‘মুসলিম পরিচয়’ কি দাবির বিষয়?

0
31

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নাজরানের প্রতিনিধি দলকে বলেছিলেন, ‘তোমরা মুসলিম হয়ে যাও’ তখন তারা বলেছিল, ‘আমরাতো মুসলিমই’। আসলেই কি মুখে নিজেদের মুসলিম বলে পরিচয় দিয়ে ইসলামের অনুসারি হিসেবে দাবি করার বিষয়?

কুরআনুল কারিমে ইসলামের দিকে দাওয়াত ও তাবলিগের মূলনীতি ঘোষণার পর এ বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য ওঠে এসেছে। যেখানে ইয়াহুদি, নাসারা তথা খ্রিস্টানরা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে নিয়ে বাদানুবাদ ও তর্কে লিপ্ত ছিল। তাকে নিজেদের দলের পক্ষে টেনে নিয়ে নিজেদের আকিদা বিশ্বাস সম্পর্কে যুক্তি তুলে ধরেছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَآجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنزِلَتِ التَّورَاةُ وَالإنجِيلُ إِلاَّ مِن بَعْدِهِ أَفَلاَ تَعْقِلُونَ – هَاأَنتُمْ هَؤُلاء حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُم بِهِ عِلمٌ فَلِمَ تُحَآجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ وَاللّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لاَ تَعْلَمُونَ -مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلاَ نَصْرَانِيًّا وَلَكِن كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ – إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَـذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُواْ وَاللّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ
‘হে আহলে কিতাবগণ! কেন তোমরা ইবরাহিমের বিষয়ে বাদানুবাদ কর? অথচ তওরাত ও ইঞ্জিল তাঁর পরেই নাজিল হয়েছে। তোমরা কি বুঝ না?
শোন! ইতিপূর্বে তোমরা যে বিষয়ে কিছু জানতে, তাই নিয়ে বিবাদ করতে। এখন আবার যে বিষয়ে তোমরা কিছুই জান না, সে বিষয়ে কেন বিবাদ করছ?
ইবরাহিম ইয়াহুদি ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন `হানিফ’ অর্থাৎ, সব মিথ্যা ধর্মের প্রতি বিমুখ এবং (আল্লাহর প্রতি) আত্মসমর্পণকারী আর তিনি মুশরিক ছিলেন না।
মানুষদের মধ্যে যারা ইবরাহিমের অনুসরণ করেছিল তারা, আর এই নবি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং যারা এ নবির প্রতি ঈমান এনেছে তারা ইবরাহিমের ঘনিষ্ঠতম। আর আল্লাহ হচ্ছেন মুমিনদের বন্ধু।’ (সুরা ইমরান : ৬৫-৬৮)

আয়াতের ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ
ইয়াহুদিরা বলত যে, হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন ইয়াহুদি। সুতরাং আমরা তারই ধর্মে রয়েছি। খ্রিস্টানরাও নিজেদের ব্যাপারে এমন কথা বলত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন- হে আহলে কিতাবগণ! ইবরাহিম তোমাদের ধর্মানুসারী ছিলেন এ ধারণা করে কেন তোমরা ইবরাহিম সম্পর্কে তর্ক কর, বাদানুবাদ কর। অথচ তাওরাত ও ইঞ্জিল (ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ) তার (আগমনের) দীর্ঘকাল পরে অবতীর্ণ হয়েছিল। আর এ দুই কিতাব অবর্তীণ হওয়ার পর ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের উদ্ভব হয়েছিল। সুতরাং তোমাদের এ কথা কত যে ভিত্তিহীন; তা কি তোমরা বুঝ না?

ওহে, তোমরা দেখ! যে বিষয়ে তোমাদের কিছু জ্ঞান আছে যেমন- হজরত মুসা ও ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তোমাদের ধারণা যে, তোমরা তাদের ধর্মের অনুসারী; সে বিষয়ে তর্ক কর। আর যে বিষয়ে জ্ঞান নেই; যেমন- ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে, সে বিষয়ে কেন তর্ক করছ? তাঁর বিষয়ে মহান আল্লাহর জ্ঞান আছে, আর তোমরা জ্ঞাত নও।

এ সব বিষয়ে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সম্পর্কহীনতার কথা বলতে গিয়ে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘ইবরাহিম ইয়াহুদিও ছিল না, খ্রিস্টানও ছিল না। তিনি ছিলেন হানিফ। সব মিথ্যা ধর্ম থেকে বিমুখ হয়ে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত এই মনোনীত জীবন ব্যবস্থার প্রতি একনিষ্ঠ, একত্ববাদে বিশ্বাসী মুসলিম আর তিনি অংশীদার স্থাপনকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।

যারা ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর যুগে তাঁর অনুসরণ করেছিল তারা এবং এ নবি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অধিকাংশ বিষয়ে তার শরিয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আর তার (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মতের বিশ্বাসীগণ মানুষের মধ্যে ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর ঘনিষ্ঠতম। ইবরাহিম সম্পর্কে এরাই বেশি হকদার। সুতরাং তোমরা নয়; বরং তাদের জন্যই বলা উচিত হবে যে, আমরা তার (ইবরাহিম আলাইহিস সালাম)-এর ধর্মের অনুসারী। আর আল্লাহর বিশ্বাসীদের অভিভাবক। তাদের সাহায্যকারী এবং রক্ষাকারী। (তাফসিরে জালালাইন)

মুসলিম বলে মুখে দাবি করা
নাজরানের প্রতিনিধি দল যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসেছিল তখন তিনি তাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা মুসলিম হয়ে যাও’। সে সময় তারা বলেছিল, আমরা তো মুসলিমই। খ্রিস্টান প্রতিনিধি দলের এ কথায় বুঝা গিয়েছিল যে, মুসলিমদের মতো তাদেরও দাবি ছিল- তারা মুসলিম।

অনুরূপভাবে ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের সামনে তাওহিদের কথা বলা হলে তারা বলত- আমরাও মহান আল্লাহকে এক বলি। বরং যে কোনো ধর্মাবলম্বী কোনো না কোনো রঙের এক পর্যায়ে গিয়ে স্বীকার করে যে, বড় আল্লাহ একজনই। এ আয়াতে সে দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

মিল্লাতে ইবরাহিমের ধর্ম বিশ্বাস
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর অনুসারীদের প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাস ছিল- আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করা। তিনি ও তাঁর অনুসারী মহান আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আর ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের দাবি ছিল যে- ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাদের নিজ নিজ ধর্মের অনুসারি ছিলেন (নাউজুবিল্লাহ)।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা সে দাবি খণ্ডন করেছেন। আরও জানিয়ে দিয়েছেন যে, পৃথিবীতে ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মের আগমনের প্রায় হাজার বছর আগে আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। সুতরাং তাদের কারোর পক্ষেই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের অনুসারী হওয়ার সম্ভাবনা মোটেই ছিল না।

আবার এ কথাও সুস্পষ্ট যে, বর্তমান সময়ে যে অর্থে ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরা তাদের নিজ নিজ ধর্মের অনুসারি বলে দাবি করছে, সে অর্থে হজরত মুসা ও ঈসা আলাইহিস সালাম ইয়াহুদি ও খ্রিস্টান নয়।

সুতরাং কেউ মুখে আমি মুসলিম বলে ঘোষণা দিলেই যেমন মুসলিম হয়ে যাবে না। মুসলিম হওয়ার জন্য কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার বিকল্প নেই। যা ওঠে এসেছে কুরআনুল কারিমের উল্লেখিত আয়াতে কারিমায়।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনুল কারিমের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের ইসলামের অনুসারি হিসেবে তৈরি করার তাওফিক দান করুন। দাওয়াত ও তাবলিগে বিশ্বনবির শেখানো পদ্ধতিতে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সূত্র: জাগো নিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here