স্বাধীন বাংলাদেশে সবাই মিলেমিশে ভালো থাকুক : এটাই বলে গেছেন সি আর দত্ত

0
70

২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সি আর দত্ত বলেছিলেন যুদ্ধ জয়ের গল্প। জানালেন ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকায় শুরু হওয়া পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের খবর। কিভাবে নারকীয় যুদ্ধের পথ বেছে নিলো পাকিস্তানের সামরিক সরকার।

বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বলেন, এ সময় কিছু ছাত্র এসে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আমার সাহায্য চাইল। আমি তাদের বললাম, যুদ্ধ সামরিক বাহিনীর কাজ, কিন্তু যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনীতিবিদদের। সেই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ বা নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই ছিলেন বৈধ রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

সি আর দত্ত জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আবদুর রব তার বাসায় ডাকলেন। তো তার বসার ঘরে গিয়ে আমি দেখলাম, কয়েকজন ছেলে বসে আছে। আমি তখন দাদাকে (রব) বললাম, এদের আপনি কোথায় পেলেন। তখন দাদা বললেন, যেভাবেই হোক পাকিস্তানিদের কাছ থেকে সিলেট শত্রুমুক্ত করতে হবে এবং আমাকে এই অভিযানের নেতৃত্ব দিতে হবে। তার প্রস্তাবে সম্মত হলাম সানন্দেই। এরপর ওই দিন বিকেল ৫টায় আমার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছল একটি জিপ এবং পাঁচটি বাস ও ট্রাক, তাতে মুক্তিযোদ্ধারা। ‘স্বাধীনতার ডাক এসেছে, আমাকে এখনই যেতে হবে’। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম আমি। এভাবেই মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে যুদ্ধে অংশ নেয়ার কথা জানালেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন দত্ত বীর-উত্তম।

ইতিহাসের সেই ভয়ংকর সময় তুলে ধরে সি আর দত্ত জানান, মাত্র ৩০-৩৫ জন সেনা আর সঙ্গে কিছু থ্রি নট থ্রি রাইফেল। এই ছিল সম্বল। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ দুর্ধর্ষ শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এরপরও পিছপা হইনি, হারাইনি মনোবল। এই মনোবলই রণক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে। যুদ্ধ জয়ের পর এনে দিয়েছে বীর-উত্তম খেতাব। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে অনেক কিছুই ভুলে গেছি। কিন্তু ভুলতে পারিনি যুদ্ধ সময়ের কথা, ভুলতে পারিনি সহযোদ্ধাদের কথা, দেশপ্রেমের গৌরবগাঁথা ইতিহাসের কথা।

সাক্ষাৎকারে মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বলেন, শুরুতে তার সঙ্গে স্বল্পসংখ্যক সেনা আর হালকা অস্ত্র থাকলেও একসময় তা বাড়তে থাকে। শেষমেশ সেনা সংখ্যা দাঁড়ায় সাড়ে তিনশ’র মতো। সঙ্গে ভারী অস্ত্রশস্ত্র। তাই নিয়েই সিলেট জয় করেন এই বীরসেনা। তিনি বলেন, সিলেটের যুদ্ধের সময় আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে একজন মেজর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল।

তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় যে ছেলেগুলোকে আমি পেয়েছিলাম, তারা আমাকে বলেছিল যে স্যার আমরা যারা আছি তারাই পাকিস্তানিদের ধ্বংস করতে পারব। এই যে একটা শক্তি আমি তাদের কাছ থেকে পেলাম, সেটা দারুণ কাজে লেগেছে। এই শক্তি নিয়েই আমরা এগিয়ে গিয়েছি এবং পাকিস্তানিদের ধ্বংস করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি।

প্রসঙ্গত, চিত্ত রঞ্জন দত্তের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি আসামের শিলংয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। তার বাবার নাম উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মায়ের নাম লাবণ্য প্রভা দত্ত। শিলংয়ের ‘লাবান গভর্নমেন্ট হাইস্কুল’-এ দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়ে হবিগঞ্জে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। হবিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে ১৯৪৪ সালে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতার আশুতোষ কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়ে ছাত্রাবাসে থাকা শুরু করেন তিনি। পরে খুলনার দৌলতপুর কলেজের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন এবং এই কলেজ থেকেই বিএসসি পাস করেন। সি আর দত্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন ১৯৫১ সালে। প্রায় ২০ বছর কাটিয়েছেন পশ্চিম পাকিস্তানে। মাঝে মাঝে আসতেন নিজের এলাকায়।

ভারতীয় সেনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতীয় সৈন্য এবং ভারতীয় কমান্ডার যারা ছিলেন, ব্রিগেডিয়ার ওয়াসকে, আমাকে সব দিক থেকে সাহায্য করেছেন। দু’জায়গায় আমার যুদ্ধের সময় ওনারা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে শেলিং করেছেন। পাকিস্তানিদের ধ্বংস করেছেন। ভারতীয়রা আমাকে হাতিয়ার দিয়েও সাহায্য করেছে।

তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের প্রশংসা করে মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বলেন, বর্তমান প্রজন্ম অনেক সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তাই তাদের প্রতি আমার আন্তরিক অভিনন্দন। দেশকে মায়ের মতো ভালোবাসার আহ্বান জানান তিনি।

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করেন তিনি এবং জানালেন, এই দেশের কাছে যা চেয়েছেন তাই পেয়েছেন। অবশ্য তারপরও একটা আশা এখনো রয়ে গেছে। এ বিজয়ী সেনা চান, বাংলাদেশে সবাই মিলেমিশে থাকুক। সবাই মিলেই দেশটাকে আরো সুন্দর করে গড়ে তুলুক। সূত্র: আমাদের সময়.কম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here