বাংলাদেশি কিশোরের হাতে আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার

0
47
‘সাইবার বুলিং’ থেকে শিশুদের রক্ষায় কাজ করে এ বছর আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের কিশোর সাদাত রহমান।

নেদারল্যান্ডসের হেগে শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে নড়াইলের ১৭ বছর বয়সী সাদাতের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই অনলাইনে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে সাদাতকে এই পুরস্কার দেন।   

শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নাজুক অবস্থায় থাকা শিশুদের সুরক্ষায় কাজের জন্য প্রতি বছর এই পুরস্কার দেয় ‘কিডস রাইটস’ নামের একটি সংগঠন। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা এই পুরস্কারের জন্য আবেদন করতে পারেন।

কিডস রাইটসের বিশেষজ্ঞ কমিটি ৪২টি দেশের ১৪২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে সাদাতকে এ বছরের পুরস্কারের জন্য বিজয়ী ঘোষণা করেছেন বলে সংগঠনটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।

সাইবার বুলিং বন্ধে সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি সাদাত ‘সাইবার টিনস’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছেন, যার মাধ্যমে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা উপকৃত হচ্ছে।

“এই পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম পেলেন, যা তাকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে তার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দেবে,” বলেছে কিডস রাইটস।

পুরস্কারের সঙ্গে এক লাখ ইউরো পাচ্ছেন সাদাত, যে অর্থ তিনি তার এই কাজে ব্যয় করতে পারবেন।

২০০৫ সালে রোমে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীদের এক সম্মেলন থেকে সম্মানজনক এই পুরস্কার চালু করা হয়। প্রতিবছর একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী পুরস্কারটি হস্তান্তর করেন।

এর আগে মালালা ইউসুফজাই, সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, ফ্লোরিডার স্কুলে বন্দুকধারীর গুলিতে বহু হতাহতের পর যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দাবিতে ‘মার্চ ফর আওয়ার লাইভস’র আয়োজক শিক্ষার্থীরা এই পুরস্কার পেয়েছেন।

মালালা ইউসুফজাই ২০১৩ সালে এই পুরস্কার পাওয়ার পরের বছর মেয়েদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সম্মানজনক এই পুস্কার পাওয়ার পর সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন সাদাত রহমান।

তিনি বলেন, “আমি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করি। এবং আমি খুবই সাধারণ একটি ছেলে। আমি যদি সাইবার বুলিং থেকে কিশোর-কিশোরীদের রক্ষা করতে পারি তাহলে অন্যরা কেন পারবে না?”

সাদাতকে নিয়ে কিডস রাইটস লিখেছে, বাবা পোস্ট মাস্টার হওয়ায় এই কিশোর শৈশবেই বাংলাদেশের অনেক জায়গা ঘুরেছেন। এটা তার জন্য কষ্টকর হলেও প্রতিটি জায়গায় তিনি নতুন কিছু শিখেছেন এবং নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করেছেন। ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হয়ে তিনি ভিডিও নির্মাণ ও ওয়েবসাইট তৈরিতে মনোযোগী হন। এই সময়ে তার যে অনলাইন দক্ষতা তৈরি হয় তা পরে কাজে লাগে। এখন তিনি নিজের গড়ে তোলা সংগঠন ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ এবং সাইবার বুলিং বিরোধী অ্যাপ ‘সাইবার টিনস’ এর মাধ্যমে অন্যান্য শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সহায়তায় ওই দক্ষতা কাজে লাগান।

নড়াইল ভলান্টিয়ার্স

২০১৭ সালে যখন মিয়ানমারে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছিল, সে সময় তরুণদের একত্রিত হওয়ার শক্তি বুঝতে পারেন সাদাত। তখন শান্তির আহ্বান জানিয়ে একটি সাইকেল র‌্যালি করেন সাদাত ও তার বন্ধুরা। পরে এই অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘নড়াইল ভলান্টিয়ার্স’ নামের সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। শিশু-কিশোরদের এই গ্রুপ শিশু অধিকারের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করে।

সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে ১৫ বছরের এক কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনা নাড়া দিয়ে যায় সাদাতকে। এরপর সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কিশোর-কিশোরীদের সহায়তার জন্য তিনি তৈরি করেন ‘সাইবার টিনস’ অ্যাপ।ছবি- কিডস রাইটস

বাংলাদেশে সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ বা বাবা-মাকে বলতে ভয় পেয়ে থাকে। এই অ্যাপ তাদের নিরাপদ ইন্টারনেটের ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি গোপণীয়তার সঙ্গে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ করে দেয়। এদিকে সংগঠনের মাধ্যমে সাইবার বিশেষজ্ঞ, সোশ্যাল ওয়ার্কার ও পুলিশকে এক জায়গায় নিয়ে আসেন সাদাত।

সাইবার টিনস

এই অ্যাপের মাধ্যমে এরইমধ্যে সাইবার বুলিংয়ের শিকার ৩০০ এর বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছেন। ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে রিপোর্ট করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানসহ নানাভাবে এই সহায়তা করা হয়েছে। এই অ্যাপের কল্যাণে সাইবার অপরাধের জন্য আটজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে ইন্টারনেট সেইফটি নিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে সাদাত ৪৫ হাজারের বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরীর কাছে তার বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। নিজের এলাকার প্রতিটি স্কুলে ‘সাইবার ক্লাবস’ তৈরি করেছেন তিনি। এসব ক্লাবে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ইন্টারনেট সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়া হয়। এখন নিজের লোকালয় ছাড়িয়ে বাংলাদেশজুড়ে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তার অ্যাপকে কাজে লাগাতে চান সাদাত।ছবি- কিডস রাইটস

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি তিনটি তরুণ-তরুণীর মধ্যে একজন সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। সাইবার বুলিংয়ের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে নিদ্রাহীনতা, নিজের ক্ষতি করা বা এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সূত্র: বিডিনিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here