সেন্টমার্টিনের মালিকানা দাবি মিয়ানমারের!

0
249

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের জনপদ সেন্টমার্টিন দ্বীপের কিছু অংশ মিয়ানমারের বলে দাবি করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে শনিবার ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও-কে তলব করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কক্সবাজারের সর্বদক্ষিণে নাফ নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ ইউনিয়ন সেন্টমার্টিনের একটি অংশ নিজেদের বলে দাবি করার চেষ্টা করছে মিয়ানমার। তাদের সরকারের কয়েকটি ওয়েবসাইটে এ দাবি করা হয়েছে। এমনকি দ্বীপের মানুষজনও মিয়ানমারের বলে দাবি করা হয়েছে।

তা জানতে পেরে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ লুইনকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর তার হাতে কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র ধরিয়ে দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ। একইসঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,  সেন্টমার্টিন কখনোই মিয়ানমারের অংশ ছিল না। এমনকি ব্রিটিশ আমলেও এটা মিয়ানমারের অংশে পড়েনি। ১৯৩৭ সালে মিয়ানমার যখন ব্রিটিশ-ভারত থেকে ভাগ হয়ে যায়, তখনো এই দ্বীপ মিয়ানমারের মধ্যে ছিল না। মিয়ানমার কিসের ভিত্তিতে এই দ্বীপের অংশ তাদের বলে দাবি করছে তা রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চাওয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে।

সূত্র জানায়, তলবের প্রেক্ষিতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, এটা ভুলবশতঃ হয়েছে।

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে একে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হয়ে থাকে। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হতে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমার উপকূল হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত। প্রথম কিছু আরব বণিক এই দ্বীপটির নামকরণ করেছিল জিঞ্জিরা। এরা চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাতায়াতের সময় এই দ্বীপটিকে বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করতো। চট্টগ্রাম এবং তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষ দ্বীপটিকে জিঞ্জিরা নামেই চিনতো। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কিছু বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মৎস্যজীবি মানুষ এই দ্বীপে বসতি স্থাপনের জন্য আসে। যতটুকু জানা যায়, প্রথম অধিবাসী হিসাবে বসতি স্থাপন করেছিল ১৩টি পরিবার। এরা বেছে নিয়েছিল এই দ্বীপের উত্তরাংশ। কালক্রমে এই দ্বীপটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়।  সম্ভবত বাঙালি জেলেরা জলকষ্ট এবং ক্লান্তি দূরীকরণের জন্য প্রচুর নারকেল গাছ এই দ্বীপে রোপণ করেছিল। কালক্রমে পুরো দ্বীপটি ‘নারকেল গাছ প্রধান’ দ্বীপে পরিণত হয়। এই সূত্রে স্থানীয় অধিবাসীরা এই দ্বীপের উত্তরাংশকে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে অভিহিত করতে শুরু করে। ১৯০০ সালের দিকে ব্রিটিশ ভূ-জরিপ দল দ্বীপকে ব্রিটিশ-ভারতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। জরিপে স্থানীয় নামের পরিবর্তে খ্রিষ্টান সাধু মার্টিনের নামানুসারে সেন্ট মার্টিন নাম প্রদান করা হয়। বিখ্যাত লেখক,কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দারুচিনির দ্বীপ নামের পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবির মাধ্যমে এই দ্বীপটির পরিচিতি আরো বেড়ে যায়।

প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ বছর আগে এখানে লোক বসতি শুরু হয়। বর্তমানে এখানে সাত হাজারেরও বেশি লোক বসবাস করে। দ্বীপটিকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রীক চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।  সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন টেকনাফ উপজেলার আওতাধীন ৬নং ইউনিয়ন পরিষদ। এ ইউনিয়নের প্রশাসনিক কার্যক্রম টেকনাফ মডেল থানার আওতাধীন। এ ইউনিয়ন জাতীয় সংসদের ২৯৭নং নির্বাচনী এলাকা ও কক্সবাজার-৪ এর অংশ।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮ বর্গ কিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। এ দ্বীপের তিন দিকের শিলা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে। ভাটার সময় এ দ্বীপের আয়তন হবে প্রায় ১০-১৫ বর্গ কিলোমিটার। এ দ্বীপটি উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৫.৬৩ কিলোমিটার লম্বা। দ্বীপের প্রস্থ কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার প্রবাল প্রাচীর।

ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তর অংশকে বলা হয় নারিকেল জিনজিরা বা উত্তর পাড়া। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় দক্ষিণ পাড়া এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ-পূর্বদিকে বিস্তৃত একটি সংকীর্ণ লেজের মতো এলাকা। সংকীর্ণতম অংশটি গলাচিপা নামে পরিচিত। দ্বীপের দক্ষিণে ১০০ থেকে ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের ছোট দ্বীপ আছে যা স্থানীয়ভাবে ছেড়াদিয়া বা ছেঁড়া দ্বীপ নামে পরিচিত। এটি একটি জনশূন্য দ্বীপ। ভাটার সময় এই দ্বীপে হেটে যাওয়া যায়। জোয়ারের সময় নৌকা প্রয়োজন হয়।

নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে যখন ফিরিয়ে নেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রোহিঙ্গা ফেরত না নিয়ে উল্টো বাংলাদেশের জমি নিজেদের বলে দাবি করছে মিয়ানমার। বিষয়টিকে ‘পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া’ করার চেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেউ কেউ মনে করছেন অহেতুক উত্তেজনা তৈরি করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে চাইছে অং সান সু চির দেশ।

– বাংলানিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here