ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত এক কোটি প্রবাসী

0
276

সংবিধানে সব নাগরিকের ভোটাধিকারের কথা বলা হলেও স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছরে কোটির অধিক প্রবাসী বাংলাদেশীর মৌলিক এই অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ৭১ পরবর্তী নির্বাচিত, অনির্বাচিত, সামরিক, আধাসামরিক, বেসামরিক সব সরকারই কৌশলে প্রবাসী জনগনকে বঞ্চিত করে রেখেছে তাদের ভোটের অধিকার থেকে। স্বাধীনতা যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও জনমত গঠনে প্রবাসীদের অবদান এবং পরবর্তীতে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি যাদের হাত দিয়ে তৈরি হয়েছে, সেই প্রবাসীরা সবসময়ই থেকেছে অনাদরে অবহেলায়।রেমিটেন্স বৃদ্ধি ও প্রবাসী বিনিয়োগ বাড়াতে সব সরকারগুলো প্রয়োজনের খাতিরে প্রবাসীদের ভোটের অধিকার দেওয়ার গালভরা প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও তা অধরা রয়ে গেছে। অথচ পৃথিবীর প্রায় ১২০টি দেশ প্রবাসে থাকা তাদের জনগণের ভোট দেওয়ার ব্যাবস্থা করেছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, মালদ্বীপ ও ভোটান সহ এশিয়ার ২০টি দেশ তাদের প্রবাসী নাগরিকদের ভোট প্রদানের সুযোগ করে দিয়েছে।

প্রবাসীদের দাবীর মুখে স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর পর তৎকালীন এটিএম শামসুল হুদা কমিশন প্রথমবারের মত প্রবাসীদের ভোটার ও ভোটাধিকার নিয়ে উদ্যোগী হয়। তখনকার দুই নির্বাচন কমিশনার ছুহুল হোসাইন ও এম সাখাওয়াত হোসাইন এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য যুক্তরাজ্য সফরও করেন। প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত ইসি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছে জানিয়ে তখন ছুহুল হোসাইন বলেছিলেন, ‘এবার শুধু যুক্তরাজ্য প্রবাসীদেরই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জটিলতার কারণে অন্যত্র করা যাচ্ছে না। তবে প্রক্রিয়া শুরু হলে পর্যায়ক্রমে সব প্রবাসীদের ভোটার করা হবে।’

এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে ভোটার তালিকা আইনে সংশোধন আনে। ২০১০ সালে ভোটার তালিকা আইন সংশোধন করে বলা হয়, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশে বসবাস করলে তিনি দেশে সর্বশেষ যে নির্বাচনী এলাকা বা ভোটার এলাকায় বসবাস করেছেন, অথবা তার নিজের বা পৈত্রিক বসতবাড়ি যেখানে ছিল বা রয়েছে; তিনি সেই এলাকার অধিবাসী বলে গণ্য হবেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে রকীব উদ্দিন কমিশনও প্রবাসীদের ভোটার করার উদ্যোগী হয়। কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখেনি। আইন সংশোধনের পর আট বছর পার হতে চলেছে; শামসুল হুদার পর কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন কমিশন মেয়াদ পূর্ণ করে গত বছর দায়িত্ব নিয়েছে কে এম নূরুল হুদার কমিশন। কিন্তু প্রবাসীদের ভোটার করার পদ্ধতি ও তাদের ভোটদান পদ্ধতি নিয়ে সেই বিধিমালা করার উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি। আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও যা প্রায় অসম্ভব।

নির্বাচন কমিশনের হিসেব মতে বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১০ কোটি ভোটার রয়েছেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের হিসেব মতে প্রায় দেড় কোটি জনগোষ্ঠী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছেন। দৈত নাগরিকের সংখ্যা ৫০ লক্ষ ধরলেও বাকি এককোটি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক ও ভোটার হওয়ার উপযুক্ত এবং মোট ভোটের আনুপাতিক হারে ১০ শতাংশ । এই এক কোটি ভোটার দেশের জাতীয় নির্বাচন সহ যে কোন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারনে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারতেন।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিউ তাজ রহমান মনে করেন, এক কোটি প্রবাসীর ভোট জাতীয় সংসদের ৩৫ জন সংসদ সদস্যের প্রাপ্ত ভোটের সমান। তাই প্রবাসীদের শুধু ভোটার নয় সংসদে তাদের জন্য কোটার ভিত্তিতে কিছু আসন রাখাও এখন সময়ের দাবী। তিনি আরোও বলেন, প্রবাসীদের ভোটের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকা সত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। এ ব্যাপারে আমাদের সময় ডটকমের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি প্রবাসীদের ভোটের অধিকার দেওয়ার মৌলিক দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করলেও এতদিনে এই অধিকার কেন প্রতিষ্ঠিত হয়নি সে ব্যাপারে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে দলীয় ফোরামে উপরোল্লিখিত বিষয়ে আলাপ করবেন বলে এ প্রতিবেদককে জানান।

বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পাদক মাহিদুর রহমান বলেন, ‘ স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে রেমিটেন্স প্রবাহে প্রবাসীরা দেশের প্রতি যে দায়িত্বশীল আচরন করে চলেছেন , এতে করে তাদের উপর আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।কিন্তু তা না করে আমরা প্রবাসীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছি। প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়ে আমরা দীর্ঘদিন থেকে দাবী জানিয়ে আসছি।সেটা বিএনপি সরকারের সময়ে বলেন বা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আজও প্রবাসী বাংলাদেশীদের এই সাংবিধানিক অধিকারটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমলাতান্ত্রিক যত জটিলতা থাকুক না কেন, রাজনৈতিক সরকার চাইলে প্রবাসীদের এই দাবীটি বাস্তবায়ন করতে পারে।’

তবে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলাল উদ্দিন আমাদের সময় ডটকমকে জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে আমরা যে দেশে আমাদের প্রবাসীরা আছেন ঐ সকল দেশে গিয়ে একটা জরিপ করবো যে কি পরিমান প্রবাসী এখনো ভোটার হতে পারেননি। প্রথমে আমরা তাদেরকে ভোটার করবো, এর পরে আসবে ভোটাধিকারের প্রশ্ন।কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে কতদিন সময় লাগবে এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি লাইন কেটে দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here