৩১ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

0
175

গ্রেনেড হামলা মামলার নিষ্পত্তি হলেও চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড়ে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পুলিশের চালানো সেই হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়নি ৩১ বছরেও। কবে চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচার শেষ হবে, তা বলতে পারছে না কেউ। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত শেষ করার আশা প্রকাশ করা হলেও গত ৩১ বছরে ১৬৮ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৬ জনের! অথচ শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে সেদিন মৃত্যু হয়েছিল ২৪ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর। এ হত্যা মামলার ৪০ নম্বর সাক্ষী হচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং।

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ইতিমধ্যে এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. অনুপম সেন। সাক্ষ্য দিতে ইতিমধ্যে মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও মতিয়া চৌধুরীকে সমন ইস্যু করেছেন আদালত। আগামী ৩০ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন জানান, আওয়ামী লীগ নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশ ঘিরে সেইদিন পুলিশ গুলি করে ২৪ নেতাকর্মীকে হত্যা করে। ওইদিন নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে নেত্রীকে মানবঢাল দিয়ে রক্ষা করেছিলেন। গণহত্যা মামলাটি বিচারের জন্য ২০১৭ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল আদালতে আসে। এর আগে দীর্ঘদিন এটি চট্টগ্রাম প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন ছিল। বর্তমান আদালতে মামলা আসার পর গৃহায়নমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরীকে সাক্ষ্য দিতে আসতে আদালত থেকে সমন ইস্যু করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী, তাই তার সাক্ষ্য কীভাবে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুত সময়ে মামলাটি শেষ করার চেষ্টায় আছে রাষ্ট্রপক্ষ।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল গণহত্যা মামলার সাক্ষ্য দেন পুলিশের গুলিতে সেদিন মারা যাওয়া আওয়ামী লীগ কর্মী স্বপন বিশ্বাসের ভাই অশোক বিশ্বাস ও পুলিশের গুলিতে গুরুতর জখম হওয়া চট্টগ্রাম সিটি কলেজের তৎকালীন শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সৈয়দ। অশোক বিশ্বাস আদালতে বলেছেন, পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে আমার ভাইসহ অনেক মানুষকে খুন করেছে। আমি ভাই হত্যার বিচার চাই। একইভাবে সিটি কলেজের তৎকালীন শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সৈয়দ জখমি সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সেদিন পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলাম। গুলি বর্ষণকারী পুলিশের শাস্তি চাই। এর আগে ২০১৬ সালের ২৬ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও ড. অনুপম সেন সাক্ষ্য দেন। তারাও পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদাসহ সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন আদালতে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি এলাকায় জনসভার আয়োজন করে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ। সেই জনসভায় অংশ নেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার ট্রাক শোভাযাত্রা নগরীর নিউ মার্কেট থেকে কোতোয়ালি মোড় হয়ে লালদীঘি যাচ্ছিল। কোতোয়ালি মোড় পার হয়ে লালদীঘির পাড়স্থ চট্টগ্রাম আদালত ভবনের গেটের সামনে পৌঁছালেই পুলিশ নির্বিচারে কোনো কারণ ছাড়াই গুলিবর্ষণ শুরু করে শোভাযাত্রার ওপর। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও আইনজীবীরা মানবঢাল তৈরি করে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে নিয়ে গিয়ে প্রাণে রক্ষা করেন শেখ হাসিনাকে। এ সময় ট্রাক শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া ২৪ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী মারা যান পুলিশের গুলিতে। পুরো লালদীঘি পাড়, কোতোয়ালি, নিউ মার্কেট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় তখন।

এ ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয় তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা, এসআই গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল, কনস্টেবল প্রদীপ বড়ুয়া, কনস্টেবল মমতাজ উদ্দিন, কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান ও কনস্টেবল শাহ আবদুল্লাহকে। বিচার চলাকালে মারা গেছেন দুই আসামি। শুরু থেকে পলাতক পুলিশের তৎকালীন এসআই গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল। জামিনে রয়েছেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা, কনস্টেবল প্রদীপ বড়ুয়া, মমতাজ উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান ও শাহ আবদুল্লাহ। জামিনে থাকা অবস্থায় পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছেন বলে আদালতে একটি পিটিশন জমা দিয়েছেন তার আইনজীবী। আদালত আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে রকিবুল হুদার মৃত্যু-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র সচিবকে। ২০১৩ সালে মারা গেছেন চাঞ্চল্যকর এ মামলার বাদী অ্যাডভোকেট শহীদুল হুদাও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here