বাংলাদেশে তথ্য মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের বিদায় ঘণ্টা!

0
216

গণমাধ্যম ডেস্কঃ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বার বার ধাক্কা খাচ্ছে। আমেরিকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অভিযোগে সিনেটের মুখোমুখি হতে হয় ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে। ইতোমধ্যে কেমব্রিজ এ্যানালিটিকা ডেটা কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে একের পর এক নানা প্রাইভেসি উদ্বেগ জন্ম দিয়েছে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি। দুনিয়া জুড়ে ফেসবুক এখন ফেইক নিউজ বা মিথ্যা সংবাদ ছড়ানোর অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে এখন অনেকে মজা করে ফেসবুককে ‘ফেইকবুক’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সহপাঠী হত্যার বিচারের দাবিতে গত ২৯ জুলাই থেকে রাজধানীর প্রধান সড়কে অবস্থান নেয় সমবয়সী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ধীরে ধীরে একটি গণ আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ঘটনায় দেশের নৌপরিবহনমন্ত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকদের নেতা শাজাহান খানের হাসিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর তিরস্কার এবং ক্ষমা চেয়ে দৃশ্যপট থেকে নিজেকে রক্ষা করেন তিনি।

তবে ঘটনার দু’দিন পর অন্দোলনের পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নিতে থাকেন অনেকে। শিক্ষার্থীরা হাতে যেসব প্লেকার্ড নিয়ে আন্দোলন করছিলেন সেগুলোর ছবি এডিট করে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে ফেসবুকে পোস্ট করতে থাকে একটি পক্ষ। আন্দোলনের বিপরীতে অবস্থান করা পক্ষটি সহজেই সেটি বিশ্বাস করে নেয়। শেয়ার দিয়ে, মত প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের ছবিগুলোকে ছড়িয়ে দেন। তবে কোনো ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের হাতে এই ধরনের অশ্লীল শব্দের প্লে-কার্ড দেখা না গেলেও ফেসবুকে এসব ছবিতে সয়লাব হয়ে উঠে। শহরের আন্দোলনকারীরাও ফেসবুককে বেছে নেন আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। সেখানেও আইন শৃঙ্খলাবাহিনী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদদের অপমানকার ছবি ও ভিডিও পোস্ট করা হতে থাকে। এতে একটি পক্ষ যেমন হাত তালি দিতে থাকে, আরেকটি পক্ষ মুষড়ে পড়েন। যারা ছবিগুলো পোস্ট করছিলেন, তারা একবারও এসব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সর্ম্পকে ভাবলেন না। নিজেদের মত ছড়িয়ে দিতে এই চরম আপত্তিকর কাজটি তারা করতেই থাকলেন।

জানা গেছে, মুম্বাইসহ পুরো ভারতে স্যানিটেশন একটি বড় সমস্যা। সকালে মানুষ টয়লেট ব্যবহার করার চেয়ে রাস্তার দু’ধারে পয়ঃনিস্কাশনের জন্যে বসে যান। তাদের ঠেকাতে মুম্বাই সিটি কর্পোরেশন পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ভোর বেলায় অভিযানে নামেন। যারা পথের দু’ধারে বসে যেতে চাইতেন, তাদেরকে জরিমানা করা শুরু হয়। এমনকি কান ধরে ওঠবসও করানো হতো। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন যখন নিজেদের ফেসবুক পেইজে এসব মানুষদের ছবি পোস্ট করতে থাকেন, তখনই বাধে গোল। কারণ একজন মানুষ আইন ভাঙ্গলে তার শাস্তি দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা যায় না। মুম্বাই মিরর থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান টাইমস পত্রিকা এই অপমানকার ছবিগুলোর বিপক্ষে সরব হয়ে ওঠে। কারণ এটা মানুষের সামাজিক অবস্থানের ওপর হস্তক্ষেপ।
কিন্তু বুঝে না বুঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার সর্ম্পকে অপরিণামদর্শীতার অভাবে বাংলাদেশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও এসব করতে থাকেন। আন্দোলনের সপ্তম দিনে এসে ফেসবুক হয়ে উঠলো ফেইক নিউজে ঠাসা। চার জন খুন, দুই জন ধর্ষিত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়তে থাকলো। মূলধারার গণমাধ্যমে নিজেদের মনের মতো খবর প্রকাশ না হওয়াতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই বেছে নিলেন আন্দোলনের পক্ষ বিপক্ষ শক্তি। দুই একটি ছাড়া বেশিরভাগ মূল ধারার গণমাধ্যম যেখানে বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে খবর যাচাই করে প্রকাশ করে, সেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেরা নিজেদের মত প্রকাশ করে সেটাকেই তথ্য হিসেবে বেছে নিতে থাকেন বিভিন্ন মতাবলম্বীরা। তবে এক সময় যেমন খুন বা ধর্ষণের খবর মিথ্যা প্রকাশ হয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের ওপর সন্ত্রাসীদের হামলার বাস্তব চিত্রও উঠে আসে মূল ধারার গণমাধ্যমে।

রোববার ধানমন্ডি-সায়েন্সল্যাব এলাকাজুড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর যে হামলা হয় পুলিশ এবং সরকারদলীয় বাহিনীর সেই খবরগুলোও যথাযথভাবেই তুলে ধরে মূল ধারার গণমাধ্যম। তবে এরই মধ্যে মতের পক্ষ বিপক্ষ যখন ঘৃণা ছড়ানোর জন্যে ফেসবুকে নিজেদের মনের মতো ছবি, ভিডিও পোস্ট করে অস্থীতিশীল অবস্থা তৈরি করতে তৎপর তখন কিন্তু সাধারণ মানুষ বেছে নিয়েছেন মূল ধারার গণমাধ্যমকেই। কারণ গত কিছুদিনের অভিজ্ঞতায় অন্তত ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এটুকু বুঝতে পেরেছেন, সত্যিকারের সংবাদ পেতে হলে মূল ধারার গণমাধ্যমেই ঢুঁ মারতে হবে।

মার্কিন সাময়িকী ফরচুন’র এক প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে, ডেটা বা তথ্য নিরাপত্তা লঙ্ঘণ নিয়ে মার্কিন আর ইউরোপীয় সরকারগুলোর কড়া তদন্তের মুখে রয়েছে ফেসবুক এবং তার প্রতিষ্ঠাতা জাকারবার্গ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে হলো ফেসবুককে। গত ২৭ জুলাই বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে ফেসবুকের শেয়ার দর ২০ শতাংশ কমে যায়। ফলে ফেসবুকের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা টাকার অঙ্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে কোনো কোম্পানির একদিনে সবচেয়ে বড় ক্ষতি।

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন আর্ন্তজাতিক মিডিয়াগুলোর প্রধান খবরগুলোর একটি। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশেও ফেইক নিউজের বাহক হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তুলেছে ফেসবুক। অন্তত এটুকু অনুমান করা যায়, ব্যবহারকারীরা অন্তত নিজেদের পক্ষ না হোক বিপক্ষ মতের প্রচারণা যাচাই করার জন্যে হলেও মূলধারার গণমাধ্যম থেকে যাচাই করবে। আর সেক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে হবে অনলাইন নিউজপোর্টালগুলোকেই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে।
২০১৬ সালের আগেও আমেরিকান নির্বাচনের আগে একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ এবং সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের একটি বড় বিতর্কের জায়গা ছিল, ফেসবুক বা টুইটার অথবা ইউটিউব কি মূলধারার গণমাধ্যমের জন্যে ঝুঁকি হয়ে উঠবে? ২০১৬ সালে মার্কিন নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ফেসবুকে আসক্ত হয়ে পড়েন ভোটাররা। তবে নির্বাচনের পরে হলেও সেখানকার মানুষ বুঝতে পারে যে ফেসবুকের ফেইক নিউজ দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন তারা। তখন থেকেই বিশ্বব্যাপী নতুন ধারণার জন্ম নেয় যে ফেসবুকের নিজের মৃত্যুর কারণ হবে ফেসবুক নিজেই। এতো বেশি মিথ্যা আর ভ্রান্তি ছড়ানো শুরু হবে যে মানুষ আবারো ট্রেডিশনাল মিডিয়াতে প্রবেশ করতে বাধ্য হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সেই বিষয়টি বাংলাদেশিদের কাছে পরিস্কার হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। ফেসবুক এখানেও ফেইক বুক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ছে। গণমাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। মানুষকে সত্য জানতে মূলধারার গণমাধ্যমেই ভরসা রাখতে হচ্ছে। তথ্যের মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশে ফেসবুকের মৃত্যু ঘণ্টা হয়তো এখান থেকেই বাজতে শুরু করেছে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here