ভালোবাসার ভিয়েতনাম : আহা, ভালোবাসা! বয়সের সাথে সাথে যেন বেড়েই চলেছে!

0
275

হো চি মিন সিটি। সন্ধ্যায় হোটেলের লবিতে বসে আড্ডা মারা আমার নিত্যকার কাজ। সারাদিন টো টো করার পর সন্ধ্যায় আড্ডা। বেশিরভাগ সময়ই আমি, হ্যারি (ভদ্রলোক বৃটিশ, বয়স ৬০ হবে, ভিয়েতনামের মেয়ে বিয়ে করে থেকে গেছেন ভিয়েতনামেরই অন্য শহরে, এই শহরে বেড়াতে এসেছেন, একই হোটেলে উঠেছেন সপরিবারে) আর লি (ছেলেটা হো চি মিন সিটির স্থানীয়, আসল নাম গুইয়েন, উচ্চারণ করা খুব কঠিন তাই সুবিধের জন্য নিজের নাম লি করে নিয়েছে, বয়স ২৮, হোটেল মালিকের বন্ধু, মাঝে মাঝে এসে হোটেলের হিসাবপত্তর দেখে দেয়) আড্ডা দিই। হ্যারির সব দেশ, সব ব্যাপারেই বিশাল জ্ঞান। যায়নি এমন কোনো দেশ নেই, পরিচিত সব ভাষা এক লাইন হলেও জানে। লি চাকরিসূত্রে কয়েকটা দেশে গিয়ে এসেছে। বেশিরভাগ সময়ে আমি আর হ্যারি কথা চালাই, লি শোনে বা জানতে চায়, মাঝে মাঝে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে। হ্যারি দুদশক ধরে ভিয়েতনামে পড়ে আছে। তার নাকি নিজের দেশে যেতে ভালো লাগে না। নিজে বিশাল এক হোটেলের মালিক, তিনি আর তার স্ত্রী মিলে ‘হোয় আন’ নামক শহরে। নিজেরাই হোটেল চালান। তিন সন্তান তাদের, ১৮, ১৪ আর ১১ বছর বয়সী। খুব মিষ্টি দেখতে বাচ্চাগুলো। তাদের মুখে লেগে আছে যেন অপার্থিব স্নিগ্ধতা আর সরলতা! যখন লবিতে দেখা হয় তখন মনে হয় অবারিত ঝর্ণার মতো কলকল করেই যাচ্ছে। হ্যারির স্ত্রী খুব শান্তশিষ্ট, মায়াভরা মুখ তবে বাচ্চাদের শাসনের দায়িত্ব বোধ হয় তিনিই পালন করেন, খুব কম কথা বলেন। তাকে দেখলে মনে হয় পার্থিব জৌলুশের, অহংকারের, লোভের একাংশও তাকে বোধহয় ছুঁতে পারে না। কি সাধারণ মানুষ তিনি। ভিয়েতনামের সুন্দরিদের ধারেকাছের নন তবে তার সৌন্দর্য্য তিনি নিজেই, তার সারল্য, সাধারণ বেশভূষা। আর হ্যারি, সে তো বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী, আয়েশী মানুষ! কি শান্তি শান্তি ভাব নিয়ে কথা বলে। আমরা মাঝে মাঝে তর্কও করি কিন্তু হ্যারি একবারেই উত্তেজিত হয় না, খুব আগ্রহ ভরে শোনে তারপর ধীরে ধীরে জবাব দেয়। কথা বলার সুরটা বন্ধুত্বপূর্ণ। যেন সে আমাদের সবার শান্তি বাহক, শান্তির ঘাটতি হলে ছড়িয়ে দেবে। এ কথা সে কথায় একদিন আমি হ্যারিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার স্ত্রীর সাথে কোথায়, কীভাবে দেখা হলো’? হ্যারি বললো, ‘২০ বছর আগে একবার ভিয়েতনাম এসেছিলাম। একটা টেম্পলে ঘোরাঘুরি করতে করতে একটি মেয়েকে দেখে চোখ সরাতে পারছিলাম না। কয়েক মিনিট পর তাকে আর খুঁজে পেলাম না। তার খুঁজে রোজ সেই টেম্পলে গিয়ে বসে থাকতাম। একদিন সে এলো। কিন্তু কেউ কারো ভাষা জানি না। চোখের ভাষা পড়ে পার করলাম আরো কিছু সময়। তারপর একদিন বিয়ে করে ফেললাম আর থেকে গেলাম এ দেশে’। আমি আর লি হা করে হ্যারির প্রেম কাহিনী শুনছিলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, ২০ বছর তো অনেক সময়, তোমাদের একঘেয়ে লাগে না’? হ্যারি মুগ্ধ, সম্মোহিতের সুরে বললো, ‘২০ বছর আসলে খুব অল্প সময়, মনে হয় এই তো সেদিন। খুব অল্প সময়’! ঠিক সে মুহূর্তে হ্যারির স্ত্রী লবিতে এলেন। হ্যারির মুগ্ধতা যেন আর কাটে না। ভদ্রমহিলা কিছুই জানেন না আমরা কি বিষয়ে কথা বলছিলাম, মুচকি হেসে আমাদের ‘হ্যালো’ বলে বেরিয়ে গেলেন। সম্মোহিত হ্যারি শুধু তাকিয়ে তার যাওয়া দেখছিলো। আহা, ভালোবাসা! বয়সের সাথে সাথে যেন বেড়েই চলেছে! ফেসবুক থেকে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here