মহানবী (সা.)-এর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা

0
32

ড. ইকবাল কবীর মোহন: ইংরেজি ডিপ্লোমাসি’র প্রতিশব্দ হলো ‘কূটনীতি’। এটি মূলত গ্রিক শব্দ ডিপ্লোমা থেকে এসেছে। ডিপ্লোমা শব্দের অর্থ বহিঃসম্পর্ক বিষয়ক দাপ্তরিক কার্যক্রম। জাহেলিয়াতের যুগে ইসলামের আলো বিকশিত হওয়ার সময় থেকেই আমরা এই কূটনীতির প্রয়োগ দেখতে পাই।

পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলামে মানুষের জীবন চলার যাবতীয় বিষয়-আশয় রয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ অন্য সব সমস্যার সমাধান দিয়েছে ইসলাম। ফলে কূটনৈতিক ব্যবস্থারও নিয়ম-আদর্শ ইসলামে রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে কূটনীতি হচ্ছে- ওই সব নীতি বা কাজ, যেখানে ইসলামি নিয়ম-নীতি মেনে চলা হয়। ইসলামি নৈতিকতা সমর্থন করে না এমন বিষয় (যেমন প্রবঞ্চনা, মিথ্যা, ধূর্তামি ইত্যাদি) পরিত্যাগ করে ইসলামি রাষ্ট্র ও এর অধিবাসীদের কল্যাণে অন্যান্য রাষ্ট্র বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিবিড় ও যৌক্তিক সম্পর্ক যখন গড়ে তোলা হয়। অথবা কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন ইসলামি নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে ও মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়, তখনো সেটাকে কূটনীতি বলা হয়।

শান্তির ধর্ম ইসলামে বিভেদ, হানাহানি, শত্রুতাসহ এ ধরনের সব খারাপ কাজ নিষিদ্ধ। তাই ন্যায়, ইনসাফ ও সমতার ভিত্তি হচ্ছে ইসলামি কূটনীতির মূল বিষয়। মুসলমানরা ইসলাম প্রদর্শিত কূটনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইনসাফভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং পরস্পরের মধ্যে বিবাদগুলোর শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়পূর্ণ সমাধান করবে। ইসলামের আবির্ভাব ও ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার্থে শুরু হয় এর বাস্তব প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নবী করিম (সা.) স্বয়ং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন দেশ ও রাজন্যবর্গের সঙ্গে দূত ও প্রতিনিধি পাঠানোর মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালান।

পরবর্তী সময়ে তার যোগ্য উত্তরসূরি খলিফারা তার প্রতিষ্ঠিত পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছিলেন। ফলে ইসলামি কূটনীতির সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। এ জন্য দলে দলে লোক এসে ইসলামের ছায়াতলে একত্রিত হয়। এর ফলে একের পর এক রাষ্ট্র ইসলামি সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। কিন্তু কালচক্রে মানুষ হয়ে পড়ে বিভ্রান্ত। দেশে দেশে শুরু হয় দ্বন্দ্ব, সংঘাত আর হানাহানি। এ ক্ষেত্রে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও ব্যতিক্রম নয়। এর অন্যতম কারণ ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত ইসলামের অনুশাসন থেকে পিছিয়ে পড়া। এই প্রেক্ষাপটে আজ নতুন করে ইসলামি কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক এবং বিরাজমান সমস্যা সমাধানের গ্যারান্টি হচ্ছে ইসলামি কূটনীতির সফল বাস্তবায়ন।

ইসলামের আগমনের আগে আরবসহ গোটা বিশ্ব নৈতিক অবক্ষয়ের তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। মহানবী (সা.)-এর বিদেশি রাজদরবারে সাময়িকভাবে দূত পাঠানোর দৃষ্টান্ত স্মরণাতীতকাল থেকেই প্রচলিত আছে। সুতরাং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নবী করিম (সা.) বিভিন্ন সময় দেশে দেশে দূত বা কূটনৈতিক প্রতিনিধি পাঠাতেন। আল্লাহর নবী (সা.)-এর অনুমতি পেয়ে মুসলমানরা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। মুসলমানদের দলকে ফিরিয়ে আনার জন্য কুরাইশরা উদ্যোগ নেয়। তারা আবিসিনিয়ায় গিয়ে সেখানকার বাদশাহ নাজ্জাশিকে প্ররোচিত করেছিল। কুরাইশদের এ দুরভিসন্ধি বানচাল করার উদ্দেশে নবী করিম (সা.) পদক্ষেপ নিলেন। দ্বিতীয় হিজরিতে তিনি আমর বিন উমাইয়া আদ-দামরিকে আবিসিনিয়ায় দূত হিসেবে (বর্তমান ইথিওপিয়া) পাঠান।

মদিনায় ইহুদিরা ছিল নানা দিক থেকে শক্তিশালী। ফলে মদিনাবাসী ও ইহুদিদের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদন করা ছিল খুবই জরুরি। প্রথমবারের মতো তিনি একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিকে ‘মদিনার সনদ’ বলা হয়। এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান। মদিনার সনদে স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয় যে সব রকমের বিবাদ মীমাংসার জন্য মহানবী (সা.)-এর শরণাপন্ন হতে হবে।

এ সম্পর্কে স্কটিশ ইতিহাসবিদ (এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামি স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক) মন্টোগোমারি ওয়াট (১৯০৯-২০০৬) যথার্থই বলেছেন, ‘বিবাদ মীমাংসার জন্য মহানবী (সা.)-এর শরণাপন্ন হওয়ার শর্ত থাকার কারণে তার শক্তি বৃদ্ধি পায়নি। কিন্তু সব বিবাদের মীমাংসা তিনি এমন নিখুঁত ও কূটনৈতিকভাবে সমাধান করতেন, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং এ কারণে তার ক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়।’

এ কথা সত্যি যে মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে মক্কার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তবে মক্কায় তখনো অনেক মুসলমান ছিল। মক্কায় ইসলাম প্রচারের কাজ ধীরে হলেও গোপনে চলছিল। আর মক্কায় দ্বীনের প্রচার সম্প্রসারণ করাও ছিল নবীজির অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য দ্বীন প্রচারের স্বার্থে কুরাইশদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা ছিল খুবই জরুরি। কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনায় মহানবী (সা.) সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক সফলতা অর্জন করেন হুদায়বিয়ার চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে।

একজন আদর্শ কূটনীতিকের পরিচয় আমরা পাই আল্লাহর নবীর চরিত্রে। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি, মহানবী (সা.) তার কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অবস্থাভেদে কখনো দৃঢ়তা অবলম্বন করেছেন, কখনো বা নম্রতা প্রদর্শন করেছেন। অর্থাৎ মহানবী (সা.) প্রয়োজনবোধে সময়োচিত ব্যবহার করতে সক্ষম ছিলেন। দার্শনিক ও বাস্তববাদী ব্যক্তির গুণের এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল তার মধ্যে। নিজের অনুসারীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পুঙ্খানুপঙ্খরূপে বিচার-বিশ্লেষণ করে দ্রুত তথা আড়ম্বরহীন পদ্ধতিতে আলোচনা চালিয়ে তিনি এমন এক চুক্তি সম্পাদন করেন, যা দূরদৃষ্টি, ধৈর্য, বিশ্বাস, কৌশল ও ন্যায়বিচারের আদর্শ হিসেবে বিবেচ্য।

হুদায়বিয়ার সন্ধিতে মহানবী (সা.) কুরাইশদের অনেক ছাড় দেন। ফলে এই চুক্তি নিয়ে অনেক মুসলমান মন খারাপ করেন। তারপরও এই চুক্তি ছিল মুসলমানদের জন্য বিরাট সাফল্য। আল্লাহতায়ালা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ঐতিহাসিক বিজয় বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয়ে বিজয়ী করেছি।’ (সুরা আল-ফাতহ, আয়াত : ০১)

এভাবে কূটনৈতিক পারদর্শিতা ও দক্ষতা দিয়ে আল্লাহর নবী ও তার খলিফারা অনেক ক্ষেত্রে বিজয় ও সাফল্য লাভ করেছেন। ইসলামের এই কূটনীতিতে কূটকৌশল বা চালাকি ছিল না। বরং এতে ছিল নৈতিকতা ও সততার পরম বাস্তবতা। স্বচ্ছতা ও নীতির কোনো ব্যত্যয় ইসলামি কূটনীতিতে ঘটেনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here