শিক্ষকের মর্যাদা কখনো কমে না

0
278

যদি কোনো শিক্ষক ভুল বা অন্যায় অন্যায্য কিছু করেন, তাহলে তার জন্য ব্যক্তি এককভাবে নিজে দায়ী। তার দায় পুরো শিক্ষকগোষ্ঠীকে কেন বয়ে বেড়াবে? ছেলেমেয়েরা যেন কিছুতেই শিক্ষকের প্রতি আস্থা হারিয়ে না ফেলে। সেদিকে যেমন শিক্ষকদের নিজ নিজ দায়িত্ব থাকবে তেমনি পরিবারের দায়িত্বও তারচেয়ে বেশিই বটে! পরিবারই সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় বা শিক্ষাঙ্গন এ কথা ভুলে গেলে চলবে কেমন করে। বিগত দিনগুলোতে দেখেছি ভিকারুননিসার অরিত্রীর আত্মহত্যার জের ধরে অনেকেই ঢালাওভাবে শিক্ষকদের দায়ী করে চলেছেন। কিন্তু কেন? যে বা যারা ভুল করেছেন সে ভুলের দায় তাদের। কেন অন্যায়ভাবে অযথা সকল শিক্ষককে দোষারোপের পাল্লায় দুমড়ে মুচড়ে দিবেন? ভুলের উর্ধ্বে কেউই নয়।

‘যা কিছু রটে তার কিছু হলেও বটে’ প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী বলতেই পারি ভিকারুননিসায় যা কিছু ঘটে গেছে তার কিছু হলেও তো সত্য বটে! অর্থাৎ শিক্ষক নিয়ম অনুযায়ী যা কিছু করার করেছেন। নিয়মের বাইরে কেউই নয়। তবু অরিত্রীর বয়সটা অন্তত বিবেচনায় আনা উচিত ছিলো। মানছি, মা-বাবার দিক থেকেও অবহেলা ছিলো, না হলে মোবাইল ফোন নিষেধ সত্ত্বেও ক্লাসে ফোন নিয়ে ঢুকবে কেন? আমার দিক থেকে যদি বলি, তবে বলতে হয়, আমিও একজন মা আর এই মায়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি আমার মেয়েকে মোবাইল ফোন নিয়ে যেতে নিষেধ করতাম। সবচেয়ে বড় ভুল অরিত্রীর মা-বাবার, এই বয়সী একটা মেয়েকে তারা কেন মোবাইল ফোন কিনে দিলেন? সে দায় তাদেরই। সন্তানের সাথে মায়ের যোগাযোগের অভাব থাকলে আর কি বাকি থাকে ভুলের? না, থাকে না। কারণ মা-ই প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু। এই অভাব কেন থাকবে ছেলেমেয়েদের মাঝে? সেই জায়গায় আমরা অভিভাবকরা একশ ভাগ দায়ী।

ক্ষমা করবেন আমাকে। আমি কারো পক্ষ নিচ্ছি না আবার কারো বিপক্ষেও কিছু বলছি না। আমি একজন মানুষের জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবছি। অরিত্রীর ক্ষেত্রে কী হতে পারতো বা পারতো না। জানি, অরিত্রী আর ফিরে আসবে না। মেয়েটি ফুলের মতো সকালে ফুটে ঠিক দুপুরের আগেই ঝরে গেছে! নিশ্চয় কোনো মা-বাবাই চান না এমন অকালে কোনো সন্তান ঝরে যাক।

অরিত্রীর মা-বাবা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোঝাটি কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে! সে জায়গাটি উপলব্ধি করতে গিয়ে আমি ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত!

আমিও একজন মা। আমারও দুই মেয়ে। বড় মেয়েটি এই স্কুলেই অধ্যয়নরত। আমাকেও ব্যথিত ও আহত করেছে এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাটি। হয়তো ভুল ছিলো অরিত্রীর বাবার মায়ের। যতোটুকু নজর এড়িয়ে সে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকেছিলো ক্লাসরুমে ঠিক ততোটুকু নজর দিতে পারেনি বলে মেয়েটির অভিভাবক হয়ে তারাও লজ্জিত! আজ হয়তো ভাবছেন, ‘কেন এই ফোন কিনে দিয়েছিলাম মেয়েটাকে’! কান্নাই আজ তাদের সার্বক্ষনিক সঙ্গী।

যে হৃদয়ের খাঁচা ভেঙে পালয়ন করেছে পাখিটি তার মৃত্যুর জন্য এই শিক্ষা আর সমাজ ব্যবস্থা কি দায়ী নয়? আমরা যদি বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে অতো গলা ফাটাতে পারি তবে কেন এই অরিত্রীর বেলায় তা খাটেনি? চিৎকার করে করে গলা ফাটিয়ে কী লাভ বাস্তবে যদি তার প্রয়োগ না করি? বন্ধুসুলভ হতে শিখিনি আমরা। মা-বাবা, ভাই-বোন, শিক্ষক, অভিভাবক সবাই কেমন শাসনে নেমে পড়তে উদগ্রীব! অথচ আগলে রাখার বিকল্প আর কিছুই নেই। ভালোবেসে সন্তানকে বুঝাই না কখনো যে, তোমার রেজাল্টের চেয়ে তুমি বেশি দামি আমাদের কাছে। যখন ভালো রেজাল্ট করাতে রাতদিন লেগে থাকি তখন একবারও ভাবি না ওরা মানুষ হচ্ছে কি না! দেখছি, ভাবছি আর অবাক হচ্ছি কেউ কেউ বলে যাচ্ছেন ‘আত্মহত্যাকে এতো দামি বানানোর কী আছে। আর যে আত্মহত্যা করেছে তাকে নায়িকা বানানোর কিছু নেই’ এগুলো বলার আগে আপনারা একটি বার পনেরো বছরে ফিরে গিয়ে ভাবুন। নিশ্চয় মেয়েটির মানসিক সমস্যা ছিলো! মেয়েটির বাবা মা এখানেই ব্যর্থ কারণ এদেশের ক্লাসরুমগুলোর যে অবস্থা তাতে শিক্ষকদের সবার প্রতি নজর দেওয়া কঠিন। তাই নিয়মিত সন্তানের খেয়াল মা-বাবারই রাখা উচিত।

শিক্ষায় আমরা এখনো উন্নত দেশগুলোর ধারে কাছেও পৌঁছুতে পারিনি। তাই সেই ধরনের কাউন্সিলিং আশা করাও যেন এক রকমের পাগলামি। তবুও শিক্ষকরা চাইলেই পারেন আরেকটু সদয় হতে। শত হলেও ওরা ছোট। টিনএজ যেখানে ভয়ঙ্কর রূপে দাঁড়িয়ে! মা বাবার জায়গায় শিক্ষকরা দাঁড়াবেন। এটাই মানবিকতা। এটাই সহমর্মিতা। এটাই ধর্ম। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা মানব ধর্ম জানি না।

তবে একথা সবার বেলায় খাটে না। আজো এমন শিক্ষক আছেন যারা মা বাবার মতোই মমতাম আর স্নেহময়। এমন উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। ভালোর পাশাপাশি মন্দ থাকবেই। বিপরীত সূত্র নিয়েই পৃথিবী ধাবমান। এই বিশ্ব পাঠশালাটি টিকে আছে, হয়তো চিরদিন থাকবেও। তারা আছেন বলেই টিকে আছে। যুদ্ধ যখন শুরু হয় রক্ত দিতেও প্রস্তুত হতে হয়, নয়তো মুক্তির আশা করা বোকামি! আত্মহত্যা মহাপাপ তা সত্ত্বেও এই আত্মিক ধারণাটি কোনো স্কুল কলেজ কি সময়মতো সময়ের শিক্ষাটুকু দিচ্ছে? কেন আত্মহত্যা মহাপাপ? কেন জীবনের ঊর্ধ্বে কিছু নয়? একথা পাঠ্যপুস্তকে না থাকলেও শিক্ষকরা বোঝাতেই পারেন ছাত্রদের। বিশেষ করে সেই সমস্ত কিশোর-কিশোরীদের যারা অরিত্রীর মতো। কে জানে কোন ছেলে মেয়ে কী সমস্যায় ভুগছে? সমস্যার নামই পৃথিবী, তেমনি সমাধান সূত্রও এখানেই। আমরা পারিও না, চাইও না অন্যের কোনো দুঃখের ভাগীদার হতে, সে শিক্ষক হন আর উকিল বা ডাক্তার হন। সময়ে সেনসিটিভ হতেই হয় নয়তো সমাধান সূত্র খুঁজে পাবো কীভাবে?

আত্মহত্যা প্রবনতা যেভাবে বাড়ছে তাতে সকলেরই মনোজগতের পরিবর্তন জরুরি। অভিভাবক, শিক্ষক এমন কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়া থেকে পিয়ন সকলের! ভালো কোনো পরিবর্তনের জন্য পারিবারিক সচেতনতা সবার আগে জরুরি। কাকে কী বলবো? কাকে কী সম্মান করবো? কী উচিত, কী অনুচিত? সবকিছু পরিবারই আগে শেখাবে অথচ সময়ের চাপে আমরা কেবলই হৃদয়হীন রোবট হয়ে যাচ্ছি। ভয় পাই তথাকথিত নিয়মের নামে হৃদয়হীন বিচারগুলোকে! জীবনের জন্য নিয়ম, নিয়মের জন্য জীবন নয়! প্রতিটি বিবেক কবে হবে যার যার আদালত? একথা কেউ জানে না! অন্ধকার আত্মাগুলো আলোর সলতে চিনতে শিখুক। আমাদের সন্তানরা বড় হওয়ার পাশাপাশি বিবেকের সাথে পরিচিত হোক। তবেই ওরা মানুষ হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল-ব্যারিস্টার যা কিছুই হোক না কেনো, সবার আগে মানুষ হতে হয়। লেখক : কবি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here