সুদ : আর্থিক বিপর্যয় বয়ে আনে

0
252

সলামের দৃষ্টিতে সুদ একটা অমানবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অর্থনৈতিক শোষণের অন্যতম হাতিয়ার। সুদের মাধ্যমে গরিব আরও গরিব হয়। আর মহাজন হয় আরও কোটিপতি। কেননা একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, ঋণ তো অভাবীরা গ্রহণ করেন। আর যারা ঋণ দেন, তারা তো নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থটাই কেবল ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করেন। গ্রাম বা মহল্লার দরিদ্র চাষী, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা একজন শ্রমজীবীর কথা চিন্তা করে দেখুন। সুদের ভিত্তিতে ঋণ গ্রহণ করলে তার অবস্থাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা উদাহরণ স্বরূপ দেওয়া হলো।

মনে করি, রিহান নামক ব্যক্তির নিজস্ব আয়ে বছরে দশ মাস ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। শেষ দুই মাসে সে সুদে টাকা দিয়ে সংসারের আয় বাড়ানোর কাজে বিনিয়োগ করলো। দ্বিতীয় বছর সব মিলিয়ে সে বারো মাস চলার মতো সামর্থ্য অর্জন করলো। কিন্তু তা সত্তেও পূর্ববর্তী বছরের ঋণ এবং সুদ পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থে তার নয় মাস চললো।

সুতরাং এ বছর তার তিন মাসের ব্যয় নির্বাহ করতে হবে নতুন করে ঋণ গ্রহণ করে। এবার হিসেব করে দেখুন, সুদে টাকা ধারি দিয়ে এ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবাটির পথে বসতে ক’বছর সময়ের প্রয়োজন হবে? এভাবেই সুদভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থার মারপ্যাঁচে পড়ে একটি পরিবার থেকে শুরু করে আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে হতদরিদ্র ও নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

অর্থনীতি অনেক জটিল বিষয়। এ বিষয়ে বড় বড় পণ্ডিত যারা আছেন, তারা এর পক্ষে-বিপক্ষে জটিল জটিল সব যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতে সক্ষম। এমনকী মহা মহা যুক্তি আর বড় বড় রেফারেন্স টেনে তারা সুদভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থার মহাত্মও প্রমাণ করে ছাড়বেন, সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু অধিকাংশই সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সর্ম্পকে ওয়াকিবহাল নন। তবে তাদের কাছে একটি বিষয় জিজ্ঞেসা করতে পারি, আমাদের দেশের যে সমস্ত এনজিও সুদের বিনিময়ে অর্থ বিনিয়োগ করে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের জন্য নিরলস পরিশ্রম চালিয়ে আসছেন। বিগত দশ-বিশ বছরের একটা পরিসংখ্যান নিয়ে দেখুন তো, এতে ফুলে ফেঁপে উঠছে কারা? দরিদ্র ঋণগ্রহীতারা, নাকি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলো। নিঃসন্দেহ দ্বিতীয় পক্ষই। কিন্তু কেন?

আমার ধারণা, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ঠিক এমনটিই হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন তহবিল থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যে ঋণ দেয়া হচ্ছে, এর পরিনাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভয়াবহ রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। একটি উন্নয়নশীল দেশকে সম্পূর্ণ পরমুখাপেক্ষী ও পরনির্ভরশীল করে দেয়ার প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ঋণ দেয়া হয় অনুৎপাদনশীল খাতে। ফলে সুদসহ ঋণের বোঝাটা দরিদ্র জাতির ঘাড়ে চেপে বসে সিন্দবাবদের মতো। আর উৎপাদনশীল কোনো খাতে কিছু টাকা ঋণ বরাদ্দ হলেও এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় হাজারো শর্ত। ফলে দাতার টাকার সিংহভাগ দাতার ঘরেই চলে যায়। মাঝখান থেকে সুদসহ কিস্তির টাকা যোগাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হয় দরিদ্র দেশগুলোকে। দাতাগোষ্ঠীর কেষ্টবিষ্টুরা এবারে কিছুটা উদার হয়ে যান, এমনকী ঋণের অথবা সুদের খানিকটা তারা মাফও করে দেন। ফলে আমরা উন্নয়নশীলরা বগল বাজিয়ে বাহবা দেই, বাহ, এ না হলে কী আর দাতাগোষ্ঠী!

সুদ ব্যবস্থা আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত একটা বিষাক্ত ফল। মানবতার কল্যাণে নিবেদিত দীন ইসলামে এর কোনো স্থান নেই। তাই তো রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সুদ ও ব্যাভিচার যখন কোনো দেশ বা শহরে ব্যাপক হয়ে দাঁড়াবে, তখন তাদের ওপর আল্লাহর আযাব অনিবার্য।’ ( মুসতাদরাকে হাকিম: ৩৪৪) সুতরাং এ থেকে বিরত থাকা এবং এর প্রতিরোধ স্বরূপ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতীব জরুরী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here