১৮ জন কোচ, একজন খেলোয়াড়

0
159

‘কী বিপদ! কোন পাশে যে বসি—বর্তমান দলের সঙ্গে, নাকি পুরোনো মহানায়কদের পাশে?’ গত শুক্রবার ক্রীড়া লেখক সমিতির ‘এক সাজে দুই বিয়ে’র অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এমনটাই হয়তো ভেবেছিলেন ফয়সাল মাহমুদ। না ভেবে উপায় আছে! এক পাশে বসা ২০০৩ সালের সতীর্থরা (সাফ শিরোপাজয়ী দল)। আর অন্য পাশে বসা আগামীকাল সাফ খেলতে যাওয়া দলটি। কাদের সঙ্গে বসবেন? তিনি যে দুই দলেরই সদস্য। অবাক হওয়ার মতোই খবর। ২০০৩ সালে সাফের প্রাথমিক দলে থাকা ফয়সাল ২০১৮ সালে সাফের বাংলাদেশ দলেও জায়গা করে নিয়েছেন। অথচ মাঝে কেটে গেছে ১৫টি বছর।

পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে কী না সম্ভব। ২০০৩ সালে ২১ সদস্যের মধ্যে থাকলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে ২০ সদস্যের চূড়ান্ত দল করতে গিয়েই জজ কোটানের তালিকা থেকে কাটা পড়ে তাঁর নাম। অথচ সাফে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জ্বালানি পাওয়া ভুটানের জিগমি দর্জি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলেরও সদস্য ছিলেন ফয়সাল। কিন্তু ভাগ্যটা শেষ পর্যন্ত পাশে না থাকায় আর ঘরের মাঠে সাফ জয়ী দলের গর্বিত সদস্য হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি।

অনেককে অবাক করে দিয়ে ১৫ বছর পরে ৩৩ বছর বয়সে দেশের মাটিতে শুরু হতে যাওয়া সাফের দলে ঠিকই জায়গা করে নিলেন এই উইঙ্গার। অবশ্য এটাই প্রথম সাফ নয়, ২০০৮ সালে কলম্বো সাফেও খেলেছেন। তবে ১৫ বছর পরে এসে দেশের মাটিতে অন্য একটি সাফের দলে জায়গা করে নেওয়া একটু রোমাঞ্চকর তো বটে।

তরুণদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের ফুটবলের জন্য ভালো কিছু করতে ফয়সাল রোমাঞ্চিত বটে। কিন্তু চূড়ান্ত দলে জায়গা পাওয়ায় মোটেই অবাক নন, ‘হুট করে বাংলাদেশ দলে জায়গা পাইনি। আমি লিগে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েই জাতীয় দলে ডাক পেয়েছি। এরপরে ক্যাম্পে আরও কঠোর পরিশ্রম করাতেই বিশজনের দলে জায়গা পাওয়া।’

২০০৩ থেকে ২০১৮। ফুটবল দুনিয়ার কত কিছুই ঘটে গেছে। স্পেনের টিকিটাকা বিশ্ব ফুটবল শাসন করে জাদুঘরে ঢুকতে বসেছে! বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে বদল হয়েছেন ১৮ জন কোচ। অনেক হাত বদলে সেই বাটনটা এখন ব্রিটিশ জেমি ডের হাতে। অথচ দিব্যি আছেন ফয়সাল। ১৫ বছর আগের দলটির সঙ্গে বর্তমান দলের ভালো মিল বা পার্থক্যটা তাঁর চেয়ে ভালো আর কেই-বা জানেন। টুর্নামেন্টের এক দিন আগে পার্থক্যটা নয়, চ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে মিলটাই শোনাচ্ছেন ফয়সাল, ‘২০০৩ সালে সাফ জয়ী দলটির মধ্যে সাফল্যের জন্য যে ক্ষুধাটা দেখেছি, এশিয়ান গেমসে দেখলাম এই দলটার মধ্যে সেটা আছে। এশিয়ান গেমসের অর্ধেক খেলোয়াড় এখানে। সুতরাং ভালো কিছু তো আশা করাই যায়।’

কোটান থেকে জেমি ডে—ফয়সালের রোমাঞ্চের গল্পটা এখানেই শেষ নয়। ঘরোয়া ফুটবল অনিশ্চয়তা দেখে ভালোবাসার ফুটবলের ওপর রাগ করেই ২০০৮ সালে লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফয়সাল। তিন বছর পরে ফুটবলের টানেই আবার বাংলাদেশে ফেরা। পরে ফুটবলই তাঁর জীবনে এনে দিয়েছে অর্থ, যশ ও খ্যাতি। লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরেই নাকি বদলে গেছে তাঁর ভাগ্য।

২০০৪ সাল থেকে লন্ডনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফয়সাল ছিলেন জাতীয় দল ও মোহামেডানের সদস্য। লন্ডনে পড়াশোনার পাশাপাশি একটা খণ্ডকালীন চাকরিতে ভালোই চলছিল। কিন্তু মনটা পড়ে ছিল ঢাকার ফুটবল মাঠে। সে সময় আবাহনী থেকে ফোন পান ফয়সাল। অন্যদিকে বাড়ির ছোট ছেলের জন্য মায়েরও মন কাঁদছিল। তাই ২০১১ সালে ঢাকা ফিরে আসেন। আবাহনীর ফোনে ঢাকা ফিরলেও ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যায় ব্রাদার্সে। প্রায় তিন বছর ফুটবলে ফয়সালের পুনর্জন্ম হলো কমলা জার্সিতে। এরপর মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিকে শেখ রাসেল, মুক্তিযোদ্ধা, আবাহনী হয়ে শেষ মৌসুমে ছিলেন মোহামেডানে। এর মাঝেই ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কিরগিজস্তানের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচের জন্য ইতালিয়ান কোচ ফ্যাবিও লোপেজের হাত ধরে জাতীয় দলে ফেরা হলেও চূড়ান্ত দলে জায়গা হয়নি তাঁর।

কিন্তু জাতীয় দলের জার্সির প্রতি যাঁর ভালোবাসা আছে, তিনি তো থেমে থাকার পাত্র নন। তাই তো ফয়সালের সব দুঃখ হতাশা মিলিয়ে গেছে দেশের মাটিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ খ্যাত সাফ ফুটবল দলে জায়গা করে নিতে পারার আনন্দে।

– প্রথম আলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here