বিভ্রান্তিতে আছেন প্রবাসীরা

0
21

টিকিট কবে পাওয়া যাবে, কোন তারিখের রিটার্ন টিকিট কবে পাওয়া যাবে, কিংবা  আদৌ পাওয়া যাবে কিনা, অথবা ভিসার মেয়াদ ও আকামার মেয়াদ কীভাবে ও কবে বাড়ানো হবে— এসব বিষয়ে এখনও বিভ্রান্তির মধ্যে আছেন সৌদি থেকে ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীরা। তারা এখনও মনে করেন, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিসা ও আকামার মেয়াদ আছে। আর টিকিটের বিষয়ে সৌদি এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে তেমন কোনও আশ্বাস না পেলেও ভরসা করছেন— একমাত্র বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওপর। তাই বিমানের টিকিট পেতেও মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা। টিকিটের আশায় দিনের পর দিন ঘুরতে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের এই  উৎকণ্ঠার কথা।

ভিসার মেয়াদ বাড়াতে বিভ্রান্তি

২৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশে অবস্থানরত সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যাদের ভিসার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, তাদের ভিসা সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে প্রদান করতে সৌদি কর্তৃপক্ষ সম্মত হয়েছে। রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে সৌদি দূতাবাস খুলবে। এছাড়া আকামার মেয়াদ চলতি আরবি মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ আরও ২৪ দিন পর্যন্ত বৈধ থাকবে। সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য সৌদি এয়ারলাইন্স ও বাংলাদেশ বিমান টিকিট ইস্যু করবে। ভিসা সংগ্রহের সময় সৌদি দূতাবাসে বিশৃঙ্খলা না করার জন্য অনুরোধ করে মন্ত্রণালয়।

কিন্তু প্রবাসীদের আকামা ও ভিসার সংকট নিরসনে রবিবার থেকে ঢাকার সৌদি দূতাবাস চালু হলেও সেখান থেকে ফিরে যেতে হয়েছে প্রবাসীদের। কারণ, দূতাবাস তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। এই তথ্য প্রবাসীদের জানা না থাকায় বিভ্রান্তির মধ্যেই রবিবার ভোর থেকে সৌদি দূতাবাসের সামনে ভিড় করতে থাকেন তারা। সেখানে অপেক্ষমান সৌদি প্রবাসী শরীফ বলেন, ‘ভোর থেকে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আশায় লাইনে দাঁড়ালাম। এখন দূতাবাস থেকে বলছে— এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করতে। এই কথা আগে জানালে তো আমরা এখানে এসে জড়ো হতাম না।’

সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের টিকিট নিয়ে বিভ্রান্তি 

সৌদি আরবে ফিরে যেতে যারা সেদেশ থেকে রিটার্ন টিকিট করে এসেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই এখন সৌদি এয়ারলাইন্সের কাছ থেকে কোনও আশার বাণী পাচ্ছেন না। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ টিকিট ইস্যু করার জন্য টোকেন সরবরাহ করলেও এখন আর কোনও টোকেন দেওয়া হচ্ছেনা। টোকেন যারা পেয়েছেন তাদেরও বেশিরভাগই কোনও টিকিট পাননি। আর এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে কিছু জানাচ্ছে না তাদের। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু পর গত ১৪ মার্চ থেকে সৌদি সরকার সবদেশের যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণার পর তারা সৌদি এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ তখন তাদের জানিয়েছিল, ফ্লাইট চালু হলে তারা যেতে পারবেন এবং যাদের রিটার্ন টিকিট আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। কিন্তু এখন তা না-করে হঠাৎ করেই ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে টিকিট বিক্রি শুরু করে সৌদি এয়ারলাইন্স। এতে বিপাকে পড়ে যান তারা।

সোনারগাঁও হোটেলের সামনে টিকিটের জন্য অপেক্ষমান উজ্জ্বল আহমেদ  জানান, এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ কোনও কথাই বলতেছে না। গণহারে তারা টোকেন বিতরণ করছে। আশেপাশে যারা পারছে তারাই টোকেন নিয়ে গেছে। কিন্তু আবার তারা বলছে, যারা রিটার্ন টিকিট করে এসেছেন, তাদেরকে ফ্লাইট দেবে। কিন্তু টোকেন যারা পাইছে তারা তো ভেতর থেকে ঘুইরা আসতেছে।

পাশেই থাকা আরেক প্রবাসী কুমিল্লার আমির হোসেন  বলেন, ‘আমরা জানি না  কোনদিকে যাবো, আর কোনখানে গেলে টোকেন পাবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘৩০ তারিখ পর্যন্ত আমাদের ভিসার মেয়াদ আছে। কিন্তু সেটা তো সরকার বললো বাড়বে। এখনও সেটা শো করে নাই সিস্টেমে।’

তিনি  বলেন, ‘টিকিটের জন্য ঢাকায় আসি আর যাই, আবার কোনও কোনও সময় হোটেলে থাকতে হয়। এবারসহ  বাড়ি থেকে তিনবার আসছি। আসতেছি আর যাইতেছি। আবার যদি কোনও নিউজ পাই তাইলে আসমু কালকে। মিডিয়ায় আমরা টাইম-টেবিল দেখি, কিন্তু এখানে আসলে কিছুই দেখি না। ’ 

অপর এক প্রবাসী সায়মন বলেন, ‘যারা এখান থেকে টোকেন নিয়েছেন তাদের জন্য ব্যবস্থাপনা একদম বাজে। তারা তো পারতো টোকেন দিয়ে বিদায় করে দিতে। এখন বলছে ৪ তারিখ (অক্টোবর) টোকেন দেবে। আমাদেরকে সরাসরি কিছু বলে না। আমরা তো এর-ওর কাছ থেকে শুইন্যা প্রতিদিন আসি। আইসা আবার খালি হাতে ফিরে যেতে হয়। টোকেন একবার বলছে ৩০ তারিখ দেবে, আবার বলতেছে ১ তারিখে দেবে, আবার বলতেছে ৪ তারিখে টোকেন দেবে। আজকেও দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আজকেও দেয় নাই। ৩০ তারিখে যাদের মেয়াদ শেষ, তারা ৪ তারিখের টোকেন দিয়ে কী করবে? কারণ, বাড়ানো ২৪ দিন ভিসার মেয়াদ তো এখনও শো করতেছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কালকে আমরা নিউজ পাইছি আজকে টোকেন দিবো, এখানে আসার পর শুনি ৪ তারিখ দেবে। একেক জনে একেক রকম বলে, আমরা ওইটার ওপর আছি। সঠিক কোনও তথ্য আমরা পাই না।’

প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি এর আগেও আসছি। আমাকে বলেছে রবিবার আসতে। আজকে আসছি। এখন আমাকে বলে যে, ৪ তারিখে আসেন।’

এসময় আরও প্রবাসীরা জড়ো হয়ে অভিযোগ করেন, কবে টিকিট পাওয়া যাবে, কবে ফ্লাইট পাবেন, কিংবা কবে ভিসার মেয়াদ বাড়বে— এই বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। এমনকি টোকেন কবে পাওয়া যাবে তাও জানেন না। তাদেরকে কোনও তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। তারা বলছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মতো আগে আসা যাত্রীদের আগে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে এই সমস্যা থাকবে না। যে সিস্টেমে দিচ্ছে তাতে ২৪ দিনে ২ হাজার লোক যেতে পারবে কিনা এ নিয়ে সন্দিহান তারা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের তথ্য নিয়েও বিভ্রান্তি 

সৌদি আরব থেকে ছুটিতে আসা প্রবাসীদের টিকিট বিতরণে তথ্যগত বিভ্রাটের কারণে জটলা বেশি বলে জানিয়েছেন বিমান অফিসের সামনে অপেক্ষমান প্রবাসীরা। প্রতিদিন ভোর থেকেই প্রবাসীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন মতিঝিলের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাই্ন্সের অফিসে। সরেজমিনে প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল ১০টার কিছু পরে শুরু হয় বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম। গেট খোলার পর হুড়মুড় করে বিমান অফিসে প্রবেশ করেন অন্তত হাজারখানেক প্রবাসী। এরপর গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাদের দাবি, এই ভিড়ের মধ্যে অন্য এয়ারলাইন্সে আসা প্রবাসীরাও টিকিটের জন্য প্রবেশ করছেন। এছাড়া, কোন তারিখের রিটার্ন টিকিট  কবে ইস্যু করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রবাসীরা না জানায় বেশি জটলা হচ্ছে ।

চাঁদপুর থেকে আসা প্রবাসী কর্মী হেলাল জানান, তিনি ১৪ বছর ধরে কাজ করেন সৌদি আরবে। গত জানুয়ারিতে ছুটিতে দেশে আসেন। তার রিটার্ন ফ্লাইট ছিল ২৬ মার্চ। তিনি বলেন, ‘বিমান অফিসের মাইকের মাধ্যমে বাইরে বলা হচ্ছে যে, ১৪ তারিখ থেকে ২০ তারিখের রিটার্ন টিকিট যাদের আছে, তাদের ভেতরে যেতে। এখানে অনেকেই আছেন যারা অনেক আগে দেশে এসেছেন। আবার অনেকেই আছেন পরে এসেছেন। কিন্তু ভেতরে সবাই যাচ্ছেন।  কেউ কেউ নাকি ২১ তারিখের টিকিট নিয়ে যাচ্ছেন। বিমান থেকে যদি আগে মিডিয়ার মাধ্যমে বলা হতো, কবে কোন তারিখের রিটার্ন টিকিট দেওয়া হবে, তাহলে জটলা হতো না। কিংবা এখানে অফিসের সামনে একটু বড় করে যদি লিখে রাখতো, তাহলেও অনেকেই তা দেখে সময় মতো আসতেন।’

আরেক প্রবাসী আক্তার হোসেন জানান, ‘তিনি পাঁচ দিন ধরে ঘুরছেন টিকিটের জন্য। কিন্তু কোন দিনের টিকিট কবে দেওয়া হবে তিনি জানেন না। সেটা জানতেই চাঁদপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন। তিনি মনে করেন, তার মতো অনেক প্রবাসী আছেন এখানে, যারা সঠিক তথ্য জানেন না।’

এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, ২২ মার্চ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে রিটার্ন টিকিট করা জেদ্দাগামী যাত্রীদের জন্য ফ্লাইট রেখেছে ৫টি। ফ্লাইটগুলো যথাক্রমে ৩০ সেপ্টেম্বর, ১ অক্টোবর, ৪ অক্টোবর, ৫ অক্টোবর এবং ৬ অক্টোবর পরিচালনা করা হবে। এছাড়া রিয়াদগামী যাত্রীদের জন্য ৪টি এবং দাম্মামগামী যাত্রীদের জন্য ৩টি ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিমানের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, নতুন ফ্লাইট অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে যাত্রীদেরকে বুকিংয়ের জন্য জানানো হবে। হচ্ছে। এদিকে সৌদি আরবে অক্টোবর মাস থেকে শিডিউল ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এসব ফ্লাইটে প্রবাসীদের সৌদি আরবে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানায় বিমান।

জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন করোনা মহামারির কারণে আটকে পড়া সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেদেশে ফেরত যাওয়ার সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সৌদি আরবকে অনুরোধ করেছেন। মন্ত্রী রবিবার সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে আলাপকালে এ অনুরোধ করেন। আর প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। সোমবারের (২৮ সেপ্টেম্বর) মধ্যে সংকটের সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদী। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here