সেদিনের স্মৃতি ভুলেনি হাতিয়াবাসী

0
44


সারারাত কোনোমতে কলাগাছ ধরে বেঁচে থাকলেও ভোর হতেই দেখি পরিবারের ১০ সদস্যের মধ্যে ছয়জনই ভেসে গেছে বানের পানিতে। চোখের সামনেই ভেসে গেছে পরিবারের ছয়জন। কিছুই করতে পারিনি। সেদিন মানুষ আর পশুর লাশ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো। একটি লাশও পাইনি কবর দিতে। আপনজন হারানোর দুঃখ বুকে চেপে রেখে গ্রামবাসীর লাশ কবর দেয়া আর ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে নেমে পড়তে হয়েছে পরের দিন।

সে সময় হাতিয়ার  ১ নম্বর হরণী ইউনিয়নের লক্ষ্মী গ্রামের বসবাস করা অমূল্য চন্দ্র দাস (৮০) এভাবেই ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ভয়াল রাতে ঘূর্ণিঝড় ‘গোর্কী’র ভয়াবহতার বর্ণনা দেন। ঘূর্ণিঝড়ের পাঁচ বছর পর  বাড়িটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে তিনি বসবাস করেন হাতিয়ার চরঈশ্বর ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ডে।

তিনি আরও বলেন, গোর্কির ছোবলে  সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় চরাঞ্চলে। তখন ছিল ধানকাটা মৌসুম। এ কারণে জমির মালিক ও ধান কাটা শ্রমিক মিলে অসংখ্য লোক চরাঞ্চলে অবস্থান করছিলো। এর মধ্যে অধিক জলোচ্ছ্বাসে কেউ কেউ মহিষের লেজ ধরে ভেসে থেকে বেঁচে যায়।

সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন হাতিয়ার  দুই নম্বর চানন্দী ইউনিয়নের মাইজচরা গ্রামের সৌরহাজী বাড়ির তরুণ রফিকুল আলম। বর্তমানে তিনি হাতিয়া দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক। ঘূর্ণিঝড় গোর্কীর ভয়াবহতা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন। সে দিন ছিল রমজান মাসের কোনও একদিন।

হাতিয়ার মূলভূখণ্ডের চেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় চরাঞ্চলে। নিঝুম দ্বীপে প্রায় পাঁচ শতাধিক লোকের মধ্যে বেঁচে ছিল কেরপা বুডি ও বনবিভাগের প্রহরি হাবিবুল্লাসহ ১২ জন। সাহেবানীর চরে প্রায় ৫-৬ হাজার লোকের মধ্যে বেঁচে ছিল দুইজন সপু মিয়া ও উকিল মেম্বার। এদের মধ্যে কেউ এখন বেঁচে নেই।

তাদের মতে ৭০-এ হাতিয়া দ্বীপে মরেছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড ও লাগোয়া নিঝুম দ্বীপ, দমার চর, ঢাল চর, মৌলভীরচর, সাহেবানির চর, চর নুরইসলাম, চর ইসলাম, নঙ্গলিয়ার চর, কেরিংচর, নলের চর, নামার চর ও পাতার চর, বন উজাড় করে গড়ে ওঠা মেঘনা পাড়ে এবং বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি এই অরক্ষিত জনপদে এখন  লক্ষাধিক মানুষের বসবাস।

তারা রয়েছেন সরাসরি প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মৃত্যু ঝুঁকিতে। এসব চরে কয়েকটি  ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও  নেই বেড়িবাঁধ। পাশাপাশি উন্নত যোগাযোগ ও অবকাঠামো না থাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে এ চরগুলোর বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরানো সম্ভব হয়ে উঠে না।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ভয়াল গোর্কিতে নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রায় ২০ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে।

হাতিয়া উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন বলেন, হাতিয়ায় বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলসহ মূল ভূখণ্ডে ১৮৫টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে কিছু আশ্রয়কেন্দ্রে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তাছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সূত্র: আরটিভি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here