সরকারি হাসপাতালেও ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্ভব

0
298

দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে সরকার। এর আলোকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বল্পমূল্যে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে শুরু করে বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের।

এক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরের সেবা এগিয়ে গেছে। রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে শুরু করে অস্ত্রোচারসহ বিভিন্ন সেবা ২৪ ঘণ্টা দিয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট সেক্টর। তবে এই সেবা নিতে গিয়ে রোগীদের গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। যা দরিদ্র রোগীদের জন্য অনেক সময় সম্ভব হয় না।

এ অবস্থায় ২৪ ঘণ্টাই পাবলিক বা সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ অন্যান্য সেবা প্রদান করা সম্ভব কিনা তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এক্ষেত্রে নীতিমালা তৈরি, অর্থ বরাদ্দ এবং লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে সরকারিভাবেও ২৪ ঘণ্টা বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ল্যাব উন্মুক্ত রাখা সম্ভব বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ হেলথ রাইটস মুভমেন্টস’র প্রেসিডেন্ট ও বারডেম হাসপাতালের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘পাবলিক হাসপাতালের যে ল্যাবরেটরি আছে তা ওই হাসপাতালের জন্যই মূলত ব্যবহার হওয়ার কথা। ওই ল্যাবরেটরি থেকে ২৪ ঘণ্টাই সেবা দেওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন পাবলিক হাসপাতালের ল্যাব সার্ভিস প্রাইভেট সেক্টরও নিতো। তবে এখন প্রাইভেট সেক্টরের টেস্ট শুরু হয়ে গেছে। এখন মূলত প্রাইভেট সেক্টরে তাদের নিজেদের কাজগুলো হয়। অনেক সময় পাবলিক হাসপাতালের কাজগুলোও প্রাইভেট সেক্টরে চলে যাচ্ছে। কারণ পাবলিক হাসপাতালের টেস্ট ল্যাব ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে না।’

তবে পাবলিক খাতের হাসপাতালগুলোতেও ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এক্ষেত্রে তিনি বারডেম হাসপাতালের উদাহারণ দেন।

ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা সার্ভিস চালু রাখতে হলে সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারকে এইক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দিতে হবে। এটা আসলে স্ট্যান্ডার্ড প্ল্যান। একটা হাসপাতালে তার রোগীর জন্য সর্বক্ষণ ল্যাব খোলা থাকবে। সেখানে কেউ উপস্থিত থাকবে যে এগুলো দেখবে। একটা হাসপাতালের মূল যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেটা বাইরে যাওয়ার কথা না।’

সরকারি হাসপাতালগুলোর ল্যাবরেটরি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা সম্ভব না হলে কেন্দ্রীয়ভাবে ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক।

তিনি বলেন, ‘পাবলিক সেক্টরে যদি অনেকগুলো হাসপাতাল থাকে তাদের একটা সেন্ট্রাল জায়গা থাকতে পারে। এই সিস্টেমে প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজের পর অন্য সময়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্যাম্পলগুলো কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে দিয়ে ই-মেইলের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে পরীক্ষার ফল সংগ্রহ করা সম্ভব।

এর জন্য যে খুব বেশি অর্থ বা আনুষঙ্গিক জিনিস প্রয়োজন তা না, এর জন্য যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে সদিচ্ছা। এটা অবশ্যই পাবলিক হাসপাতালে হওয়া উচিত। অবশ্যই সরকারি হাসপাতালকে ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দিতে হবে। এটলিস্ট ইন হাউজ রোগীদের এ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। এটি হলে প্রাইভেট হাসপাতালের পরীক্ষার খরচ কমে আসবে।’

সরকারি হাসপাতালের ল্যাবগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার জন্য সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানো ও স্বাস্থ্যখাতের কর্মীদের আরও সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি চাকরিবিধি অনুযায়ী সপ্তাহে দুইদিন ছুটি ভোগ করেন। কৃষি, শিল্প, প্রশাসনসহ সকল সরকারি চাকরিজীবীদের এই নিয়ম। শুধু সরকারি হাসপাতালে যারা কাজ করেন তারা একদিন সরকারি ছুটি ভোগ করেন। প্রশ্নটা আসতে পারে সবাই দু’দিন ছুটি ভোগ করে শুধু চিকিৎসকরা কেন একদিন ছুটি ভোগ করেন? তার কারণ হলো, হাসপাতাল দু’দিন বন্ধ থাকলে রোগীর সেবা বিঘ্নিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের কর্মীদের ছুটি দু’দিন হলে জরুরি বিভাগে অনেক কাজ বন্ধ হয়ে থাকবে। অনেক সময় রোগীর প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ব্যাহত হবে চিকিৎসা সেবা। শুধু ওই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইনভেস্টিগেশন, জরুরি অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য সেবার কথা চিন্তা করেই একদিন ছুটি দেওয়া হয়েছে।’

তবে বন্ধের দিনেও সীমিত আকারে চিকিৎসা সেবা চালু থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া আরও বলেন, ‘ছুটির দিনেও জরুরি বিভাগে ইনভেস্টিগেশন প্রসিডিউর সীমিত আকারে চালু থাকে। বিশেষ করে টারশিয়ারি লেভেল এবং সেকেন্ডারি হাসপাতালগুলোতে কিছু পরীক্ষা হয়। যেমন- রক্তের পরীক্ষা, সিবিসি, সিজারের পরীক্ষা, ইলেকট্রোলাইট- এইরকম জরুরি পরীক্ষাগুলো সরকারি হাসপাতালে হয়ে থাকে।’

২৪ ঘণ্টা এই সার্ভিস চালু করা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সরকার ভাবতে পারে। এক্ষেত্রে জনবল বাড়াতে হবে। শুক্রবারকে যদি আমরা কাজে লাগাই তাহলে আর একটা উইং বাড়াতে হবে। শুধু বললেই হবে না। জনবল বাড়াতে হবে। সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। টেকনোলজিস্টদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এরপর রোগীর জন্য ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।’    বাংলা ট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here