বাংলা সাহিত্যে নবী বন্দনা

0
1464

মহান আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত প্রশংসার প্রকৃত মালিক। কিন্তু পরম করুণাময়ের ইচ্ছাতেই তাঁর হাবীব শ্রেষ্ঠ নবী হযরত (সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)’র পবিত্র নামকরণ হয়েছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। যার অর্থ চরম প্রশংসিত। তাফসীরে কবির, তাফসীরে রুহুল মাআনী সহ বহু প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থের বর্ণনায়ও রয়েছে যে হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম সর্বপ্রথম চোখ খুলে আরশে আযীম-এ খচিত দেখেছিলেন তাওহীদের বাণীর পাশেই আখেরী নবীর নাম সংযোজিত।
কাজেই নবী প্রশংসার অন্যতম সূচক তাঁরই পবিত্র নামের মাধ্যমে অনাদিকাল থেকেই সূচিত হয়েছিল নবী প্রশস্তির ধারা। সৃষ্টির আদিপুরুষ মানব-পিতা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর মুখেও সেই প্রশংসিত নাম উচ্চারিত হয়েছিল। পরবর্তীতে নবী রাসূলগণের মাধ্যমে যুগে যুগে বিভিন্ন অঞ্চলে স্বজাতির কাছে প্রচার পেয়ে চর্চিত হয়েছিল প্রশংসিত সত্তা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র
‘‘বাংলা ভাষার উৎপত্তি অন্যান্য ভারতীয় আর্যভাষার মতোই নদীপ্রবাহের সঙ্গে তুলনীয়। নদী প্রবাহের মতোই এ ভাষা কালানুক্রমিকভাবে যত অগ্রসর হয়েছে, ততই এর পরিবর্তন হয়েছে, ততই এর আকার আয়তন বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপর এই বিংশ শতাব্দীতে এ ভাষা সহস্রমুখী হয়ে চলেছে নব নব সম্ভাবনার সাগর সঙ্গমে। …….. মজার কথা সহস্র বছরের পুরনো এ সাহিত্যের প্রাচীনতম নমুনায় হযরতের প্রশংসিত নাম তথা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র বর্ণনা বিস্ময়করভাবে উপস্থিত এবং তাও একজন অমুসলিম কবির যবাণীতে। ড. এস এম লুৎফুর রহমান এ তথ্য পরিবেশন করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘‘আনুমানিক নয়, নিশ্চিত রূপেই ১০০০ থেকে ১০২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই বৌদ্ধ কবি রামাই পণ্ডিত রচিত ‘‘কলিমা জাল্লাল’’ নামক রচনায় পহেলা রাসূল করীম (সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)’র তারিফ করা হয়েছে। তাঁকে অমুসলিমদের ইলাহ্ (প্রভু বা উপাস্য) ব্রহ্মার সাথে তুলনা করে গৌড়ে মুসলিম বিজয় অভিযানকে বেহেশতি রহমত রূপে বয়ান করতে বলা হয়েছে-
ব্রহ্মা হৈল মুহাম্মদ বিষ্ণু হৈল পেকাম্বর
আদম্ব হৈলা মূল পানি
গণেশ হৈলা গাজী কার্ত্তিকা হৈলা কাজী
ফকীর হৈলা যথ মুনি।
‘শূন্য পুরান’ কাব্যে সংকলিত নিরঞ্জনের ‘রুস্ম’ কবিতায় এ অংশ পাওয়া যায়। আধুনিক নিরঞ্জনের রুস্মা কবিতার মূল নামই ‘‘কলিমা জল্লাল’’। শূন্য পুরানে ছাপা এ কবিতার পুরো পাঠ পাওয়া যায় রামাই পণ্ডিতের অপর রচনা ‘ধর্ম্মপূজা বিধান’’।(৩) প্রচীন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দ্বিতীয় নিদর্শন শোক শুভোদয়া যেখানে আখেরী নবীর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। মোটামুটিভাবে এ দুটি সাহিত্যকর্মে বাংলায় নবী স্তুতির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।
মধ্য যুগে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি হয় নব প্রাণের উচ্ছ্বাস। এরপর বাংলা কাব্যে নবী বন্দনার জয় জয়কার। রাখঢাক নয়, কবিদের ঐতিহ্যের স্থান দখল করলো স্পষ্টতরভাবে নবী প্রশস্তি। ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে ১৩৮৯ থেকে ১৪১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত কবি শাহ্ মুহাম্মদ ছগীর’র ইউছুপ জোলায়খা কাব্যে নবী বন্দনার অস্তিত্ব গৌরবদীপ্ত হয়ে প্রতিভাত হয়।(৪) নমুনা উদ্ধৃত হতে পারে।
‘‘জীবাত্মার পরমাত্মা মুহাম্মদ নাম
প্রথম প্রকাশ তথি হৈল অনুপাম।
যত ইতি জীব আদি কৈলা ত্রিভূবন
মুহাম্মদ হোন্তে কৈলা তা সব রতন।
একলক্ষ চব্বিশ হাজার নবীকূল
মুহাম্মদ তান মধ্যে প্রধান আদ্যমূল।’’
ওই যুগের মুহাম্মদ ছগীরই নন, বরং ব্রিটিশ শাসনকালে পর্যন্ত প্রায় সব মুসলিম কবি হামদ বা আল্লাহর প্রশংসার পরপরই না’ত বা নবীপ্রশস্তির রীতি অনুসরণ করেন। মুসলিম শাসনামলে অপর প্রাচীন কবি জৈনুদ্দীন বাংলার সুলতান ইউসুফ শাহের সভাকবি ছিলেন। ‘রাছূল বিজয়’ কাব্যে অসাধারণ রণকুশলী হিসেবে নবী প্রশংসা ধ্বনিত।
‘‘নিঃসরিলা নবীবর সঙ্গে অশ্ববার
প্রচণ্ড মৃগেন্দ যেন সাতাইশ হাজার।
চলিল সকল সৈন্য করিয়া যে রোল
প্রলয়ের কালে যেন সমুদ্র হিল্লোল।’’
কবি জৈনুদ্দীন’র এ কাব্য ১৪৭৪ থেকে ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত।(৫) রাছুল বিজয় নামে আরো একটি কাব্য সাবিরিদা খান (শাহবরিদ খান)’র রচিত পাওয়া যায়। এটি আনুমানিক ১৪৮০ থেকে ১৫৫০ এর মধ্যেই রচিত। উভয় গ্রন্থ বিষয় ও উদ্দেশ্যগতভাবে অভিন্ন। তবে পাণ্ডিত্য ও কাব্য কলায় সাবিরিদ খান শ্রেষ্ঠ। প্রিয় নবীর জীবন ও কর্ম ভিত্তিক সর্ববৃহৎ কলেবর সমৃদ্ধ কাব্য কবি সৈয়দ সুলতান (১৫৫০-১৬৪৮) রচিত নবীবংশ, একটি মহাকাব্যের আদর্শ হয়ে বিদ্যমান।(৬.) এটি বিষয় বৈচিত্র ও আকারে সপ্তকান্ত রামায়নকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে ড.মুহাম্মদ এনামুল হকের মন্তব্য।(৭.) এখানে নবীবন্দনা কীরূপ বাঙময় তা প্রণিধানযোগ্য বটে।
‘‘প্রথমে প্রণাম করি প্রভু নৈরাকার
আদ্যে যে আছিলু তাহা করিমু প্রচার।
যেরূপে আদম ছাফি হৈলা উৎপণ
কহিলাম সেসব কিঞ্চিৎ বিবরণ।
দ্বিতী এ প্রণাম করি প্রভু নিরঞ্জন
নূর মুহাম্মদের কহিব বিবরণ।’’
পরবর্তীতে শেষ চান্দ, আলাওল, মুহাম্মদ খান, দৌলত কাজী, সৈয়দ মুর্তজা, হায়াত মামুদ, সৈয়দ হামজা, মুনশীজান, শাহ্ গরীবুল্লাহ্, মুহাম্মদ দানেশ, খাতের মুহাম্মদ প্রমুখ কবিরা তাঁদের কাব্যে নানাভাবে নানাভঙ্গিতে নবীবন্দনা উপস্থিত করেছেন। এঁরা সকলে ছিলেন মধ্য যুগের কবি। এঁদের সময়কাল খ্রিস্টাব্দ পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ-পর্যন্ত। এঁদের মধ্যে শাহ্ মুহাম্মদ ছগীর, আলাওল, দৌলত কাজী, সৈয়দ মর্তুজা, হায়াত মামুদ প্রমুখ ফার্সি কবি ফেরদৌসী, রুমি, জামী, নিজামী, আত্তার, আমীর খসরু ও অন্যান্য মরমী কবিদের রচনায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাঁদের কাব্যে নবী-বন্দনা ও রাসূল প্রশস্তি ব্যাপকভাবে অনুরণিত। দুয়েকটি চরণ উদাহরণ স্বরূপ বর্ণিত হতে পারে-
‘‘প্রণামহু তান সখা মহম্মদ নাম
এ তিন ভুবনে নাহি যার উপাম।’’
[লাইলি-মজনু:দৌলত উজীর]
‘‘মহাম্মদ আল্লাহর রসূল সখাবর
যার নূরে ত্রিভূবন করিছে প্রসর।’’
[সতীময়না ও লোর চন্দ্রানী: দৌলত কাজী]
‘‘পূর্বেতে আছিল প্রভু নৈরূপ আকার
ইচ্ছিলেক নিজ সখা করিতে প্রচার।’’
‘‘নিজ সখা মহাম্মদ প্রথমে সৃজিলা
সেই জ্যোতিমূলে ত্রিভূবন নিরমিলা।’’
[পদ্মাবতী: সৈয়দ আলাওল]
‘‘আপনার দোস্ত হেনা তাহারে বুলিলা
সেই নুর হোন্তে আল্লা সকল সৃজিলা।’’
[নূর জামাল: হাজী মুহাম্মদ]
‘‘প্রথমে প্রণাম করি প্রভু করতার
তার পাছে প্রণামি এ রছুল আল্লাহর।’’
[যোগ কালন্দর: সৈয়দ মর্তুজা]
মধ্যযুগের সমগ্র কাব্য ও পুঁথি সাহিত্যে প্রায় সকল রচনায় এভাবে বিচিত্র ব্যঞ্জনায় ও দে্যাতনায় নবীবন্দনা এসেছে ঘুরে ফিরে। পদবাচ্য ধারায় কাব্যধর্ম ও পুঁথি বিংশ শতাব্দীর দুইশতক পর্যন্ত বয়ে চলে। এ ধারায় যাঁদের কাব্য কীর্তি সমুজ্জ্বল তাঁদের মধ্যে খাতের মহাম্মদ, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী, মুন্সী মালে মুহাম্মদ, শেখ ফজলুল করিম, মীর মোশাররফ হোসেন, মুন্সী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ্, পাগলা কানাই, লালনশাহ্, হাসন রাজা, দুদ্দুশাহ্, শীতলং শাহ্ ফকীর, খান বাহাদুর তসলিম উদ্দীন আহমদ প্রমুখের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। পুঁথি সাহিত্যে পদবাচ্যে তাঁদের রচনারীতির নমুনা উল্লেখ করা যায়।
‘‘মহাম্মদ মোস্তফা নবী আখেরী দেওয়ান
যাঁহা কারণে হৈল লওহলা মকান।
যাঁহা কারণে হৈল যমীন আসমান
যাঁহার কারণে হৈল এ দোন জাহান।’’
[তাজুদ্দীন মুহাম্মদ ও খাতের মহাম্মদ (খোলাসাতুল আম্বিয়া)]
‘‘প্রথমে প্রণাম করি প্রভু নিরঞ্জন
যাঁহার সৃজন হয় এ তিন ভূবন।
তৎপরে বন্দনা করি নবীর চরণ
যাঁহার প্রভাবে হয় অন্তিমে তরণ।’’
[রূপজালাল: নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী]
‘‘গাও রে মোসলেমগণ নবীগুণগাও রে
পরান ভরিয়া সব ছাল্লে আলা গাওরে।’’
[মেহেরুল ইসলাম মুন্সী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ্]
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ মানেই কাব্য যুগ। এ যুগে সাহিত্যে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র বন্দনা স্তুতি ও চরিত্র চিত্রণ ছাড়াও পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচিত হয়েছে অনেক। মধ্যযুগীয় কাব্য রীতিতে মহানবীর (সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)’র পূর্ণাঙ্গ জীবনী ‘তাওয়ারীখে মুহাম্মদী’। যার রচয়িতা কবি মুহাম্মদ সায়ীদ। এ ক্ষেত্রে সব চাইতে জনপ্রিয় কাব্য হল ‘কাসাসুল আম্বিয়া’। এর রচয়িতার মধ্যে আছেন মুন্সী তাজউদ্দীন, মুহাম্মদ খাতের, মুন্সী জনাব আলী, মুন্সী রহমত উল্লাহ্ ও মুন্সী আবদুল ওহাব। ‘নূর নামা’ নামে যারা মহানবীর জীবনী কাব্য রচনা করেন তাঁদের মধ্যে হায়াত মামুদ ছাড়াও রয়েছেন শেখ পরান, আবদুল হাকীম ও আবদুল করীম খোন্দকার। শেষোক্ত জন ‘নবীবংশ’ নামেও একটা কাব্য রচনা করেন।
মহানবীর জন্ম বৃত্তান্ত পরিবেশনায় প্রচলিত মিলাদুন্নবী বাঙালি মুসলমানের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সর্বজনীন অনুষ্ঠান। তা প্রথম দিকে আরবী, ফার্সি ও উর্দুতে চলত ব্যাপকভাবে, পরবর্তীতে মুসলিম কবি সাহিত্যিকবৃন্দ মিলাদের জন্য বাংলায় কবিতা ও কাব্য রচনা করতে শুরু করেন। এর সার্থক রূপায়ন ঘটে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পর্বে।
বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে গদ্য সাহিত্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। এর আগে সাহিত্যে গদ্য ব্যবহার প্রচলিত ছিল না। কাজেই মধ্যযুগের সাহিত্যে নবীবন্দনা প্রায় জায়গা দখল করেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। আধুনিক গদ্যের পথিকৃৎ মীর মশাররফ হোসেনই মিলাদুন্নবীর ওপর প্রথম সার্থক কাব্য রচনা করেন। যার নাম ‘মৌলুদ শরীফ’ তাতে কেয়ামের জন্য (সম্মানার্থে দাঁড়ানো) রচিত নয়টি স্তবকের একটি,
‘‘তুমি যে সত্য পয়গম্বর
সে প্রমাণ আছে বহুতর
তবু যার মানতে ধোকা
সে তাহার করমের লেখা।’’
মিলাদ কাব্যের ধারায় যাদের সৃজনী কর্ম আছে তন্মধ্যে মুন্সী মেহেরুল ইসলাম, শেখ জমীরুদ্দীনের ‘আসল বাংলা গজল’ আজহার আলীর ‘সোনার খনি’, কবি দাদ আলীর ‘আশেকে রাসূল’, ডা. আবুল হোসেনের ‘বাংলা মৌলুদ শরীফ’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
আধুনিক বাংলা কাব্যে মহানবীর পবিত্র জীবনধর্মী শ্রেষ্ঠ কাব্য হল কবি নজরুল ইসলামের ‘মরু ভাস্কর’ ও কবি ফররুখ আহমদ’র ‘সিরাজাম মুনীরা’।(৯) এতদুভয় থেকে যথাক্রমে উদ্ধৃতি –
‘‘আধাঁর নিখিলে এল আবার আদি প্রাতের সে সম্পদ
নতুন সূর্য উদিল ওই মোহাম্মদ! মোহাম্মদ!
আরবে তীর্থ লাগি ভীড় করে সব বেহেশত বুঝি
এসেছে ধরার ধুলায় বিলিয়ে দিতে সুখের পূঁজি।’’
অতঃপর
‘‘পূর্বাচলের দীগন্ত নীলে সে জাগে শাহানশাহের মত
তার স্বাক্ষর বাতাসের আগে ওড়ে নীলাভ্রে অনবরত
কে আসে কে আসে সাড়া পড়ে যায়,
কে আসে কে আসে নতুন সাড়া,
জাগে সুষুপ্ত মৃত জনপদ, জাগে শতাব্দী ঘুমের পাড়া।’’
মহানবীর জীবনী কাব্যের ক্ষেত্রে শেখ ফজলুল করিম’র পরিত্রাণ কাব্য উল্লেখযোগ্য। তবে এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হিসাবে ধরা যায় মোজাম্মেল হকের ‘হজরত মুহাম্মদ’কে। এভাবে আ.ন.ম. বজলুর রশীদের লিরিক ছন্দের রচিত মরু সূর্য, জুলফিকার হায়দার’র ‘ফাতেহা-ই দোয়াজদহম’, রইসউদ্দীনের ‘মরু-বীণা’ আবুল হোসেনে’র ‘পেয়ারা নবী’ আহমদ নেওয়াজ’র ‘নবী গীতিকা’ ও আবুল হোসেন’র ‘আল আরবী’ প্রভৃতি নবী বন্দনায় উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
গদ্য সাহিত্যে মহানবীর পূর্ণাঙ্গ জীবন চরিতের মধ্যে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য শেখ আবদুর রহীমের ‘হজরত মুহাম্মদের জীবন চরিত ও ধর্মনীতি’, যা ৬৭০ পৃষ্ঠা ব্যাপী বিস্তৃত। সুসাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরীর ‘মানব মুকুট’ ও ‘নূর নবী’ গ্রন্থদ্বয়ও হযরতের (সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) জীবন চরিতমূলক রচনা। মাওলানা আকরাম খাঁর বস্তুবাদী রচনা ‘মোস্তফা চরিত’ ভক্তপ্রাণের তৃপ্তি মেটাতে না পারায় প্রেমধর্মী বর্ণনার গোলাম মোস্তফা রচিত ‘বিশ্বনবী’ শুধু সমাদৃতই হয়নি, তা হয়েছে অভাবনীয় জনপ্রিয় এক অবস্মিরণীয় সৃষ্টি, যা অপ্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে কালোত্তীর্ণ। মহানবীর জীবনী রচনায় পিছিয়ে থাকেনি অমুসলিম লেখকরাও। গিরিশ চন্দ্র সেন, কৃষ্ণ কুমার, রামপ্রাণ, অতুলমিত্র এবং জেমস লং- এ ক্ষেত্রে কীর্তি স্থাপন করেছেন। এ ধারায় অসংখ্য লেখকের তালিকা কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় উল্লেখ করা গেল না।
বাংলার পল্লী সাহিত্যে বা লোক সাহিত্যেও স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছে নবী বন্দনার পূর্ণ প্রয়াস। মুর্শিদী, মারফতী, পালাগান, জারীগান, বাউলসহ প্রায় ক্ষেত্রে সগৌরবে গীত হয়েছে নবীবন্দনার গান, লালন বলেন,
‘‘তোমার মত দয়াল বন্ধু আর পাবনা
দেখা দিয়ে দ্বীনের রসূল ছেড়ে যেও না।’’
বাউলকবি পাগলা কানাই, কবি শীতলং, ফকীরও এভাবে নবীর প্রশস্তি গেয়ে আত্মার তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। শেখ ভানু, মুসলিম শাহ, মঙ্গল শাহ্, আবদুল জব্বার, কবি ইয়াসিনের অকুন্ঠ নবী বন্দনা ও সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যকে।
আধুনিক কবিতায় না’ত ও গজল লেখা হয়েছে প্রচুর। বাংলা কাব্যে কেউ নবী বন্দনায় নজরুলকে অতিক্রম করতে পারেনি আজো, তাঁর ‘ফাতেহা-ই দোয়াজদহম’ নবীবন্দনায় লিখিত শ্রেষ্ঠতম কবিতা। এরপর আসবে গোলাম মোস্তফার নাম। তাঁর উচ্চারণ-
‘‘নিখিলের চিরসুন্দর সৃষ্টি আমার মোহাম্মদ রসূল।’’
তা এখনও তন্ময় করে ভক্তকুলকে।
‘‘তুমি যে নূরের রবি, নিখিলের ধ্যানের ছবি’’
মিলাদ কাব্যের প্রেরণা জাগানিয়া। এ ছাড়া বেনজীর আহমদ, কাদের নেওয়াজ, রওশন ইয়াজদানি, আবু বকর সিদ্দীক, কাজী গোলাম আহমদ প্রমুখ নবী বন্দনার রচনায় সিদ্ধহস্ত। শিশু সাহিত্যেও এ ধারায় অপূর্ণতা নেই আজ। আহসান হাবীব, হেদায়েত হোসেন, মসউদুর রহমান প্রভৃতি এ ধারার রচনায় উল্লেখযোগ্য নাম।
তথ্যপঞ্জি: ১.বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব), ২. বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত: ড. অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়, ৩. সাহিত্য সংস্কৃতি ও মহানবী (দ.): মুকুল চৌধুরী সম্পাদিত -ইফাবা, ৪. মুসলিম বাংলা সাহিত্য -ঢাকা ১৯৬৫, ৫. প্রাগুক্ত, ৬. মুহাম্মদ মজির উদ্দীন মিয়া, ৭. মুসলিম বাংলা সাহিত্য: ড.এনামুল হক, ৮. অগ্রপথিক, এপ্রিল ২০০৫, ৯. প্রাগুক্ত। [পাক পঞ্জতন সাময়িকী সৌজন্যে]

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here