মানবিক মূল্যবোধের মানুষ আহমদ ছফার জন্মদিন আজ

0
55

আমাদের ছফা ভাই ছিলেন ভবঘুরে, অবিবাহিত এবং খ্যাতি, ধন-সম্পদ বা অন্যান্য বৈষয়িক মোহবর্জিত মানুষ। ছফা ভাই অনেকের জীবনের নানা সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছেন, বিপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিংবদন্তিতুল্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদকে ভীষণ স্নেহ করতেন ছফা ভাই, লেখক হিসেবে হ‌ুমায়ূন আহমেদের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ছফা ভাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে‘ প্রকাশ হয় ছফা ভাইয়ের বিশেষ সহযোগিতায়। হুমায়ুন আহমেদের পারিবারকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন ছফা ভাই। মুক্তিযুদ্ধে হ‌ুমায়ূন আহমেদের বাবা শহীদ হন। এ কারণে বঙ্গবন্ধুর সরকার এই অসহায় পরিবারকে থাকার জন্য ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি বরাদ্দ দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর একদিন মধ্যেরাতে রক্ষীবাহিনীর লোকজন তাদের বাড়ি থেকে বেড় করে দেয়। এদিন সারারাত তারা সবাই রাস্তায় কাটান। একথা শুনে ওইদিন সকালে ছফা ভাই এক টিন কেরোসিনের তেল নিয়ে ঘটনা স্থলে উপস্থিত হন। হুমায়ুম আহমেদকে বলেন, “ হুমায়ূন রিক্সায় উঠুন। গণভবনে যাবো। নিজের গায়ে করেসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেবো। একটি শহীদ পরিবারের প্রতি যে অপমান করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে এই কাজটা করবো- আত্মাহুতি। হুমায়ূন আহমেদ বলেন, “ কী বলছেন ছফা ভাই? ছফা ভাই বলেন, কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। উঠে আসুন। সঙ্গে ভারী চাদর নিয়ে এসেছি। আপনি আমার গায়ে ভালো করে চাদরটি জড়িয়ে দেবেন। যেন আগুনটা ঠিক মতো লাগে।”ছফা ভাই গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মাহুতি দিতে যাচ্ছেন এই খবর দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কবি সিকানদার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছফা ভাইয়ের কাছে ছুটে আসেন এবং তিনি বাড়ি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। ছফা ভাইয়ের কারণেই হুমায়ূন আহমেদ ভাইবোন, মাকে নিয়ে আগের বাড়িতে ওঠার সুযোগ পান। হুমায়ূন আহমেদের পরিবারকে ছফা ভাই নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, তখন তাঁদের পরিবারে অর্থকষ্ট ছিল। সে সময় ছফা ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকা অফিসে কার্টুনিস্টের কাজ জুটিয়ে দেন।প্রথম দিকে তরুণ চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের তেমন পরিচিত ছিল না। শিল্পীমহলের অনেকে তাঁকে এড়িয়ে চলতেন। এ সময় ছফা ভাই তাঁর পাশে দাঁড়ান। দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সহায়তায় কাঁটাবন বস্তিতে ‘শিল্পী সুলতান কর্ম ও শিক্ষাকেন্দ্র’ চালু করেন। ছফা ভাই এস এম সুলতানের ব্যক্তিত্ব, চিন্তাশক্তি ও চিত্রকর্মের উচ্চ প্রশংসা করে প্রবন্ধ লেখেন। তারপর এস এম সুলতান সবার দৃষ্টিতে চলে আসেন, দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। এর পরের ইতিহাসটা আমাদের সবারই জানা আছে।১৯৭৫ সালে তরুণ কবি নির্মলেন্দু গুণকে অজ্ঞাত কারণে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে রমনা থানা হাজতে কাস্টোডিয়ান হিসেবে জমা দেয়। এই খবর পাওয়া মাত্র গুণদাকে ছাড়াতে থানায় ছুটে যান ছফা ভাই। গুণদাকে ছেড়ে দিতে তিনি থানার ওসির সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা পর্যন্ত করেন। সাত দিনের মধ্যেই দাদা ছাড়া পান। আরেক প্রতিবাদী তরুণ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ যখন পাকস্থলীর আলসারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে, তখন তাঁকে নিয়মিত দেখতে যেতেন ছফা ভাই। ফিরে আসার সময় টাকা ভর্তি একটি খাম রেখে আসতেন রুদ্রের বালিশের নিচে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময় তরুণ কবি আবুল হাসানের পুনঃভর্তির জন্য কোনো টাকা ছিল না। ছফা ভাই নিজের বই প্রকাশের ‘রয়্যালিটির’ টাকা আবুল হাসানের হাতে তুলে দেন পুনঃভর্তির জন্য। স্বাধীনতার পর কবি ফররুখ আহমেদের সরকারি টাকা বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি অসুস্থ। ছফা ভাই বিষয়টি জানতে পেরে খুব ক্ষেপে যান। তিনি এ নিয়ে প্রতিবাদ করলেন। অবশেষে সরকারের তরফ থেকে ফররুখ আহমেদকে টাকা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কবি অসীম সাহা এমএ প্রথম পর্ব পরীক্ষার ফরম ফিলাপের আগে অর্থ সংকটে ছিলেন। বিষয়টি অসীম সাহা ছফা ভাইকে জানান। কিন্তু ছফা ভাই নিজেও তখন আর্থিক সংকটে। তাই তিনি অসীম দাকে সহায়তা করতে ভিন্ন পদ্ধতি নেন। অসীম দাকে ‘ডিরোজিও’র ওপর একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে বলেন। এ জন্য কিছু বইও ‍তাকে দেন। অসীম দা পাণ্ডুলিপিটি দ্রুত তৈরি করে দিলে, ছফা ভাই এটা ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ নামক প্রকাশনীতে জমা দেন। প্রকাশকের কাছ থেকে ওই বই বাবদ অগ্রিম ২০০ টাকা এনে অসীম দা’র হাতে তুলে দেন। অসীম সাহা দ’র মতে, ‘বস্তুত ছফা ভাইয়ের চেষ্টা এবং উদ্যোগে আমার এমএ পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়।’ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. নাজমা শাহীনের বিয়ের সময় তাঁর বাবা অর্থসংকটে পড়েন। নাজমা শাহীনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যেন কোনো সমস্যা না হয়, এ জন্য ছফা ভাই নিজের সিপাহি যুদ্ধের ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি বাংলাবাজারে কোনো এক প্রকাশকের কাছে বিক্রি করে টাকাটা নাজমা শাহীনের বাবার হাতে ধার হিসেবে তুলে দেন। কবি ও লেখক শিহাব সরকার ও মোরশেদ শফিউল আর্থিক সংকটে পড়ে আহমদ ছফার কাছে এলে তিনি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেন। এমন অনেক মানবিক ঘটনাই আছে, যা আহমদ ছফা ভাইকে বিরলপ্রজ মানবিক মূল্যবোধের লেখকের মর্যাদা দিয়েছে।ছফা ভাইয়ের লেখা অনেক লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকর ও বুদ্ধিজীবীকে অনুপ্রাণিত করেছে, তাঁদের মধ্যে হ‌ুমায়ূন আহমেদ, ফরহাদ মজহার, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তারেক মাসুদ ও সলিমুল্লাহ খান অন্যতম। হ‌ুমায়ূন আহমেদ ছফা ভাইকে ‘অসম্ভব শক্তিধর একজন লেখক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তাঁকে নিজের মেন্টর বলে উল্লেখ করেছেন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, আহমদ ছফা ‘চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত একশ ভাগ খাঁটি সাহিত্যিক। আমাদের বড় সৌভাগ্য তাঁর মতো একজন প্রতিভাবান মানুষের জন্ম হয়েছিল।’ জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মতে, ‘ছফার রচনাবলি গুপ্তধনের খনি এবং তার সাহিত্যকর্ম স্বকীয় এক জগতের সৃষ্টি করে, যে জগতে যেকোনো পাঠক হারিয়ে যেতে পারে।’ছফা ভাই ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন বিকেলে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য টিএসসি চত্বরে তাঁর মরদেহ রাখা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাঁর দাফন হয়। জাকির হোসেন এর ফেইসবুক থেকে সংগ্রহকৃত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here