২২ বছরেও বিচার হয়নি ৩৫ কাঠুরিয়া হত্যার

0
182

৯ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ পাকুয়াখালী গণহত্যা দিবস। ১৯৯৬ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ির পাকুয়াখালীতে লংগদু উপজেলার কাঠুরিয়াদের কাঠ সংগ্রহের সীমানা নির্ধারণের জন্য ডেকে নিয়ে ৩৫ জনকে হত্যা করা হয়। হত্যার তিন দিন পর নিহতদের লাশ উদ্ধার করা হয়। সেই সময়ে এই হত্যার জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তি বাহিনীকে দায়ী করা হয়। এরপর প্রায় ২২ বছর অতিবাহিত হলেও খুনিদের বিচার হয়নি আজও।

হত্যার ঘটনায় বাঘাইছড়ি থানায় মামলা হলেও পরে সিআইডিকে এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই তদন্ত ২২ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। নিহতদের পরিবারের দাবি— সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে পুনর্বাসনের কথা বলা  হলেও পরে কেউ আর তাদের কোনও খবর রাখেনি। স্বজন হত্যার বিচার না পেয়ে বর্তমানে হতাশায় দিন কাটছে এই পরিবারগুলোর।

সেদিনের ঘটনায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে জীবন নিয়ে আসা ইউনুছ মিয়া এই মামলার বাদী। তিনি বলেন,‘যখন আমরা সেখানে যাই, তখন তারা সবার হাত বাঁধতে শুরু করে।  বিষয়টি যখন বুঝতে পারি, তখন আমার হাতে ব্যথা বলে অভিনয় করি এবং আমাকে ওরা হালকাভাবে বাঁধে। অনেকক্ষণ পর পর এক-একজনকে একটু দূরে  নিয়ে যাচ্ছে। আর চিৎকারের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।  মনে মনে ভাবতেছি জীবন তো শেষ।  সুযোগ বুঝে চোখ বুজে দিলাম দৌঁড়। দৌঁড় দিয়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকলাম। রাতে গ্রামে ফিরে এসে সবাইকে ঘটনা বলি। কিন্তু কেউই বিশ্বাস করেনি। সকালে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা হতে থাকে। দুদিন পর ১১ সেপ্টেম্বর পুলিশ ও সেনাবাহিনীসহ স্থানীয় লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাদের লাশ উদ্ধার করে। পরে আমি বাদী হয়ে বাঘাইছড়ি থানায় মামলা দায়ের করি। ’

নিহত ৩৫ কাঠুরিয়ার মধ্যে একজন ছিলেন ফজলুল হক। তার স্ত্রী রাবেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে। তখন ছোট মেয়েটার বয়স ছিল মাত্র ৪০ দিন।কাঠ কাটার জন্য আমার স্বামীর পাহাড়ে দাওয়াত ছিল বলে সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে যায়। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে না আসায় পরদিন সকাল থেকে খোঁজ-খবর নিতে শুরু করি। পরে দুপুরে খবর পাই যারা গিয়েছে, তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে।  তিন দিন পর ১১ সেপ্টেম্বর আমার স্বামীর লাশ পাওয়া যায় এবং ওইদিন বিকালেই দাফন করা হয়। সরকার সেই সময় আমারে পুনর্বাসন করার কথা বললেও এখন পর্যন্ত আমাদের কোনও খবর রাখেনি। ’

রাবেয়া বেগম বলেন,‘আপনি দেখেন, গত বছর লংগদুতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়ি নির্মাণ করে দিচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কিন্তু আমরা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছি।’

একই ঘটনায় নিহত গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী যখন মারা যায়, তখন ছোট দুই মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে যায়। কী যে কষ্ট করে তখন জীবন সংসার চালিয়েছি বলে শেষ করা যাবে না। নিহত প্রতিটি পরিবারের জন্য সরকার যদি চাকরির ব্যবস্থা করে দিতো, তাহলে আমাদের পরিবারগুলো খেয়েপড়ে বেঁচে থাকতে পারতো।’

গুলশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু নাছির বলেন, ‘ঘটনা শোনার পর থেকে আমি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাই এবং  লাশ উদ্ধার করে লংগদু উপজেলা পরিষদের পাশে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। সেই ঘটনায় ৩৫জন নিহত হলেও ২৮ জনের লাশ পাওয়া যায়। বাকিদের লাশ পাওয়া যায়নি। তখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি দল লংগুতে আসে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের কথা বলেছিল। আজও  তা করা হয়নি। আশা করছি, বর্তমার সরকার এই বিষয়ে নিহতদের পারিবারগুলোর খোঁজ-খবর নেবেন। ’

বাঘাইছড়ি থানার ওসি আমির হোসেনবলেন, ‘পাকুয়াখালীর ঘটনায় মো. ইউনুছ আলী বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। পরে উচ্চতর তদন্তের জন্য সিআইডির কাছে মামলাটি হস্তান্তর করা হয়।’

– বাংলাট্রিবিউন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here