মা পঙ্গু হাসপাতালে, টাকা জোগাতে অচেনা ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছেন ছেলে

0
190

রাজধানীর কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যাত্রীর অপেক্ষায় ২০-২৫ জন রিকশাচালক। ঈদকে কেন্দ্র করে যখন বাড়তি ভাড়া ছাড়া কোথাও যেতে নারাজ অন্য রিকশাচালকরা, ঠিক তখনই সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক রিকশাচালক বললেন, ‘স্যার, যা অাসল ভাড়া, হিসেবে করে তাই দিয়েন। তয় অামি রাস্তা চিনি না, অাপনে একটু চিনাইয়া লইয়া যাইয়েন।’

করুণ চাহনি ও কথা বলা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এই চালক শহরে নতুন। রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে চলতে চলতে তার রিকশা চালানোর ভঙ্গি দেখে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। কাঁপানো হাতে ধরা রিকশার হ্যান্ডেল ও ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে দ্রুত গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর অাপ্রাণ চেষ্টা তার।

দ্রুত রিকশা চালানোর কারণ জানতে চাইলে ওই রিকশাচালক বলেন, ‘স্যার, অামার মায়ে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি। মায়ের দুপুরের খাবার আর ওষুধ কিইনে নিইয়ে যাইতে হবে। কিন্তু এহনো তেমন টাকা কামাইতে পারি নাই। ঢাকায় অাগে কোনো দিন রিকশা চালাই নাই তো, তাই রাস্তাঘাটও চিনি না। বেশি ভাড়াও মারতে পারছি না।’

পরিচয় ও মায়ের অসুস্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই চালক জানান, তার নাম মো. গুলজার মিয়া। গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ি থানায়। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে গুলজার সবার বড়। ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে। অার ছোট ভাইটি গত দেড় বছর ধরে সিলেটে রিকশা চালান। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে ছোট ভাইয়ের কোনো যোগাযোগ নাই।

মায়ের বয়স প্রায় ৬০ বছর। এই বৃদ্ধ মা ও নিজের স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে এলাকায় একটি ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। তার উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন সেই ভ্যান গাড়ি।
মো. গুলজার মিয়া অারও জানান, গত ১৫ দিন আগে তার মা চাপ টিউবওয়েল পানি অানতে গিয়ে টিউবওয়েলের হাতলে অাঘাত পেয়ে অসুস্থ হয়েছেন। টিউবওয়েলের হাতলের অাঘাতে তার গলার নিচের দিকের একটি হাড় ভেঙে গেছে। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, তার মায়ের ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতে অপারেশন করতে হবে। তাই ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে মাকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসরা।

অবশ্য ঢাকার হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য গুলজারের নেই। সে কারণে নিজের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ভ্যানটি ৪ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করে দেন তিনি। এরপর অসুস্থ মা ও একমাত্র বোনকে নিয়ে ঈদের তিন দিন আগে পঙ্গু হাসপাতালে এসেছেন।

হাসপাতালে মায়ের ওষুধ ও অন্যান্য খরচ মিলে তিন দিনেই গুলজারের সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। চিকিৎসারা জানান, খুব তাড়াতাড়ি তার মায়ের অপারেশন করাতে হবে। তবে সব খরচ মিলে অপারেশন করাতে ৮ হাজার টাকা লাগবে। এই খবর শুনে বোনের জামাই অল্প কিছু টাকা নিয়ে রওনা দিয়েছেন।

হাতে কোনো টাকা না থাকায় অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য নিজের ও বোনের তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে গুলযার এই অচেনা শহরে রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছেন।

গুলজার বলেন, ‘সারা দিন রিকশা চালাইয়া ভাই-বোন দুইজনে মিইলে হোটেলে ভাত খাই। মা ভাত খাইতে পারে না। তাই মায়ের জইন্যে পাতলা সুজি, নরম ভাত এইসব কিইনে দেই। মায়ের চিকিৎসার জন্য কেউ সাহায্য করলে নেবেন কি না, জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি গুলজার।- প্রিয়.কম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here