রমা চৌধুরীর শেষ কথা, আমার ছোট বোন শেখ হাসিনা যেন দীর্ঘজীবী হন

0
228

নাথ আশ্রম, বৃদ্ধা নিবাস, লোক সাহিত্য কেন্দ্র, বাবার নামে একটি একাডেমি তৈরিসহ অনেক স্বপ্ন ছিল তার। শারীরিক অসুস্থতা আর আর্থিক অনটন তা স্বপ্নই থেকে গেল। এ বছরের মার্চ মাসে হাসপাতালের বেডে শুয়ে এসব স্বপ্নের কথা সাংবাদিকদের বারবার বলছিলেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও লেখিকা রমা চৌধুরী। তিনি পিত্তথলির পাথর, ব্রংকাইটিস, ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। এছাড়া গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর বাসায় নিজের পোষা বিড়ালকে ধরতে গিয়ে পড়ে যান রমা চৌধুরী। এ ঘটনায় তার কোমরের হাড় ভেঙ্গে যায়। এরপর থেকেই তিনি একটানা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে এই বীরাঙ্গনা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওই সাক্ষাৎ ঘটনাকে জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত বলে মনে করেন রমা চৌধুরী। তিনি জানান, ‘ওই সাক্ষাতের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বলেছেন, “আপনি আমার বড় বোন”। সেদিন ছোট বোনের সঙ্গে ওই সাক্ষাৎই আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। তাঁর কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই। শুধু বড় বোন হিসেবে দোয়া করি, আমার ছোট বোন যেন দীর্ঘজীবী হন।’

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিজ বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হন রমা চৌধুরী। গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় তার ঘরবাড়ি ও যাবতীয় সহায়-সম্পদ। ওই নির্যাতনের ঘটনা একাত্তরের জননী নামক গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন। ১৯টি বই লিখেছেন তিনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খালি পায়ে চট্টগ্রামের রাস্তায় ঘুরে বই বিক্রি করেছেন। ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স করেন তিনি। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতাকে। এরই মধ্যে চালিয়ে যেতেন সাহিত্য চর্চা।

’৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে নতুন যুদ্ধে নেমে পড়েন রমা চৌধুরী। এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী রমা চৌধুরীর বাড়িতে হানা দেয়। ধর্ষণের পর তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় হানাদাররা। এ ঘটনার ক্ষত না শুকাতেই দুই বছর পর রমা চৌধুরীর দুই সন্তান সাগর (৫) ও টগর (৩) মারা যায়। স্ত্রীর সম্ভ্রম ও প্রিয় দুই সন্তান হারানোর ঘটনায় শোকে-দুঃখে দেশান্তরি হন স্বামী। তবু দমে যাননি রমা চৌধুরী। চালিয়ে যান জীবনযুদ্ধ। শিক্ষকতা জীবনে ১২টির বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এত বেশি বিদ্যালয় পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনগ্রসর স্কুলগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করাই আমার চিন্তা ছিল। তাই অনগ্রসর স্কুলগুলোর দায়িত্ব নিতাম। যখন স্কুলের শিক্ষার পরিবেশ একটা পর্যায়ে আসত তখন ফের নতুন করে আরেকটা অনগ্রসর স্কুলের দায়িত্ব নিতাম। আমি যেসব স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি, সবই আজ ভালো অবস্থানে।’

তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, স্বর্গে আমি যাব না, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন, শহীদের জিজ্ঞাসা, নীল বেদনার খাম, ’৭১-এর জননী, এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য, সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ভাববৈচিত্যে রবীন্দ্রনাথ এবং নির্বাচিত প্রবন্ধ ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরও কয়েকটি বই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে লেখালেখি নিয়ে অতৃপ্তিই থেকে গেছে রমা চৌধুরীর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here