বিতাড়িত হওয়ার ভয়ে ভারত ছাড়ছে রোহিঙ্গারা

0
200

মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার ভয়ে ভারত থেকে পালিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করার পর থেকে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, ভারত সরকার তাদের গণহারে মিয়ানমারের কাছে তুলে দেবে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, আগামী মে মাসের জাতীয় নির্বাচনে ভোট বাড়ানোর জন্য হিন্দুপন্থী বিজেপি সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এসব উদ্যোগ নিচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ এ খবর জানিয়েছে।

গত মাসে ৭ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে ভারত। একই সময় আসাম সরকারও জানিয়েছে, তারা আরও ২৩ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাবে। এরপরই ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের কারণে জাতিসংঘের হিসেবে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাত লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা। অনেক রোহিঙ্গা ভারতেও পালিয়ে যায়। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে এই অভিযান শুরু হয় বলে দাবি করে থাকে মিয়ানমার। তবে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দাবি, সেনা সদস্য ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বেসামরিক মানুষ তাদের হত্যা, ধর্ষণ এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে থাকায় পালাতে বাধ্য হয়েছে তারা। জাতিসংঘ সমর্থিত একটি তদন্ত দল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্য ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানোর অভিযোগ আনে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তবে এখনও রাখাইনে প্রায় সময়ই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ভারতে অনেক বছর ধরেই প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এতদিন তেমন কোনও সমস্যা না হলেও বর্তমান সরকারের নতুন নীতির কারণে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। গত সপ্তাহে ভারতের উত্তরাঞ্চলের শহর জম্মুর একটি রোহিঙ্গা শিবির থেকে পালিয়ে যান আবুল ফয়েজ। তিনি গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে, ভারত সরকার আমাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে’। ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করছে বলে জানান ফয়েজ। তারা তাকে একটি কাগজে ভারতে প্রবেশের তারিখ ও মিয়ানমারে তার আসল ঠিকানা লিখে দেওয়ার জন্য বলেছে। ফয়েজ বলেন, গত কয়েকদিন জম্মু থেকে দুই শতাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘কেউই মিয়ানমারে ফেরত যেতে চায় না কারণ সেখানে আমরা এখনও সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছি’।

জম্মু শরণার্থী শিবিরে ৬ বছর কাটানোর পর গত সপ্তাহে পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছেন ৬৫ বছর বয়সী রোহিঙ্গা আবু হোসাইন। তিনি টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সন্দেহ হিন্দু গোষ্ঠীর লোকেরাই এটা করেছে। পুলিশ জানিয়ে দিয়েছে তারা আমাদের সাহায্য করতে পারবে না। সেখানকার পরিস্থিতি খুবই প্রতিকূল হয়ে পড়েছে।’

টেলিগ্রাফের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার বিষয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি।

ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। এ কারণে তারা রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে না দেখে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। বাংলাদেশভিত্তিক রোহিঙ্গা রাজনৈতিক কর্মী কো কো লিন জানান, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রায় ১৮ হাজার রোহিঙ্গার নিবন্ধন শেষে পরিচয়পত্র দিয়েছে। এতে করে তারা গ্রেফতার, আটক বা বিতাড়িত হওয়া থেকে বাঁচবে। কিন্তু পরিচয়পত্রধারী অনেকেও বিতাড়িত হওয়ার ভয়ে আছেন। লিন টেলিগ্রাফকে বলেন, এমনকি পরিচয়পত্রধারীরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গত মাসের প্রত্যাবাসন ও সরকার ব্যক্তিগত তথ্যসহ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করায় তাদের মধ্যে এই ভয় ঢুকেছে।

ই-মেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর’র নয়াদিল্লি শাখা বলেছে, সর্বশেষ পদক্ষেপে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যকার এই আতঙ্ক নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।

কয়েক দশক ধরে তেমন কোনও সমস্যা ছাড়াই রোহিঙ্গারা ভারতে বসবাস করলেও ২০১৪ সালের নির্বাচনে জেতার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি বিষয়টি নিয়ে বিষাদাগার করে আসছে। গত বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে বিতাড়িত করার জন্য সব রাজ্যকে নির্দেশ দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, তাদের অবস্থা এতটাই ভঙ্গুর যে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো সহজেই তাদের দলে নিয়ে নিতে পারে। তখন থেকে ওই বিতাড়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে জম্মু ও কাশ্মীরে থাকা প্রায় ৭ হাজার রোহিঙ্গাকে সরিয়ে দিতে সরকার ব্যর্থ হলে তাদের চিহ্নিত করে হত্যা করার হুমকি দিয়ে রেখেছে কট্টর হিন্দুপন্থী সংগঠনগুলো।

রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসবাদের জড়িত থাকার দাবি মিথ্যা। রোহিঙ্গা সদস্যই এমন কোনও কাজে জড়িত হয়নি যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় সমাজকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই সরকার এসব অভিযোগকে সামনে নিয়ে আসছে।

কলকাতাভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী রনজিত শুর বলেন, আগামী বছর সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থান জোরদার করেছে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বলি হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার।’ বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here