যে লেনদেনকে আল্লাহ তায়ালা স্বাগত জানিয়েছেন

0
13

সেসময় বসরা ছিল ইরান বা পারস্যের অন্তর্গত। এখন অবশ্য ইরাকে। যে সময়ের গল্প বলছি সে সময় এখনকার মতো অনেক রাষ্ট্র ছিল না। ইরানকে কেন্দ্র করে ছিল পারসিয়ান সাম্রাজ্য। এখানে মুশরিকদের বসবাস ছিলো। তারাই শাসন করতেন। আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বি সাম্রাজ্য ছিল ইতালির রোমকে কেন্দ্র করে রোমান সাম্রাজ্য। রোমানরা ছিল ঈসা আ.-এর অনুসারী।

বসরার আল আবেলাহ শহরের শাসক ছিল সিনান ইবনে মালিক। তিনি পারস্যের সম্রাটের প্রতিনিধি হয়ে শাসন করতেন। তার ছেলের নাম সুহাইব। সুহাইবকে নিয়ে তিনি ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতে থাকেন, তাকে দিগ্বিজয়ী বীর বানাবেন। পুরো বসরার শাসক হবে সে। স্বপ্ন অনুযায়ী খুব ছোটবেলা থেকেই তাকে প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালেও সুহাইব ছিলেন কর্মঠ ও পরিশ্রমী। শিশু অবস্থায়ই সে বেশ ভালো তীরন্দাজ হয়ে ওঠে।

একদিন রোমানরা বসরা আক্রমণ করে। আল আবেলাহও তাদের আক্রমণের শিকার হয়। সিনান ইবনে মালিক তার শহরকে রক্ষা করতে সক্ষম হন নাই। রোমানরা বসরা থেকে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে ছিলেন সিনানের ছেলে সুহাইবও। ভাগ্য বিড়ম্বনায় শাসকের ছেলে হয়ে পড়লেন দাসে। সৈন্যরা সুহাইবকে নিয়ে রোমে দাসের হাটে বিক্রি করে দেয়।

শুরু হয় সুহাইবের নতুন জীবন। পরিবার ছাড়া, সাম্রাজ্য ছাড়া এই জীবন বড় পরিশ্রমের, বড় গ্লানির, বড় কষ্টের। এখন তার স্থান রোমে। কয়েকজন মালিকও বদল হয়েছে তার। এর মধ্যে তিনি প্রায় ভুলে বসেছেন তার মাতৃভাষা আরবিকে। রোমানদের ইংরেজি ভাষা আয়ত্ব করতে হয়েছে। দাসের জীবনে আর কোনো আশা ছিল না সুহাইবের। এর মধ্যে সুহাইব যুবক হয়ে উঠলেন। রোমে তিনি খ্রিস্টান পণ্ডিতদের দেখা পান। তারা তাকে বাইবেলের জ্ঞান দান করেন এবং আল্লাহ, নবী, ফেরেশতা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দেন।

এর মধ্যে পণ্ডিত কাহেনের সাথে তার সখ্যতা তৈরি হলো। সুহাইব প্রায়ই তার কাজের ফাঁকে কাহেনের কাছে যেতেন উপদেশ নিতে। কাহেন তাকে শেষ নবী সম্পর্কে থাকা আল্লাহর ভবিষ্যতবাণী জানায়। এবং এও জানায় তার আসার সময় হয়েছে। তিনি আরবে আসবেন। তিনি সকল অন্যায় দূর করবেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবেন। কাহেনের এই কথায় বেশ আগ্রহী হয় সুহাইব। সে প্রায়ই শেষ নবীর কথা জানতে চায় কাহেনের কাছে। কাহেন তাকে শেষ নবীর সমস্ত চিহ্নের কথা জানায়। কাহেন যখন এসব কথা বলছিলেন তখন মক্কায় মুহাম্মদ সা. ছিলেন। তবে তখনো তিনি নবুয়্যত পাননি।

এবার আশাহীন সুহাইবের মনে নতুন আশা জন্মালো। তার খুব ইচ্ছে সে আরবে ফিরে যাবে। শেষ নবীর সাথী হবে। এই জন্য সে নিয়মিত দোয়া করতে থাকে আল্লাহর কাছে। একদিন সুযোগ এলো। মক্কার এক ব্যবসায়ি তাকে কিনে নিতে চাইলো। সুহাইবের দামও নির্ধারণ করলো বেশ ভালো। সুহাইবের রোমান মালিক তাই তাকে মক্কার ব্যবসায়ির কাছে বিক্রয় করে দিলেন। আল্লাহ যেন সুহাইবের দোয়াই কবুল করলেন এর মাধ্যমে।

এবার সুহাইবের নতুন মালিক মক্কার ধনাঢ্য ব্যবসায়ি আব্দুল্লাহ বিন জুদআন। তিনি দেখলেন সিহাইব বেশ বুদ্ধিমান ও তার ব্যবসায়িক যোগ্যতা দারুণ। তিনি তাকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দান করলেন। সুহাইব দক্ষতার সাথে তার মালিকের ব্যবসা পরিচালনা করে তার মূল্য পরিশোধ করেন। অবশেষে তিনি দাসত্ব থেকে মুক্ত হন। এবার আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন তার সাথে অংশীদারী ভিত্তিতে ব্যবসার সুযোগ করে দেন।

ব্যবসায়ে খুব ভালো করলেন সুহাইব ইবনে সিনান। দাস সুহাইব থেকে হয়ে ওঠলেন ব্যবসায়ি সুহাইব। ইতোমধ্যে তার বিপুল সম্পত্তি গড়ে ওঠে। মক্কায় তার নাম হয় সুহাইব রুমি। সে যেহেতু রোম থেকে এসেছে তাই তার এমন নাম হয়েছে। একবার সিরিয়া থেকে ব্যবসায়িক সফর শেষ করে মক্কায় ফিরলেন সুহাইব। এমন সময় লোকমুখে খবর পেলেন হজরত মুহাম্মদ সা.-এর কথা। মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ নতুন সব কথা প্রচার করছে। সে নাকি শেষ নবী।

যুবক সুহাইব আগে থেকেই মুহাম্মদ সা.-কে চিনতেন। কাহেনের ভবিষ্যতবাণী তিনি মুহাম্মদ সা.-এর সাথে মিলিয়ে নিলেন। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে কাহেনের কথানুসারে মুহাম্মদ সা.-ই শেষ নবী। গোপনে তিনি ছুটে গেলেন মহানবীর আস্তানা দারুল আরকামে। দেখলেন সেখানে ইতস্তত ঘুরাফেরা করছে আম্মার ইবনে ইয়াসার। জিজ্ঞাসা করলেন,

-কী হে আম্মার এখানে কী করো? কেন এসেছো?

-আগে তুমি তুমিই বলো এখানে কেন এসেছো?

– আমি আসলে এই লোকের সাথে দেখা করতে চাই। সে কী বলে তা বুঝতে চাই।

– আমারো সেরকম ইচ্ছে, চলো…

সুহাইব ও আম্মার দুইজনে একসাথে হাজির হলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। মনযোগ দিয়ে কথা শুনলেন। ইসলাম কবুলের জন্য সময়ক্ষেপন করলেন না দুজনের কেউই। মহান রাব্বুল আলামীন হিদায়েতের আলো দিয়ে বরণ করে নিলেন। সুহাইব রুমি রা.-এর দোয়া আল্লাহ কবুল করেছিলেন।

সুহাইব রা. যে সত্যের ভবিষ্যতবাণী রোমে শুনেছিলেন তার সংস্পর্শে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন বন্ধুদের মাঝে। এক কান দুই কান হয়ে সুহাইবের ইসলাম গ্রহনের কথা জানাজানি হয়ে যায়। মক্কার মুশরিক নেতারা তার ওপর নির্যাতন শুরু করে। তবে তিনি স্বাধীন ছিলেন বিধান নির্যাতনের মাত্রা বেলাল রা., আম্মার রা.-দের মতো ভয়াবহ ছিল না।

মদিনায় যখন হিজরতের সিদ্ধান্ত হয়, তখন সুহাইব পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি মুহাম্মদ সা.-এর সাথে মদিনায় যাবেন। কিন্তু অতি গোপনে রাসূল সা. চলে যাওয়ায় তিনি তাঁর সাথে যেতে পারেন নি। এদিকে মুশরিকরা তার ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে তিনি মদিনায় যেতে না পারেন। তার ওপর নজর রাখা লোকেরা এসময় অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে কৌশলে তিনি তার ঘর থেকে বের হয়ে পড়লেন। সুহাইব রা. অস্ত্র সজ্জিত হয়ে তার বাহনে করে মদিনার দিকে রওয়ানা হলেন।

কিছুক্ষণ পরই পাহারাদার কুরাইশরা টের পেয়ে যায়। সুহাইব রা. পালিয়ে যাচ্ছেন বুঝতে পেরে মুশরিকরা তার পিছু ধাওয়া করে। সুহাইব রা. ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন মদিনার উদ্দেশে। এক পর্যায়ে বুঝতে পারলেন তিনি তাদের হাতে ধরা পড়ে যাবেন তাই তিনি একটি পাহাড়ের উপর উঠে ধনুক উঁচিয়ে ধরে বললেন,

” হে কুরাইশের লোকেরা! আল্লাহ শপথ, তোমরা জানো যে আমি অন্যতম সেরা তীরন্দাজ এবং আমার নিশানা নির্ভুল। আল্লাহর শপথ, যদি তোমরা আমার কাছে আসো, আমার কাছে থাকা প্রত্যেকটি তীর দিয়ে আমি তোমাদের একেকজনকে হত্যা করব। এরপর আমি তলোয়ার হাতে নেব।”

মুশরিকরাও আল্লাহর শপথ করে উত্তর দেয়, “আল্লাহর শপথ, আমরা তোমাকে জানমাল নিয়ে আমাদের কাছ থেকে পালাতে দেব না। তুমি মক্কায় দাস হিসেবে এসেছিলে। দুর্বল ও দরিদ্র ছিলে। তোমার যা আছে তা তুমি এখানে অর্জন করেছ।”

সুহাইব রা. সাথে সাথে উত্তর দিলেন, “যদি আমি আমার সম্পদ তোমাদের জন্য ছেড়ে যাই তবে তোমাদের ফয়সালা কী? তোমরা কি আমাকে আমার পথে যেতে দেবে?”

মুশরিকরা হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয়।

সুহাইব রা. তার বাড়িতে কোথায় কী সম্পদ আছে তা বর্ণনা করে তাদের জানিয়ে দিলেন। তারাও সুহাইব রা.-এর পথ ছেড়ে দিল।

জাগতিক দৃষ্টিতে এই বিনিময় অত্যন্ত ক্ষতিকারক মনে হয়েছে সুহাইব রা.-এর পক্ষে। তিনি যদি একটু কম্প্রোমাইজ করতেন তাহলে তার বিপুল সম্পত্তি হারাতে হতো না। সুহাইব রা. ইসলামী আন্দোলনের কাজকে ছাড় দেননি। ছেড়ে দিয়েছেন তার কষ্টার্জিত সম্পত্তি। অন্যদিকে আমরা এখন আমাদের সম্পদ বাঁচাতে ইসলামী আন্দোলনকে ছাড় দিই। আমাদের সম্পদ বাঁচাতে আমরা বাতিলের সাথে কম্প্রোমাইজ করি। আমরা হিকমতের নাম করে ইসলামী আন্দোলনের সাথে ততটুকু সম্পর্ক রাখি যতটুকু রাখলে বাতিল আমাদের ক্ষতি করবে না, আমাদের সম্পত্তির ক্ষতি করবে না।

মহান রাব্বুল আলামীন সুহাইব রুমি রা.-এর এই ব্যবসাকে (ইসলামী আন্দোলনের বিনিময়ে সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া) দারুণভাবে পছন্দ করেছেন। তাই তিনি কুরআনে এই ঘটনাকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করে রেখেছেন। সূরা বাকারার ২০৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, //আর মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজকে বিকিয়ে দেয়। আর আল্লাহ (তাঁর সেই) বান্দাদের প্রতি স্নেহশীল।//

মুশরিকরা তাঁর রাস্তা ছেড়ে দিলে সুহাইব রা. পুরো নিঃস্ব অবস্থায় তবে নিশ্চিন্তে ও খুশি মনে আল্লাহর রাসূল সা.-এর বিশ্বস্ত সঙ্গী হওয়ার জন্য মদিনার দিকে ছুটে চললেন। ইতোমধ্যে আল্লাহর রাসূলের কাছে ওহি পৌঁছে গেছে। তিনি সুহাইব রা.-কে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সুহাইব রুমি রা. পৌঁছালে মুহাম্মদ সা. তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “তোমার লেনদেন ফলপ্রসূ হয়েছে, হে আবু ইয়াহিয়া। তোমার লেনদেন ফলপ্রসূ হয়েছে।” একথা তিনি তিনবার বলেন।

একথা শুনে সুহাইব রা. অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং বলেন, “আল্লাহর শপথ, ইয়া রাসুলুল্লাহ সা.! আমার পূর্বে কেউ আপনার কাছে আসেনি যে আমার খবর আপনাকে দিবে। শুধু জিব্রাইলই পারে আপনাকে এই খবর দিতে।”

সুহাইব রুমি রা.-এর উপনাম ছিল আবু ইয়াহিয়া। মহানবী সা. এই নামেই তাকে সম্বোধন করেছেন। তিনি আনসার সাহাবি হারিস ইবনে সাম্মা রা.-এর সাথে সুহাইব রুমি রা.-এর ভাইয়ের সম্পর্ক করে দেন। ফলে হারিস রা. তার সম্পত্তি ভাগ করে নেন সুহাইব রা.-এর সাথে। মদিনায়ও সুহাইব রা. ভালো ব্যবসায়ি হিসেবে নাম করেন। তবে তিনি সম্পত্তি বাড়তে দিতেন না। দান করতেন দুই হাতে।

সাহাবাদের মধ্যে সুহাইব রা. মর্যাদা ছিল উঁচু স্তরে। তিনি বদর, ওহুদ, খন্দকসহ বহু যুদ্ধে এটেইন করেন। রাসূল সা. ও খুলাফায়ে রাশেদার সময়ে তিনি পরামর্শ সভায় থাকতেন। উমার রা. সবসময় তাঁর বিচক্ষণতার ওপর আস্থা রেখেছেন। তাই ছুরিকাহত উমার রা. মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত খলিফা হিসেবে সুহাইব ইবনে সিনান রা.-কে দায়িত্ব দেন। আর ছয়জন সাহাবির একটি কমিটি করে দেন। তারা হলেন উসমান ইবনে আফফান, আলী ইবন আবী তালিব, জুবায়ের ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস। তাদেরকে দায়িত্ব দেন তারা যেন তিনদিনের মধ্যে পরবর্তী খালিফা নির্ধারণ করেন।

তিনদিন ইসলামী রাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত খলিফা ছিলেন সুহাইব ইবনে সিনান রা.। উমার রা. তার নামাজে জানাজার ইমামতি করার ওসিয়ত করে যান সুহাইব রা.-এর কাছে। সুহাইব রা. দক্ষতার সাথে সেসময়ের জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। উমার রা. দাফন সম্পন্ন করার পর শুরা মেম্বারদের পরামর্শে যখন উসমান রা. খলিফা নির্বাচিত হলেন তখন সুহাইব রা. আমানতদারিতার সাথে উসমান রা.-এর কাছে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here