হাইকোর্টে আগাম জামিন নিতে বিএনপির হাজারো নেতা-কর্মীর ভীড়

0
171

সেলিম মিয়া। পেশায় রাজমিস্ত্রী। বাড়ি খুলনা সদরের লবন চোরায়। বিএনপি সমর্থক। আর এটাই কাল হলো তার। কোনদিন থানা-পুলিশের প্রয়োজন না হলেও এবার হাইকোর্টে এসেছেন আগাম জামিন নিতে। জীবনে এটাই প্রথম মামলা। কি বিষয়ে মামলা তাও জানেন না তিনি। পুলিশ বাড়ি গিয়ে বলেছে মামলা হয়েছে। পরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওয়ার্ড সভাপতি কালা ফারুকের কাছে জানতে চাইলে বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির লোকজন ভিতরে থাকবে। নির্বাচন শেষ হলে ছেড়ে দেওয়া হবে।

গোলাম মোস্তফা। বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। পেশায় কৃষক। বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি। বাড়ি থেকে ৮ মাইল দূরে নাশকতার ঘটনায় মামলা হয়েছে। তাই স্থানীয় সবার সঙ্গে হাইকোর্টে এসেছেন আগাম জামিন নিতে। এর আগে আরও ১০টি একই রকম মামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একবছর ভাল ছিল। তবে গত ৯ বছর ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। মাঝে মধ্যে বাড়ি গিয়ে জরুরী কাজ শেষ করে আবার পালাতে হয়। গাজী আব্দুর রব। পেশায় কৃষক। বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ায়। স্থানীয় বিএনপির ইউনিয়ন সেক্রেটারি। আগাম জামিন নিতে হাইকোর্ট এসেছেন। অভিযোগ বাড়ি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে পুকুর ঘাটে বসে নাশকতার পরিকল্পনা করেছেন। তবে কেবল হাইকোর্টে নয়, ঢাকাতেই প্রথম এসেছেন আব্দুর রব। গোপনে এক আওয়ামী লীগ কর্মী মামলার বিষয়টি জানান। মামলায় ৬১ জনের নাম উল্লেখ করলেও অজ্ঞাত আসামি প্রায় দেড়শ। তিনি বলেন, ভাড়া দিয়ে ঢাকায় আসতেও কষ্ট হয়েছে।আব্দুল মান্নান। যশোরের অভয় নগরে বাড়ি। স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক। ইমামতিও করেন। এছাড়া ঈদের নামাজ পড়ান কয়েক গ্রামের মানুষের। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করায় নাশকতার মামলা। শুধু তিনি একা নন, তার মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আওয়ামী লীগ করে। তার ভাইও আওয়ামী লীগ নেতা। প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর দলের কর্মসূচিতে আগের মতো সময় দিতে পারেন না। তাই নাশকতার মামলা দিয়ে কারাগারে ফেলে রাখা হয়েছে ওই শিক্ষককে। এমনটাই জানালেন মান্নান। আবু সাঈদ ও অলিয়ার লস্কর। বাড়ি যশোরের অভয় নগর। পেশায় কৃষক। আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টে এসেছেন তারা। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে বাড়ি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিস ভাংচুর করেছেন তারা। কিন্তু অফিস ভাংচুরের কোন ঘটনা ঘটেনি বলে জানান এই দুজন। তারা বলেন, এটাই জীবনে প্রথম মামলা। গত দুই বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করার কারনে মামলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মূলত নির্বাচনের পর থেকেই চাপে রয়েছেন তারা।

কেবল সেলিম মিয়া, গোলাম মোস্তফা, গাজী আব্দুর রব, আব্দুল মান্নান, আবু সাঈদ কিংবা অলিয়ার লস্করই নন। এরকম হাজারো নেতা-কর্মী প্রতিদিন হাইকোর্ট আসছেন আগাম জামিন নিতে। ঘুরে বেড়াচ্ছেন আদালতের বারান্দায়। অবকাশের পর প্রতিদিনই এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে হাইকোর্টের বারান্দায়। কোন দিন ঢাকায় না আসলেও এবার আগাম জামিন নিতে আসতে হয়েছে উচ্চ আদালতে। খেটে খাওয়া অনেকের কেবল ঢাকায় আসার ভাড়া বহন করতেও কষ্ট হয়েছে, এমনটায় জানিয়েছেন তারা।  আর কয়েকমাস পরই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মূলত নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী নেতা-কর্মীদের চাপে রাখতেই এসব কাল্পনিক মামলা দেওয়া হচ্ছে। সব মামলার এফআইআরও প্রায় একই রকম। আর বিরোধী নেতা-কর্মীদের নাম দিতে সহযোগীতা করছে সরকার দলীয় স্থানীয় নেতারা। এমনটিই অভিযোগ করা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে।

অনেক মামলাতে এমন লোকজনকেও আসামি করা হয়েছে যারা মারা গেছেন, কয়েক বছর আগে। আবার অনেকে দেশের বাইরে থাকেন অনেক বছর ধরে। অনেক বৃদ্ধ লোককেও আসামি করা হয়েছে এসব কাল্পনিক মামলায়। আর তাই মামলার বিষয়গুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় সারা দেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।  গত ৬ অক্টোবর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গায়েবি মামলার বিষয়ে বলেন, নির্বাচন থেকে বিএনপিকে দূরে রাখার জন্য সরকার যত ধরনের কূটকৌশল আছে তা প্রয়োগ করছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে গায়েবি মামলা হয়েছে ৪ হাজার ১৪৯টি। এসব মামলায় এজাহারে নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৯২ জনকে। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৭৭ জনকে। সব মিলিয়ে আসামির সংখ্যা ৩ লাখ ৬২ হাজার ৯৬৯ জন। এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৮৪ জনকে। রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে ২৭৪ জনকে।

তবে গায়েবি মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, অপরাধ করলে মামলা হবে। অপরাধ না করলে মামলার কোনো আশঙ্কা নেই। মামলা যেগুলো হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত হবে। তদন্তের পর কোনো অভিযোগ না পাওয়া গেলে চ‚ড়ান্ত রিপোর্টের মাধ্যমে তা শেষ হয়ে যাবে। আর যাদের অপরাধ পাওয়া যাবে তাদের বিচারের জন্য আদালতে দাঁড়াতে হবে বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমরা দলের নেতা-কর্মীদের জামিনের বিষয়ে সহযোগীতা করছি। তবে বিনা মূল্যে কেন নয়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উকিলের ফি তো নিতেই হবে।  এদিকে গায়েবি এসব মামলার তদন্ত এবং মামলাকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছে বিএনপির কয়েকজন আইনজীবী। আর ওই রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট বলেছেন, এসব মামলার কারনে পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here