‘মহাবীর ওসমানীর জন্ম‌দিনে শ্রদ্ধার্ঘ’

0
157

বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপ‌তি ও দে‌শের প্রথম সেনাপ্রধান মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর জন্ম‌দিন অাজ (১ সেপ্টেম্বর)। বঙ্গবন্ধুর অাহব্বা‌নে তি‌নি মু‌ক্তিযু‌দ্ধের প্রধান সেনাপ‌তির দা‌য়িত্ব নেন। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন৷ ঐ ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা উল্লেখ করে এম. এ. জি. ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন৷ য‌দিও, বঙ্গবন্ধু, ২৫শে মা‌র্চের কা‌লোরা‌তের অা‌গে গ্রেফতার হবার অা‌গেই এম এ ওসমানীকে প্রধ‌ান সেনাপ‌তি হি‌সেবে নি‌য়োগ দি‌য়ে যান।

১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন সি‌লে‌টের এ কী‌র্তিমান সন্তান। ব্যা‌ক্তিগত জীব‌নে অবিবা‌হিত ক‌ঠোর নিয়মানুবর্তী, অাদ‌র্শে অ‌বিচল মানুষ‌টি ছিলেন আজীবন গণতন্ত্রী, ধার্মিক ও খাঁটি দেশপ্রেমিক। তাঁর নামটি বাদ দিলে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস রচনা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন, তেমনি স্বাধীন দেশেও জাতির দুঃসময়ে কান্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এই বঙ্গবীর। বহু ক্রা‌ন্তিল‌গ্নে তিনি জাতিকে নির্ঘাত সংঘাত থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন।

১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে তিনি দু’বার জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সিলেটে রয়েছে বঙ্গবীর মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর স্মৃতিচিহ্নবিজড়িত ওসমানী জাদুঘর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির সহজ-সরল জীবনযাত্রার এক জীবন্ত সাক্ষী ওসমানী জাদুঘর। নগরীর ধোপাদীঘির পাড় এবং নাইওরপুলের মাঝামাঝি জায়গায় বঙ্গবীর-১ নম্বর বাসাটির গেটের সামনে দাঁড়ালেই হাতছানি দেবে ওসমানী জাদুঘর।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ধোপাদীঘির পাড়ের বঙ্গবীর ওসমানীর এ পৈতৃক বাড়িটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ শেষে তিনি নিজ উদ্যোগে বাংলো টাইপ ঘর নির্মাণ করেন সেখানে। ১৯৭৬ সালের ১৮ মে এ বাড়ির ২ বিঘা জায়গা দিয়ে তিনি তার বাবা-মার নামে গঠন করেন জুবেদা খাতুন খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্ট। এ ট্রাস্টের মাধ্যমে মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়। একই সঙ্গে ঢাকার ধানমন্ডির রোড ১০-এ, বাড়ি নং ৪২-এর সুন্দরবন নামক ওসমানীর নিজস্ব বাড়ির সম্পত্তি দিয়ে আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যে গঠন করা হয় ওসমানী ট্রাস্ট।

তিনি মাত্র দু’টি ব্যাটালিয়ান থেকে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সংখ্যা ছয়টিতে বৃদ্ধি সহ সেনাবাহিনীতে বাঙ্গালীর সংখ্যা ২ থেকে ১০ এর অধিক করা এবং বাঙালীদের জন্যে নির্দিষ্ট সংখ্যা অনুপাতে কমিশন ও অফিসার পদসহ সর্বস্তরে বাঙ্গালী সিনিয়রদের জন্য পদ সংরক্ষণ করেন।

তিনি কাজী নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় বাংলা কবিতা ‘চল চল চল’ কে পাকিস্তান ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মার্চ সঙ্গীত হিসাবে অনুমোদন লাভে সফল হন। এ ছাড়া পাকিস্তান সামরিক বাদ্যযন্ত্রে সরকারী ভাবে ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ ও ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ’ বাংলা গান প্রচলন হয় তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। বেঙ্গল রেজিমেন্ট তার নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছিল। এজন্যে তাকে Father of the regiment বলা হয়। তিনি বাঙ্গালী সেনাবাহিনীর প্রতি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর আচরণ ও ব্যবহারে ক্ষুব্ধ ছিলেন। সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করার পর ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের মন্ত্রীসহ উচ্চ পদের অামন্ত্রন পেয়েও গ্রহণ করেননি তিনি।
১৯৭৩ এর নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন।

১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে তিনি সংসদ সদস্যপদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যপদও ত্যাগ করেন। সে বছর ২৯ আগস্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা পদে নিযুক্ত হন। ‌মোশতা‌কের মন্ত্রীসভায় উপ‌দেষ্টা হওয়া প্রসং‌গে তি‌নি সাক্ষাতকা‌রে ব‌লে‌ছি‌লেন, অার রক্তপাত এড়া‌তে, সেনাবা‌হিনীর চেইন অব কমান্ড ফি‌রি‌য়ে অান‌তে দা‌য়িত্ব নি‌য়ে‌ছি‌লেন তি‌নি। তবে, ৩ নভেম্বর জেলহত্যার ঘটনার পরই প্র‌তিবাদ জা‌নি‌য়ে পদত্যাগ করেন তি‌নি । ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী `জাতীয় জনতা পার্টি` নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার্থে লন্ডন থাকাকালীন অবস্থায় ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি র‌য়েল লন্ডন হাসপাতা‌লে ইন্তেকাল করেন এই মহাবীর। ছবি তোলা ও অবসর সময়ে বই পড়া ছিল তার শখ।

বাংলা‌দে‌শের ই‌তিহা‌সের অ‌বি‌চ্ছেদ্য অংশ অসম সাহসী এ ন‌ন্দিত নায়‌কের ছিল না সংসার। সঙ্গত কার‌নে নেই পা‌রিবা‌রিক বা রাজ‌নৈ‌তিক উত্তরাধীকার। তাই মহাবীর ওসমানীর নাম‌টি যেভা‌বে উচ্চ‌কিত ক‌ন্ঠে উচ্চা‌রিত হবার কথা ছিল, তা হয়‌নি, হ‌চ্ছে না। নতুন প্রজন্মের অ‌নে‌কে জা‌নেন না এ কী‌র্তিমা‌নের বীরত্বগাঁথা; ই‌তিহাসের ক্রে‌ডিট ছিনতাই‌য়ের দে‌শে।

মহাবী‌রের জন্ম‌দি‌নে শ্রদ্ধার্ঘ।

পরিচিতি: সাংবাদিক, বাংলা ট্রিবিউন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here