সচেতনতার ‘ফেরিওয়ালা’

0
312

গায়ে কালো ট্রি-শার্ট, কাঁধে ছোট ব্যাগ, একটি প্ল্যাকার্ড হাতে হাঁটছেন। আবার কোথাও কোথাও দাঁড়াচ্ছেন। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে সিগন্যালে পড়া গাড়ির চালকের নজর কাড়ছেন এক যুবক। সেদিন শুক্রবার পান্থপথে শমরিতা হাসপাতালের সামনে হঠাৎই নজর কাড়ল শ্মশ্রুমন্ডিত ওই যুবক।

প্ল্যাকার্ডে লেখা- “হর্ণমুক্ত বাংলাদেশ, আরো সুস্থ বাংলাদেশ”! অনেক পথচারী প্ল্যাকার্ডে তাকাচ্ছেন। মনোযোগে অনেকেই পড়ছেনও। কথা ঠিক, সকলেরই মানা উচিত- বলাবলি করছেন পথচারীরা। গাড়ির চালক ও যাত্রীরাও বারবার দেখছেন।

প্রতিদিন রাজধানীর কয়েকটি সড়ক হেঁটে ত্রিশোর্ধ্ব যুবক পথচারী; বিশেষকরে গাড়ির চালকদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। ট্রাফিক সিগন্যালে সময় নিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। উপর্যুপরি জোরে হর্ণ বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাকার্ডটি ওই চালকের সামনে ধরেন। সময় পেলে ব্যাগ থেকে বের করে “হর্ণমুক্ত বাংলাদেশ, আরো সুস্থ বাংলাদেশ” লেখা সম্বলিত একটি প্রচারপত্র চালক ও যাত্রীদের হাতে দেন। এতে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক ফলও আসছে।

নগরীর সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি শব্দ দূষণ। আর তা রোধে নাগরিক সচেতনতায় উদ্যোগী এই যুবকের নাম এবিএম নাজমুল হুদা। কাজ করেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে। অফিসে আসা-যাওয়ার পথে তার হাতে থাকে ওই প্ল্যাকার্ড। অফিসও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখে।

হাঁটতে হাঁটতেই কথা হয় নাজমুল হুদার সঙ্গে। ভারী এই প্ল্যাকার্ডটি একটু পরপর এক হাত থেকে অন্য হাতে নিচ্ছেন। তপ্ত দুপুর। কাঠফাটা রোদ। ঘর্মাক্ত দেহে তিনি বলেন, মানুষ এখনও হর্ণ নিয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়। হর্ণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ। ইতিবাচক একটি ভাবনা ছড়িয়ে দিতেই এই সচেতনতামূলক উদ্যোগ। শুরুতে এ উদ্যোগটি ভার্চুয়ালভিত্তিক ছিল। এ সচেতনতা তৈরির কাজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আমাদের একটি গ্রুপ আছে। কাছের কয়েকজন বন্ধু-স্বজন মিলেই স্বেচ্ছায় কাজটি চালিয়ে যাচ্ছি।

রাস্তায় বের হলেই সঙ্গী হয় তার জনসচেতনামূলক ওই প্ল্যাকার্ড। বাস- ট্যাক্সি-বাইকে চড়ার সময়ও হাতে থাকে তার প্ল্যাকার্ড। দীর্ঘক্ষণ প্ল্যাকার্ডটি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে কষ্টও হয় নাজমুল হুদার। একটানা প্ল্যাকার্ডটি ধরে রাখলে হাত ব্যাথাও হয়।

হুদা বলেন, এটা নিয়ে যখন হাঁটি দশজন দেখে। আগ্রহী দু’য়েকজন কথাও বলে। আমার সঙ্গে যোগ দেয়। তবে অনিয়ন্ত্রিত
হর্ণ আমূলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সময় লাগবে। কারণ আমার কেউই ভাবি না, আমার লাভে অন্যের কি ধরনের ক্ষতি হচ্ছে! যে শব্দটা আমি তৈরি করছি তার দায়িত্ব আমারই নিতে হবে। এমনকি আমার চলার কারণে বাধ্য হয়ে যদি শব্দ তৈরি করতে হয়, সেটার দায়িত্বও আমাকে নিতে হবে।

চালকের সঙ্গে পথচারীরও দায় রয়েছে উল্লেখ করে এই স্বেচ্ছাসেবী বলেন, মোবাইলে গভীর মনোযোগে কথা বলে রাস্তা পার হলে চালকের জোরে হর্ণ দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না- সেক্ষেত্রে দায় পথচারীও। তবে অন্যক্ষেত্রে চালকের দায় বেশি। বাসার গেটে সামনে গিয়ে হর্ণ বাজাতে-বাজাতে পাড়া মাথায় তোলে ফেলে, এতে বাসায় থাকা অন্যদের যে ক্ষতি হচ্ছে তা মাথায় নেই। সে বাসায় সদ্যোজাত শিশুও থাকতে পারে।

এসব সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমেরও বেশ দায়িত্ব রয়েছে জানিয়ে নাজমুল হুদা বলেন, দায়সারা কাজ করলে হবে না। বিষয়টির ক্ষতিকর প্রভাব জ্যামিতিক আকারে নানা উপায়ে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। গণমাধ্যমের গবেষণা করা উচিত।

একাজে পথচারীরাও বেশ ইতিবাচক। তারা বলছেন, রাস্তায় সকলেই বিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকা উচিত। একজন সচেতন হলে অন্যজনকে উতসাহিত করা উচিত।প্রয়োজনে এই প্লাকার্ড হাতে আমাদেরও রাস্তায় নামা উচিত।

পথচারী ও চালকদের মধ্যে বিলি করা প্রচারপত্রে লেখা আছে- আমাদের সচেতনতাই আমাদের সুস্থতা। একদিন যেনো সবাই গর্বভরে বলতে পারি ‘আমি হর্ণ বাজাই না বন্ধু’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদফতরের গত বছরের জরিপে দেখা যায় দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। যা স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে আড়াই থেকে তিনগুন বেশি

মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ১২% মানুষ শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে বলে পরিবেশ অধিদফতরের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে আসে। সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ , ফুসফুসজনিত জটিলতা , মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক চাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা।

শব্দ দূষণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ২০০৬ সালের শব্দদূষণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও সেটা রয়েছে শুধু কাগজে কলমে। বিধি অনুযায়ি হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ের সামনে এবং আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো, মাইকিং করা সেইসঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে জোরে শব্দ সৃষ্টি করা আইনত দণ্ডনীয়। তবে সেই আইনের কোন প্রয়োগ নেই। শব্দ দূষণের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পেছনে একেই প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here