নির্মাতাদেরও কারিগরি দিক খেয়াল রেখে ছবি নির্মাণ করা উচিত। কমপক্ষে টুকে রেজ্যুলেশনে নির্মাণ হতে হবে। সাউন্ড আন্তর্জাতিক মান ৫: ১। দেশ অনুযায়ী সেই ভাষার সাবটাইটেল আবশ্যক। কী ধরনের সিনেমা? উঁচুমানের বিনোদনমূলক সিনেমা। সে সিনেমা যে হলিউড স্টাইলে হতে হবে তা নয়। দেশের সংস্কৃতি নিয়ে ভালো মানের ছবি। শেকড় টান দেয় এমন গল্প। সেটা অ্যানিম্যাটেডও হতে পারে। এই সময়ে গল্প বলতে হবে। আমাদের বীরত্বগাথা যেসব গল্প। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন অনুভব করেন এটি বাংলাদেশের সিনেমা। নির্মাতারা আর কতগুটিয়ে রাখবে নিজেদের। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক বাংলা সিনেমা। আর কত এক ঘরে হয়ে থাকবে।

সংশ্লিষ্টদের মত:

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের সিনেমাকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেয়ার লক্ষে স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো যাত্রা শুরু করেছে। বাংলাদেশের সিনেমা বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় এবং নির্ভরতার নাম স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো। গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের সিনেমা বিদেশে রপ্তানি করছেন। সেই প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা মো. অলিউল্লাহ সজীব। তিনি বিদেশিই বেশি থাকেন। অনলাইনে তিনি জানান,‘ আমি দেখতাম বিদেশে ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক সিনেমা যেমন তামিল, তেলেগু সিনেমাও বেশ দাপটের সাথে চলে। অথচ আমাদের এত সুন্দর সিনেমার দেশ, আমাদের ছবি নেই। আমি ভাবতাম যদি বিদেশে আমাদের দেশের সিনেমার বাজার তৈরি করা যায় তবে সিনেমা শিল্পটা দাঁড়ানোর ভরসা পাবে। কারণ সিনেমা নিয়ে একটা প্যাশান আমার মধ্যে ছিলো। আর প্রবাসী হওয়ায় লক্ষ করতাম দেশের সিনেমা দেখার জন্য পাগল সবাই। কিন্তু সেই সুযোগটা নেই। পুরনো ছবিগুলো টিভিতে দেখা যেত বা ইউটিউবে। কিন্তু হলে দেখতে না পারার আক্ষেপ সবার মনেই ছিলো। মাঝেমাঝে কিছু সিনেমা বিশেষ আয়োজন করে দেখানো হতো। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখার যে মজা সেটা ছিলো না। এইসব ভাবনা থেকেই সিদ্ধান্ত নিলাম নিজেই বিদেশের সিনেমা হলে দেশের সিনেমা মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করবো। প্রবাসী দর্শকের ইচ্ছেটাও পূরণ হবে, বিদেশে দেশের সিনেমার বাজারও তৈরি হবে ‘

লাভ করা সম্ভব হয়? ‘মোটেও সহজ ছিলো না। অসহায়ের মতো ঘুরাঘুরি করেছি এখানে ওখানে। আমি যেহেতু কানাডায় থাকি। সেখান থেকেই শুরু করি। প্রথমে শিহাব শাহিন ভাইয়ের ‘ছুঁয়ে দিল মন’ সিনেমার মাধ্যমে শুরু করতে চাই। কানাডার সিনেপ্লেক্সে মুক্তি দিতে চাই। কিন্তু শেষমেষ পারিনা। আমি দমে থাকি না। কানাডার স্থানীয় কয়েকজন কর্তব্যক্তি আমাকে সাহস ও সহযোগিতা করেছে। এরপর অস্তিত্ব, মুসাফির, শিকারী, আয়নাবাজি, প্রেমী ও প্রেমী, পরবাসিনী, নবাব, ঢাকা অ্যাটাক, হালদা, গহীন বালুচর’, স্বপ্নজাল। ’

এখন পর্যন্ত ব্যাবসা ভালো করেছে কোন ছবিগুলো? ‘আয়নাবাজি’ সবচেয়ে বেশি। ছবিটি প্রথমদিন থেকেই হাউজফুল ছিলো। প্রথম ৩ দিনের নয়টি শো এর ৭ টি ছিল হাউসফুল। আমাকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখালো। কানাডার টরন্টোতে ছবিটি টানা চার সপ্তাহ চলেছিলো। বলিউডের অনেক বড় ছবির ক্ষেত্রে সাধারণত এমন সাফল্য দেখা যায়। সবমিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার দর্শক ছবিটি দেখেছিলেন। বক্স অফিস আয় ছিলো ৪৮ হাজার ডলার। আমি ভাবলাম যে শুধুমাত্র কানাডা থেকেই যদি ‘আয়নাবাজি’ এত সুপারহিট, আমেরিকাতে তাহলে কেন নয়। সেখানে বাংলাদেশি প্রবাসী কানাডার প্রায় ৭/৮ গুণ। আর মিডল ইস্টে তো আরও বেশি। আমি যোগাযোগ শুরু করলাম ওইসব দেশের প্রধান মাল্টিপ্লেক্স চেইনগুলোর সাথে এবং সফল ও হলাম। আমেরিকায় পরবর্তীতে ‘ঢাকা অ্যাটাক’- বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে খুবই ভালো করে। সিনেমা যথাসময়ে না পৌছানোয় নবাব শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যে মুক্তি দিতে হয়। সেখানে ভালো চলেছে। শাকিব খানের সিনেমা মধ্যপ্রাচ্যে খুব ভালো চলে। বাংলা ইনসাইডার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here